আলোচনায় দেশীয় মাছের ভাবনা/ আমরা কি মৎস্যবান্ধব জলাশয় নিশ্চিত করতে পারব?

মিঠা পানির নানা জাতের সুস্বাদু মাছের জন্য হাওর এলাকা সমৃদ্ধ ছিলো। বাঙালির রসনা তৃপ্তির জন্য এসব মাছ ছিলো অপরিহার্য। এই ভাত-মাছ খেকো বাঙালি কল্পনাও করেনি কখনও পাতে মাছের টুকরার অভাব হবে। ধরিব মৎস্য খাইব সুখেÑ বাস্তবতার নির্যাসরূপে সরল জীবন যাপনের অংশ হিসাবেই এই লোককথার উদ্ভব। ঘরের কর্মক্ষম পুরুষ মানুষটি অন্য কাজ শেষ করে বাড়িতে আসার পর গোসল সারার আগে কাঁধে জাল ঝুলিয়ে একটু ঘুরে আসতেন পাশের ডোবা, জলাশয়, নদী কিংবা খাল, পুকুর থেকে। আধ ঘণ্টা জাল টেনে খলই ভর্তি করে নিয়ে আসতেন নানা পদের মাছ। ওই মাছ দিয়েই চলে যেত দিন কতক। গোলা ভরা ধান, পুকুর ভরা মাছ আর গলা ভরা গানÑ আবহমান বাংলার কৃষক সমাজের এই চিরায়ত বৈশিষ্ট্য বিলুপ্ত হয়েছে বহুদিন। নিখাদ কৃষক পরিবার এখন নেই, যেমন নেই নিখাদ জাউল্যা পরিবার। কারণ খেতে ফসল ফলিয়ে আর জলাশয়ে মাছ ধরে এখন আর পেট চলে না। বাড়তি কিছু করতে হয় সংসারের সকলের অন্ন জুগাতে। ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে জেলে-কৃষক পরিবারগুলো। সামজের নিয়মে এমন হতে পারে, আপত্তি নেই। কিন্তু যখন আমাদের ঐশ্বর্যময় মৎস্যবতী হাওর-নদী-জলাশয়ে মাছের বংশ খোঁজে পাওয়া যায় না তখন সেই পরিবর্তন নিশ্চয়ই কোনো ভালো বার্তা বহন করে নিয়ে আসে না। বলা হয় মাছ উৎপাদনে আমরা পৃথিবীর অন্যতম উৎপাদনকারী দেশ। এ কথা সত্য। খামারে মাছের উৎপাদনে আমরা বিশাল অগ্রগতি করেছি। কিন্তু পাশাপাশি নিজেদের অবহেলা আর নির্বিকারিত্বের ফাঁক গলে কখন যে আমাদের ঐতিহ্যের দেশীয় মাছগুলো বিলুপ্ত হয়ে গেছে সেই খবরই রাখছি না আমরা। আজ বহু জাতের মাছ চোখে দেখা যায় না। যা আছে তাও অতি লোভে তাতী নষ্ট হওয়ার জোগাড় হয়েছে। নিষিদ্ধ জালের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, অভয়াশ্রম নষ্ট, মাছ ধরতে রাসানিকের ব্যবহার, ফসলের জমিতে ব্যবহার করা মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক; সর্বোপরি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারের দেশীয় মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্ব কম দেয়ার কারণে আজ আমরা ভুলতে বসেছি সেইসব সুস্বাদু মাছের কথা। পাতে বিস্বাদ এক চিলতে চাষের মাছ দিয়ে আমরা নাক বন্ধ করে ভাত গিলছি বটে, তাতে পেট কিছুটা ভরলেও মন ভরে না মোটেও।
এত কথা বলার কারণ শনিবার তাহিরপুরে নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন নামের সংগঠনের একটি আলোচনা সভার আয়োজন । ওখানে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম তথ্য সমেত বলেছেন যে, হাওরের নির্দিষ্ট কিছু অংশ তথা ইজারাযোগ্য জলমহালের ১০-১৫ শতাংশ সংরক্ষিত রাখলে বিলুপ্ত দেশীয় মাছের পুনরুত্থান ঘটবে এবং দেশীয় মাছের উৎপাদনও বাড়বে। তাঁরা একটি গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করে বলেছেন দেখার হাওরের কিছু এলাকাকে অভয়াশ্রম করার কারণে তিন বছরে সেখানে ৫৪ টি প্রজাতি থেকে ৬২ টি প্রজাতির মাছের দেখা পেয়েছিলেন। এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষও প্রকৃতির এই বিজ্ঞান বুঝেন। মাছের প্রজননস্থল রক্ষা, বাচ্চা ও মা মাছ ধরা বন্ধ করা গেলে যে মাছের উৎপাদন বহু গুণ বেড়ে যাবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কে শোনে এই কথা? সকলেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে আছেন চাষের মাছ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে সনাতনী মৎস্য খাতকে কাঠামোগত কর্পোরেট শোষণের বেড়াজালে ফেলে দিতে।
আমাদের বিল-জলাশয়ের দেশীয় মাছের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপায়গুলোর ব্যাপক চর্চা করা দরকার। দরকার মৎস্যজীবী ও ইজারাদারদের লোভের চাকুতে ঢাকনা পরানো। দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ও সরকারের আইন প্রয়োগে কঠোর অবস্থান। আমরা কি সেরকম মৎস্যবান্ধব হাওর-জলাশয় নিশ্চিত করতে পারব?