আড়ালে থাকা মোকাম সংরক্ষণ প্রয়োজন

আকরাম উদ্দিন, সরেজমিন
হযরত শাহ্ জালাল (রহ.) তাঁর সঙ্গীয় সাথীদের নিয়ে ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে যুগ যুগ ধরে ধর্ম প্রচার করে আসছিলেন। সর্বশেষ সিলেট বিভাগে ধর্ম প্রচার করেন এবং এই মাটিতে ১৩৪১ খ্রিস্টাব্দে হযরত শাহ জালাল (রহ.) লোকান্তরিত হন। তখন তাঁর সফর সঙ্গীর ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম ছিলেন হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.)। ধর্ম প্রচারের এক পর্যায়ে তিনি সুনামগঞ্জের লাউড়েরগড় এলাকা হয়ে ভারতের ওপাড়ে চলে যান। এই যাত্রা পথে তিনি যেসব স্থানে বসেছেন বা নির্দিষ্ট আস্তানায় যাপন করেছেন, সেসব স্থানকে স্থানীয় মানুষেরা শ্রদ্ধা-ভক্তিতে সাধ্যমত সংরক্ষণ করে আসছেন। এমনই একটি স্থানের নাম প্রচারণার অভাবে চাপা পড়ে আছে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সীমান্তে। লোকমুখে প্রচার আছে তৎকালীন বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী বাংলাদেশ সীমানায় অবস্থিত উঁচু পাহাড়ের উপরে নির্জন স্থানে বিশ্রাম নিতেন বা আস্তানা করেছিলেন হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.)। এই আস্তানার অবস্থান সদর উপজেলার রঙ্গারচর ইউনিয়নের রংপুর গ্রামের কান্দিগাঁওয়ে।
রংপুর গ্রামের কান্দিগাঁওয়ে এই নির্জন পাহাড় এখনও কোলাহলমুক্ত নিরব-নিস্তদ্ধ এবং অল্প পরিমাণে বন-জঙ্গলে আবৃত। পাহাড়ের চারিদিক রয়েছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা। আগেকার দিনে এই অঞ্চলের প্রায় সকল স্থানে গহীন বন-জঙ্গল ও গাছ-গাছালিতে ছিল বেষ্টিত। সাপ-বিচ্ছু, বাঘ ভাল্লুক ও অন্যান্য পশু-পাখিদের জন্যও ছিল একটি আশ্রয় স্থল বা নিরাপদ স্থান। এই পাহাড়ের অদুরে যারা জঙ্গল কেটে বসতি স্থাপন করেছেন, তারা এবং তাদের উত্তরসূরীরা এখনও পাহাড়ের পাদদেশজুড়ে কৃষি কাজ করে জীবীকা নির্বাহ করে আসছেন। হিং¯্র প্রাণী বা বাঘ ভাল্লুকের ভয় ছিল সর্বত্র। এই জন্য এই এলাকায় অতি অল্প বসতি ছিলো। হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) বিশ্রাম নেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় আদি বসতি প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে যুগের পর যুগ শুনে আসছিলেন স্থানীয়রা। এই পাহাড়ে হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) আস্তানার বিষয়টি জেনে খুব শ্রদ্ধা ভক্তি জানাতেন।
এই ইতিহাস স্থানীয় প্রবীণদের জানা থাকা সত্ত্বেও প্রচারণার অভাবে অনেকটা চাপা পড়েছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু ১৯৪৩ সালের দিকে এই বিষয়টি প্রচার হতে থাকে। এই আস্তানার প্রচার ও প্রসার ঘটানো বা আস্তানাকে জাগ্রত করে তোলার বিষয়ে যিনি নিরবে আস্তানার সেবা করে যাচ্ছিলেন, তিনি একজন মহিলা। ১৯৪০ সালের আগে থেকে এই জনৈক মহিলা সাহস ও ভক্তি শ্রদ্ধা নিয়ে পাহাড়ের ওই উঁচু স্থানে টিনের ভেতরে মোমবাতি প্রজ্বলন করে ইবাদত-বন্দেগি করতেন। যে স্থানে মোমবাতি প্রজ্বলন করতেন এই স্থানটি হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) বসার স্থান হিসাবে তখন চিহ্নিত করা হয়। এই চিহ্নিত স্থানে মাত্র কয়েকটি কালো রঙের ছোট ছোট পাথর ছিল। এখন বৃদ্ধি পেয়ে অনেক গুলো হয়েছে বলে প্রচার রয়েছে। মাজার সেবিকা মহিলার মৃত্যুর পর পাহাড়ের এক পাশে দাফন করা হয় তাঁকে। নাম দেয়া হয় বিবি’র মাজার। মহিলার মৃত্যুর পর চলে যায় অনেক দিন।
১৯৪৩ সালে একজন মহা মানব বসে যাওয়ার স্থান সংরক্ষণের বিষয়টি ধর্মানুরাগীদের হৃদয়ে কড়া নাড়ে। স্থানীয় কয়েকজন মানুষ হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) বিশ্রাম নেওয়ার বা বসে যাওয়ার স্থানটিকে সাধ্যমত সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেন এবং বিভিন্ন দিবসে দলে দলে ইবাদত-বন্দেগি শুরু করেন। যখন ভক্তবৃন্দের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে, তখন এই স্থানটিকে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই স্থানের নাম দেয়া হয় হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) আস্তানা বা মোকাম। এই সময়ে মোকাম সার্বক্ষণিক দেখাশোনায় খাদেমের দায়িত্বে ছিলেন এলাকার চিনাউড়া গ্রামের আহসান উল্লাহ।
১৯৫২ সালে খাদেম আহসান উল্লাহ’র ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় স্যাটেলমেন্ট জরীপে শাহ আরেফিনের মোকাম নামে ৬ একর ৪২ শতক জায়গা রেকর্ডভূক্ত করার ব্যবস্থা করেন। খাদেম আহসান উল্লাহ মৃত্যুর পর তাঁকে সায়িত করা হয় এই পাহাড়ের এক প্রান্তে। এরপর খাদেম নিযুক্ত হন হাজী ইনছান উল্লাহ। পর্যায়ক্রমে খাদেম নিযুক্ত হন মো. মঞ্জুর আলী, আব্দুল মালেক, আছদ্দর আলী, খন্দকার ইলিয়াছ মাস্টার ও আব্দুল মালেক। বর্তমানে খাদেমের দায়িত্ব পালন করছেন মো. ঈমান আলী।
রংপুরের পাহাড়ে হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) আস্তানা নাম পরিবর্তনে মোকাম নামের প্রচার হয়ে আসছে। এখন লোকমুখে প্রচার হয়ে আসছে হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) মাজার। মোকামের চারিদিকের সীমানা নির্ধারণ নেই। সীমানা প্রাচীর নেই। এই পাহাড়ে উঁচু স্থানে মোকাম দেখতে নিচে থেকে উপরে বেয়ে উঠতে দুইটি প্রবেশ দ্বার রয়েছে। সিঁড়ি নির্মাণ না হওয়ায় বয়স্কদের জন্য উঠা খুবই কষ্টকর। আস্তানার আশপাশে ভক্তবৃন্দের বসার স্থান নেই। পুরুষদের এবাদতখানা নেই, মহিলাদের এবাদতখানা নেই। অজুখানা নেই এবং পর্যাপ্ত বাথরুম নেই। ভক্তবৃন্দের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। পানি সংকট নিরসন হয়েছে চলতি বছরের ৯ অক্টোবর সুনামগঞ্জের কৃতি সন্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিকের উদ্যোগে। তাঁর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় একটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এই গভীর নলকূপ স্থাপন করে দেয় সুনামগঞ্জের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ এবং সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ইয়াসমিন নাহার রুমা মোকাম এলাকা পরিদর্শন করে উন্নয়নের আশ^াস দিয়েছেন। হযরত শাহ্ আরেফিন (রহ.) মোকামে বছরে দুইবার ওরশ হয়। বাংলা মাসের ২ অগ্রহায়ণ এবং ১৫ ফাল্গুন। এই ওরশে জেলার বাইরে থেকে অনেক ভক্তবৃন্দ আসেন মোকামে।
মোকাম পরিচালনা কমিটির সভাপতি হাবিলদার (অব.) আব্দুল মান্নান বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, এই মোকামটি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা না হলে ধীরে ধীরে মোকামের জায়গা অন্যের দখলে চলে যেতে পারে। মোকাম এলাকায় গাছের চারা রোপন করলে অন্যের গরু-ছাগলে নষ্ট করে দেয়। তাই দ্রুত মোকামের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের দাবি আমাদের।
সুনামগঞ্জ উত্তর সুরমা উন্নয়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আব্দুর রব বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বেষ্টিত হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) মোকামের রক্ষণাবেক্ষণে অনেক সমস্যা বিরাজ করছে। মোকামে প্রতি বছর দুই বার ওরশে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তবৃন্দরা আসেন। এই জন্য মোকামের উন্নয়ন জরুরি প্রয়োজন।
স্থানীয় রঙ্গারচর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল হাই বলেন, আমাদের এলাকায় হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানা নাম জেগে ওটুক চাই আমরা। এমন একজন দরবেশের আস্তানা সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। পরে তিনি মোকামের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য দশ হাজার টাকা অনুদান দেয়ার ষোষণা দেন।