আলোর চিঠি ও কবি রাজেশ কান্তি দাশ মরু চরে স্বপ্ন ফুটানোর কবি

কুমার সৌরভ

[আলোর চিঠি, রাজেশ কান্তি দাশ। ভাস্কর প্রকাশন, সিলেট। প্রকাশকাল- এপ্রিল ২০২২]

কবিতার বইয়ের নাম আলোর চিঠি। নামের ভিতর নান্দনিকতা ও প্রত্যাশার চমৎকার মেলবন্ধন। নামেই টানে কাছে যেতে। যাই। পাতা ওল্টাই। সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় কবিদের যেসব কবিতা পড়ি সেরকম নয়। ভিন্ন কিছু। সুন্দর নির্মাণের জন্য কবি-শব্দশিল্পী কতোটা কুশলতা দেখাতে পারেন, কবি রাজেশ কান্তি দাশ এর আলোর চিঠির কবিতা পড়লে তা বেশ বুঝা যায়। এক বাবুই পাখি যেমন নির্মাণশৈলির সর্বোত্তম ব্যবহার করে নিজের প্রশান্তির ঘর তৈরি করে তেমন করেই কবি রাজেশ এক একটি শব্দসুন্দর কাব্যসুন্দর কবিতা নির্মাণ করে পুরো বইয়ে এঁকেছেন আকাক্সক্ষা আর ভাবনার অনিন্দ্য ইমারত। তাঁর ভাবনাকে প্রণতি জানাই।
কেউ অন্য কারো কাছে চিঠি লিখে কিছু জানাতে। কবি আলোর চিঠি দিয়ে পাঠকদের কী জানাতে চান? নিজের ভাবনার মতো সুন্দর বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য জানাতে? যেমন তিনি লিখেছেন–
”হেমন্তের রৌদ্রস্নাত আপেল সকাল
শিশিরসিক্ত প্রকৃতির গায়ে অশ্রুভেজা ঘাস
ভোরের বিবাগী হাওয়ায় রৌদ্রকরোজ্জ্বল আকাশে
তমাল পাতার ফাঁক ফুঁড়ে দেখা যায় এক চিলতে রোদ”
(হৈমন্তিক)

এমন সকালের সুস্নিগ্ধ রূপমোহিত হতে অখ- মনোসংযোগ দেখানোর বিলাসিতা এখন কারও নেই। পেটের তাড়নায় অধিকাংশ মানুষ আর লোভের পীড়ায় কিছু মানুষের অতিব্যস্ততার ফাঁক গলে আপেল রাঙা সকাল দেখতে চোখ ফেলার সময় নেই কারও। এরকম বন্ধ্যা সময়ে কেবল কবির চোখই হতে পারে প্রকৃতির অপার মায়ায় বিমুগ্ধ হতে।

কবিরাও সাথী খোঁজেন। সাথীহীন একাকী কবির মন কখনও নিমগ্ন হতে পারে না রূপময়তার ভূবনের অলিগলি অন্বেষণে। কবি তাই সাথী চান-
তুমি এলেই বৃষ্টি, ধুয়ে নেয় সব পাপতাপ
আষাঢ় নামে মাঠে কদম ফুটা শ্রাবণের দিনে
(তুমি এলে)

সকালের পর কঠিন দুপুর। মাথার উপর দাঁড়ানো মার্ত-দেব তখন পূর্ণ তেজে তাপ বিকিরণের শক্তিতে বলীয়ান। আবার এ সময়টা কাজ করার। এমন ঘামঝরানো শ্রমের সময়ে মন ও চোখের নান্দনিকতা উপভোগ করার ক্ষমতা থাকে না। এই সময় নিয়ে কবি কী ভাবছেন? পেয়ে যাই, তবে তা নিতান্তই কবির নিজস্ব বয়ান যা পাঠকবিশেষের মতান্তরের কারণও হতে পারে। কবি বলছেন-
“’আমার হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল বারবার
এক মধ্যপদলোপী মমি খেয়ে যায়
এই দর্জিদের অবহেলায়।”
(অতঃপর বেতস আলোয় রোদস্নান শিখাই)
এর আগে তিনি দর্জি সম্পর্কে বলছেন-
“’দর্জি শুয়ে আছে তার যাপিত আঁধারের মধ্যে;
অথচ চাঁদ একমাস যাবত সেলাইয়ের বাজনা বাজালেও
তার আঁধারস্নান শেষ হয়নি।’”

দর্জিকে যদি আমরা শ্রমের প্রতীক ভাবি, তাহলে কবিকে প্রশ্ন করতে ইচ্ছা দুর্মর হয়- অন্যের তৈরি আঁধারে যাপিত জীবনের দর্জি কী করে হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল খেয়ে যেতে পারে? এই ধরনের কষ্টকল্পনা কি ঐতিহাসিক পরম্পরার সাথে অসংগতিপূর্ণ নয়? কবির ভিন্ন ভাবনা থাকতে পারে। কবিতা পাঠকের কাছে আসলে পাঠক নিজের ভাবনার সাথে তা মিলিয়ে দেখেন।

মানবগোষ্ঠীর কল্যাণের জন্য শিল্প নাকি নির্ভেজাল নন্দনতত্ত্ব তৈরির জন্য শিল্প; এই তর্ক অন্তহীন পথের মতোই গন্তব্যবিহীন থাকতে পারে। কিন্তু সমাজ সংসার যখন ভেদাভেদ, শোষণ ও বঞ্চনার বহুবিধ নাগপাশে আবদ্ধ থাকে তখন মানব সমাজের অগ্রসর চিন্তক হিসাবে কবিদের কাছে প্রত্যাশা থাকে বেশি। দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সমতাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় কবিরা পথ দেখাবেন; এমন আশা করে বাক ও অধিকারহারা মানবগোষ্ঠী। সমাজে প্রচলিত দ্বন্দ্ব-সংঘাতগুলো থেকে একজন ব্যক্তি-কবি মুক্ত থাকেন না। তিনিও শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক অভিঘাতের শিকার। তাই কবিকে নিজের জন্যই কলম ধরতে হয়। কলমকে শাণিত করতে হয় অসাম্যের বিরুদ্ধে। কবি রাজেশ কান্তি দাশের ভাবনা খুঁজি তার আলোর চিঠিতে। না, এ দায়িত্ব উপেক্ষা করেননি কবি। তাই দেখি তার কলম বলছে-
“’খাটুনির রক্তচিত্রে হাঁটছে ওরা
অমানুষিক হাড় ভাঙা খাটুনি
রক্ত গলে পুঁজ হয়েছে; এ ক্ষতের গন্ধ,
বেদনা, যন্ত্রণা বুঝেনি বলীদল!
শ্রমের দাসত্ব বুঝে না বলীতন্ত্র।’”
(শ্রমদাস)

বলীতন্ত্রকে যদি আমরা পুঁজিবাদ মনে করি তাহলে তারা শ্রমদাসত্ব বুঝে না এমন সরলরৈখিক সিদ্ধান্ত অগ্রহণীয়। এখানেও কবি সামাজিক ইতিহাসকে নিজের কল্পনার রঙে রঙিন করেছেন। কীভাবে শ্রম শোষণ করে শ্রমদাসদের প্রতি ফোটা রক্ত নিংড়ে নিয়ে মুনাফার পাহাড় তৈরি করতে হয় পুঁজিবাদ তা খুব ভালভাবে জানে ও অনুসরণ করে। সুতরাং ‘শ্রমের দাসত্ব বুঝে না বলীতন্ত্র’ বলে এই রক্তচোষা প্রপঞ্চকে দায়মুক্তি দান করা নেহায়েৎই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার নামান্তর। তবে তিনি যখন বলেন-
”প্রগতি, অতীত চেয়ে দেখো মৃত লাশের
বিভৎস গন্ধ। শহরে বন্দরে রাস্তায়…”
(প্রগতির চেতনা)
তখন ঐতিহাসিক গতিধারা সম্পর্কে কবির সচেতনতা বুঝা যায়। কবি নিজেকে যখন রোদ মনে করেন তখন পাঠক আরও উদ্বেলিত হন। কবিরা তো রোদই হবেন। রাশি রাশি সম্ভাবনার রোদেলা তেজদীপ্ত আলো তো কবিকেই মানায়। তাই কবিকণ্ঠ তখন সর্বকণ্ঠ হয়ে কোরাস গায়-
“আমি মেঘের পিঠে রোদ হই
মেঘেরা আমাকে দেখে দৌঁড়ায়
থর মরুভূমির দিকে কিংবা আরও দূরে
দৌঁড়ায়…শুধু দৌঁড়ায়।’”

তবে কবি মেঘেদের পলায়নের কারণ না হয়ে যদি একহাতে মেঘ অন্য হাতে রোদ ধরে রাখতেন তাহলে সম্ভাবনার দুইটি দিগন্তই থাকতো তার করতলগত। ‘তবে একটাই দাবি’ কবিতায় কবি সরাসরি নিজের ইচ্ছের কথা জানিয়েছেন-
“আমার একটি নিবেদন
পৃথিবীর বিদ্রোহের কাছে
ক্লান্ত এ পৃথিবীর বুকে
শত শত বছর হাঁটার অভিজ্ঞতা যেহেতু আমার আছে;
নতুন করে লিখুক ইতিহাস মানবজাতির
শান্তি শান্তি এবং শান্তির
ফিরে আসুক ভারসাম্য”
(একটাই দাবি)

‘একটি দিশাহীন বাতি’ কবিতায় সেই কাক্সিক্ষত বাতি, যাকে আমরা মুক্তি বলতে পারি; তার প্রজ্জ্বলনের জন্য কবি “একটিবার শুধু একটিবার যদি জ্বলে উঠে সে” বলে যে অধীর আকুতি জানিয়েছেন সেই বাতি জ্বালানোর দায়িত্ব আর সকলের সাথে দীপ্ত কবিরও। কবি তা অস্বীকার করেন না। অস্বীকার করেন না বলেই তিনি বলতে পারেন- “আমি গান হবো রৌদ্র হবো আলো হবো…” (আমি গান হবো রৌদ্র হবো আলো হবো)। কবির এই শুভ ইচ্ছার প্রতি পাঠক হিসাবে আমাদের নিরঙ্কুশ সংহতি।

কবি লিখেছেন আলোর চিঠি। কাকে? না কবি সে চিঠি কাউকে লিখেননি। বরং এই চিঠি বা চিঠিগুলোর প্রাপক কবি স্বয়ং। চিঠিগুলো পাঠিয়েছে আলো। আকাশ তখন মেঘলা। মেঘলা আকাশের মলিনতা দূর করে সে আলো। কবি অনুভব করেন-
“’চিঠিগুলোর চোখ থেকে ছলকে উঠছে
বিন্দু বিন্দু ফসফরাস
আমাকে দেখিয়েছিল পথ অনেক দূর অবধি
কৃষ্ণচূড়ার মিহিন পাতা ভেদ করে।”
(আলোর চিঠি)
শঙ্কা ও বিষণ্নতায় হাবুডুবু খাওয়া এক কবি যখন আশ্রয়ের খোঁজে পরিব্রজন শুরু করেন তখনই তিনি অনুভব করেন “স্বরবর্ণের আ আমাকে আলো/ এবং ব্যঞ্জনবর্ণের ন আমাকে নৌকো দেয়/ আমি নির্বাসন ও বিষণœতা থেকে মুক্তি পেতে/আলোর নৌকায় ভাসতে থাকি।” কবিকল্পিত এই আলোর নৌকা সর্বত্রগ্রামী ও অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠুক।

আলোর চিঠি কাব্যে ৫৩টি কবিতা অন্তর্ভুক্ত আছে। প্রতিটি কবিতায় এক ধরনের নিরীক্ষার প্রয়াস লক্ষণীয়। উপমা ব্যবহারে মুন্সিয়ানা কবিতাগুলোর পালককে বর্ণময় করেছে। চিন্তার চমক আছে কবিতার শরীরে। এমন নিরীক্ষাধর্মিতা ভবিষ্যতে আরও বহু সার্থক কবিতা সর্জনে সক্ষম হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস।

শেষ করব বইয়ের শেষ কবিতাটি উদ্ধৃত করে। এতো সুন্দর কবিতা নির্মিতি কমই দেখা যায়। এই কবিতার ছয়টি সারিতে যেন একটি স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম থেকে পূর্ণতা পাওয়া পর্যন্ত বিশাল কর্মযজ্ঞকে ধারণ করে রয়েছে। অল্প কথায় বহু কথা বলার মতো এমন কবিতা সত্যিই কবির অসাধারণ কাব্যকীর্তি হিসাবে বিবেচিত হবে।

“মরু চরে
ফুটে ফুল। শৈশব মত্ততায়।
সময় বদলায়
দিন, মাস, বছর যায়
ফুল গাছ চিন্তা গাছ হয়ে ছড়ায় অক্ষর মুকুল।
মরু চরে গজিয়ে উঠে স্বপ্ন। শাদা শাদা স্বপ্ন… বকুল…
(স্বপ্ন)

কবিতার জমিনে কবি রাজেশ কান্তি দাশ অজস্র ফুল ফুটাতে থাকুন যাতে আমরা কাল থেকে কালান্তরে সুরভিত হতে পারি।