আসুন একুশের চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করি

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ও মহান শহিদ দিবস আজ। বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের দাবিতে এদিন রাজপথে রক্ত ঝরিয়েছিলেন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার। সারা দেশে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে গড়ে উঠেছিল অভূতপূর্ব আন্দোলন। পাকিস্তান সরকার আন্দোলনের চাপে মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়। কেবল মাত্র উর্দুকে বাঙালি জাতির উপর চাপিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের পর ভাষার প্রশ্নে এই আন্দোলনটি ছিল বাঙালির নিজের আত্মপরিচয় খোঁজে পাওয়ার প্রথম ও সার্থক প্রয়াস। মূলত এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভিতর বাঙালিদের অবস্থান কোথায় সেটি বুঝতে সমর্থ হয়েছিলেন সে সময়কার বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিক ও সংগ্রামি ছাত্রসমাজ। পাকিস্তান আমলে ভাষা আন্দোলনের পরে আর যত আন্দোলন সংগ্রাম হয়েছে তার সবগুলোর উৎসমুখ ওই একুশ- একুশে ফেব্রুয়ারি। আজ আমরা স্বাধীন জাতি হিসাবে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচিয়ে আছি। এই দেশটি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে স্বনির্ভর হয়ে উঠছি আমরা। এসব কিছুই সম্বব হত না আমাদের মধ্যে প্রগতিশীল জাতীয়তাভিত্তিক চেতনা জাগ্রত না হলে, একুশ যার ভিত্তিমূল। সুতরাং আমাদের প্রাণের স্পন্দন, জাতিগত আত্মপরিচয়ের উৎসমুখ এই একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদেরকে উদ্বেলিত করে, সচেতন করে, আত্মপোলব্ধির সুযোগ তৈরি করে দেয়। এমন ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন পার করব আজ আমরা। ভাষা আন্দোলনের অমর শহিদানদের প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধা।
আন্দোলনটি ভাষার প্রশ্নে শুরু হলেও এর অন্তর্গত চেতনা ছিল আরও সুদূরপ্রসারী। যে বিকৃত দর্শনের ভিত্তিতে পাকিস্তান ভারত ভাগ হয়েছিল এটি ছিল তার বিরুদ্ধে বাঙালিদের প্রথম সংগঠিত প্রতিবাদ। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তান তথা বাঙালিদের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর প্রভুত্বসুলভ মনোভাবের বিরুদ্ধে প্রথম বিদ্রোহ। এ ছিল অন্যায় ও অসাম্যের বিরুদ্ধে জেগে উঠার এক অনিবার্য প্রেরণা। আজ যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে নিছক ভাষার প্রশ্নে আটকে ফেলার এক ধরনের সচেতন প্রয়াস আমরা লক্ষ করি তখন সেই দুর্মর চেতনাকেই অস্বীকার করা হয়। ইতিহাসকে পরিপূর্ণভাবে আত্মস্থ করতে হয়। খন্ডিত ইতিহাস ভুল বার্তা বহন করে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারিকে কেবল ভাষা আন্দোলনের মোড়ক বন্দী করার এই প্রয়াসের বিরুদ্ধে সকলকে সচেতন থাকতে হবে।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরের উপর নির্ভরশীল। প্রযুক্তির বদৌলতে ভৌগোলিক দূরত্ব এখন ঘুচে গেছে। আজ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে অবস্থিত একক কোনো নাগরিকও এই বৈশ্বিক প্রভাবকে উপেক্ষা করতে পারে না। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেকোনো ঘটনা সকলকে প্রভাবিত করে। এমন বিশ্বব্যবস্থায় কেবল নিজের খোলশের মধ্যে আটকে থাকা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেও আজ তাই বিশ্বজনীন করে গড়ে তুলতে হবে। ভাষার প্রশ্নেও তাই আজ আটপৌরে সেই অবস্থান বজায় রাখা সম্ভব নয়। বাংলাকে মর্যাদা দিয়ে পৃথিবীর সকল ভাষাকেই উপযুক্ত আসন দিতে হবে। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য যে যে ভাষা আত্মস্থ করা প্রয়োজন সেনগুলোকে গুরুত্ব দিয়েই আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। নতুবা বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত যে নতুন নতুন জ্ঞান তৈরি হচ্ছে সেগুলো থেকে আমরা বঞ্চিত থাকব। একুশের মূল চেতনা হলোÑ নিজেকে সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল হিসাবে গড়ে তোলা। নতুন জ্ঞানের সাথে সংযুক্ত না থাকলে আমরা সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারব না।
এছাড়া অমর একুশ অন্য যে আদর্শটি শিক্ষা দেয় কোনো অন্যায়ের কাছে মাথা না নোয়ানোর, সেই আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার দিনও আজ। আসুন সকলে একুশের চেতনায় নিজেদের সমৃদ্ধ করি।