আসামের নাগরিকপঞ্জি নিয়ে উদ্বিগ্নতা

চার দশক আগে ভারতের আসাম প্রদেশে বাঙাল খেদাও আন্দোলন শুরু করেছিলো অহমিয়া জাতিগোষ্ঠীর একটি প্রতিক্রিয়াশীল অংশ। সেই সময়ে বহু নিরীহ বাঙালির রক্তে আসামের মাটি রঞ্জিত হয়েছিল। বাঙালি খেদাও আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসার সাথে সাথেই আসাম ব্যাপী মাথা চাড়া দিয়ে উঠে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপগুলোর অপতৎপরতা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যখন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতাসীন ছিলো তখন আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছিলো ভারতের পক্ষ থেকে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের এক প্রধান নেতা অনুপ চেটিয়াকে বাংলাদেশ ভূখন্ড থেকে গ্রেফতার হওয়া সেই মদদ দানের প্রমাণ। আওয়ামী লীগ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দানের আত্মঘাতী নীতি থেকে সরে আসে এবং এ দেশের মাটিতে একজন বিচ্ছিন্নতাবাদীকেও আশ্রয় না দেয়ার নীতি অবলম্বন করে। এতে আসামসহ ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলে এক ধরনের স্থিতিশীলতা তৈরি হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে যৌক্তিক অবস্থান গ্রহণ করে ভারতের প্রতি সৌভ্রাতৃত্বসুলভ আচরণ দেখিয়েছিল যার ফল ভোগ করছে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষা ভারতের সাতটি রাজ্য। সেই বাঙালি খেদাও থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার বিষবাষ্প থেকে যখন আসাম বেরিয়ে এসেছিলো ঠিক তখন সেখানে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রণয়নের নামে ১৮ লাখের মতো ভারতীয় বাঙালির নাম বাদ দেয়ার ঘটনাটি আবারও পুরো আসাম অঞ্চলকে এক অস্থির পরিস্থিতির সামনে ঠেলে দিলো। শনিবার সকালে ভারত সরকার যে নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ করেছে সেখানে ১৯ লাখ ৬ হাজার ৬৫৭ ব্যক্তির নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে ১১ লাখের কিছু বেশি হিন্দু বাঙালি ও ৬ লাখের কিছু বেশি মুসলমান বাঙালি। অবশিষ্ট ২ লাখের কাছাকাছি জনগোষ্ঠী বিহারি, নেপালি, লেপচা ইত্যাদি জনগোষ্ঠীর। আশঙ্কা করা হচ্ছে এই বাদ পড়াদের নিয়ে এবার আসামের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি আন্দোলিত হতে থাকবে। কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার পুরো ভারতবর্ষ জুরেই মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরির রাজনীতি করে নিজেদের অবস্থান সংহত করার নীতি গ্রহণ করেছে। যখন বিজেপি আসামে এনআরসি করে ১৯ লাখ ভারতীয়কে অনাগরিক ঘোষণা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে তখনই তারা কাশ্মিরের বিশেষ অধিকার প্রত্যাহার করে সেখানে কাশ্মিরীদের সংখ্যাগত অগ্রবর্তী অবস্থানকে ক্ষুণœ করার নীতি গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে ভারতের হিন্দি বলয়ে তথাকথিত হিন্দু জিকির তুলে কার্যত অসহিষ্ণুতা ও বিভেদের চর্চা শুরু করেছে। বিভেদমূলক ভারতীয় এইসব নীতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা তথা বিশ্বশান্তির জন্য ভবিষ্যতে বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
আসামে ১৯ লাখ লোককে অনাগরিক ঘোষণার সাথে বাংলাদেশের একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এক ধরনের অপপ্রচার আছে, আসামের নাগরিকপঞ্জি বহির্ভূত ভারতীয় বাঙালিরা বাংলাদেশ থেকে প্রত্যাগত এবং এদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেয়ার কথা উঠতে পারে ভবিষ্যতে। যদিও আপাতত ভারতীয় সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে বাদ পড়ারা ট্রাইব্যুনালে নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণের যথেষ্ট সুযোগ পাবেন। এরপরও তাদের হাইকোর্ট-সুপ্রিমকোর্টে যাওয়ার অধিকার থাকছে। আমরা মনে করি কাউকে বাইরে বের করে দেয়া নয় বরং এই ইস্যু নিয়ে রাজনীতি করাটাই এর মুখ্য উদ্দেশ্য। কিন্তু ১৯ লাখ ব্যক্তিকে অনাগরিক ঘোষণা করে যে একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি করা হলো সেখানে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে কিছু গোষ্ঠী উভয় দেশে তৎপরতা শুরু করবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক নানা কারণে মানুষের অভিবাসিত হওয়া পুরোনো প্রপঞ্চ। নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে এক জনগোষ্ঠী যারা আবার দুই রাষ্ট্রের অধিবাসী সেখানে অভিবাসনের চরিত্রটি ভিন্ন ভিন্ন দ্যোতনা নিয়ে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে হাজির হয়ে থাকে। এমন বিশ্ব বাস্তবতায় এখন আসামের কোন বাঙালি ভারতীয় আর কে ভারতীয় নয় সেটি নির্ধারণ করা কষ্টকর বিষয়ই বটে বিশেষ করে অনাগরিক হিসাবে চিহ্নিত সকলেই যেখানে নিজেদের ভারতীয় দাবি করছেন।
আসামের নাগরিকপঞ্জি প্রণয়ন করা নিয়ে বাংলাদেশ যাতে কোনভাবেই আন্দোলিত না হয় সেজন্য শুরু থেকেই বিষয়টির প্রতি গভীর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।