আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও রাজনীতির সমীকরণ

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার শনিবার সুনামগঞ্জে বলেছেন, তফসিল ঘোষণার তারিখ এখনও নির্ধারণ করা হয়নি। অন্যদিকে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেছেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সামনের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে কিনা সেটি সরকার জানেন, অর্থাৎ নির্দলীয় সরকার না দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে সেটি নির্বাচন কমিশনের ভাবনার বিষয় নয়। নির্ধারিত কিছু কেন্দ্রে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের বিষয়ে আবারও নিজের ইচ্ছার প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি। সংবিধান অনুসারে জাতীয় সংসদ বহাল থাকা সাপেক্ষে এর তিন মাস মেয়াদের মধ্যে অথবা জাতীয় সংসদ ভেঙে দিলে ভেঙে দেয়ার তারিখ থেকে তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। গত নির্বাচনটি জাতীয় সংসদের মেয়াদকালের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও যদি এই ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে সামনের ডিসেম্বরের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বাহ্যত সরকারের দায়িত্বশীলদের কথাবার্তা হতে ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনার বিষয়টি বুঝা যায়। এদিকে এখনও মন্ত্রীপরিষদ ভেঙে নির্বাচনকালীন ছোট আকারের মন্ত্রীসভা গঠন করা হয়নি। কবে মন্ত্রী পরিষদ ভাঙা ও পুনর্গঠন করা হবে সে বিষয়েও কোন পূর্বাভাস নেই। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সরকার বা নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষিত না হওয়ায় জাতীয় রাজনৈতিক বাতাবরণে নির্বাচনী পরিবেশটি ঠিক এখনও আসছে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলো ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই নির্বাচন হবে ধরে নিয়ে নিজেদের ঘর ঘুচানোর কাজ শুরু করে দিয়েছেন। এই সময়ে যদি সুনির্দিষ্টভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণা থাকত তাহলে সকল রাজনৈতিক দলের জন্যই সেটি সহায়ক হত।
বিএনপি ও সমমনা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে নির্বাচনের পূর্বশর্ত হিসাবে নির্দলীয় সরকার সহ যেসব দাবি সামনে আনা হচ্ছে, সেগুলো এখনও সেই অর্থে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়নি। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে কিছুদিন ধরে বেশ শক্ত কথাবার্তা বলা হচ্ছে তবুও অন্তত বর্তমান জাতীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় তাদের এই কথাবার্তা খুব বেশি গুরুত্ব বহন করছে না। তারা নিজেদের দাবির সমর্থনে জাতীয় ঐকমত্য গঠনসহ সরকারকে বাধ্য করার মত দৃশ্যত কোন অবস্থা তৈরি করতে পারেনি। রাজনীতির বর্তমান ধারাক্রম বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচনকেন্দ্রীক রাজনৈতিক দলগুলোর বড় জনসমর্থন থাকলেও রাজপথে অবস্থান করে সেই দাবি দাওয়া আদায়ে কর্মী সমর্থকদের দিয়ে আগের মত জান বাজী রেখে কর্মসূচী পালন করানো যাচ্ছে না। প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এটিকে এক ধরনের দেওলিয়াত্ব হিসাবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকার চোখে পড়ার মত ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ সম্পাদন করায় জনগণের মাঝে এক ধরনের সন্তুষ্টিও দেখা যাচ্ছে। মানুষ এত রাজনীতি বুঝে না। তারা চারপাশের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে উন্নয়নের চিত্রটি বেশ ভালভাবেই বুঝতে পারেন। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আজ যেখানে একটি মেরুকরণ ঘটাতে চাচ্ছে সেখানে উন্নয়নযজ্ঞটিই যেন প্রাধান্য পেয়ে যাচ্ছে। এ কথা ঠিক, রাজনীতির যত নীতি-দর্শন সবকিছুই মানুষের কল্যাণ সাধনের জন্য আবির্ভূত হয়েছে। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন নাকি উন্নয়নহীন গণতন্ত্র, এই ধরনের এক কঠিন সমীকরণ মিলানোর অবস্থায় সামনের নির্বাচনটি জাতির জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ।