ইউনিয়ন পরিষদে ‘গল্লা মারা’ আধিপত্যবাজি সুখকর নয়

আর যাই হোক সামন্ত প্রভুর মতো দাম্ভিকতা দেখানোর সুযোগ থাকার কথা নয় একটি নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের। ১২ জন সদস্য ও একজন চেয়ারম্যান নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ গঠিত হয়। সকলেই ভোটারদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। সকলেই নিজ নিজ ভোটারদের দ্বারা নির্বাচিত জঁনপ্রতিনিধি। এখানে কেউ কারও অধীনস্ত কর্মচারি বা গোলাম নন। চেয়ারম্যান পরিষদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তিনি পুরো পরিষদের নেতা। তাঁকে অবশ্যই নেতৃত্বসুলভ গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে এবং তাঁকে সদগুণ প্রয়োগের মাধ্যমেই ইউনিয়ন পরিষদের যাবতীয় কার্যাবলী পরিচালনা করতে হয়। এখানে কোনো অবস্থাতেই চেয়ারম্যানের নির্বাচিত অপর সদস্যদের প্রতি অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে এরকম ঘটনা প্রায় অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদেই ঘটছে। কোথাও কম কোথাও বেশি। উন্নয়ন কর্মকা-ে নির্বাচিত সদস্যদের উপেক্ষা করার মনোভাব অনেক চেয়ারম্যানই পোষণ করেন। তবে ঘটনা মাত্রা ছাড়ালেই তা প্রকাশ্যে আসে। এরকমই প্রকশ্যে আসা একটি ঘটনা হলো জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের ১১ সদস্য কর্তৃক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা জ্ঞাপন ও বিভিন্ন অভিযোগে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট অভিযোগপত্র দাখিল করা। রবিবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায় ওই ইউনিয়ন পরিষদের ১১ জন সদস্য চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মসহ তাদের হুমকি প্রদানের অভিযোগ এনেছেন। সদস্যদের গল্লা দিয়ে পিটিয়ে পরিষদ থেকে বের করে দেয়ার মতো চরম অবমাননাকর অভিযোগও এনেছেন এই সদস্যরা। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি ইউনিয়ন পরিষদে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চর্চার পরিবর্তে আধিপত্য কায়েম ও দুর্নীতি চর্চার এমন দুর্ভাগ্যজনক দৃষ্টান্ত কিছু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অগণতান্ত্রিক ও অসহিষ্ণু চরিত্রকে সকলের সামনে নিয়ে এসেছে।
অভিযোগকারীরা ওই চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাত, সমন্বয়হীনতা, গালিগালাজ করা প্রভৃতি অভিযোগের উল্লেখ করেছেন। অবশ্য চেয়ারম্যান তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে ষড়যন্ত্রমূলক ও মিথ্যা দাবি করেছেন। উল্টো তিনি সদস্যদের বিরুদ্ধে জনগণের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ এনেছেন। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা মজবুদ আছে যে, আর্থিক অনিয়ম করাই যেন তাদের অন্যতম কাজে পরিণত হয়েছে। এজন্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাবমূর্তি ক্রমশ নি¤œগামী। তারপরেও শাঁক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো করে যেভাবেই চলছিলো সেখানে মাঝেমধ্যে পূর্ব পাগলার মতো বিরোধের কথা যখন প্রকাশ্যে চলে আসে তখন আর কোনো কিছু ঢাকা রাখারও সুযোগ থাকে না। আমাদের নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সর্বনাশা পতনের হাত থেকে অবশ্যই উদ্ধার করতে হবে। উন্নয়ন কাজসহ মানুষের সবচাইতে কাছের প্রতিষ্ঠান হলো ইউনিয়ন পরিষদ। পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা ভোটারদের একেবারে চেনাজানা লোক। এরকম জায়গায় অনৈতিকতার পরিবর্তে গণতন্ত্র, সহিষ্ণুতা ও সেবাপরায়ণতার চর্চা করলে মানুষের উপকৃত হওয়ার সম্ভাবনা সবচাইতে বেশি। এরকম একটি জনকল্যাণকর প্রতিষ্ঠান কেবলমাত্র কিছু ব্যক্তির হীন মন মানসিকতার কারণে অকার্যকর হয়ে গেলে তার চাইতে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় আর কিছু হতে পারে না।
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে সদস্যরা যেসব অভিযোগ এনেছেন তার উপযুক্ত তদন্ত করা আবশ্যক। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। তদন্তস্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহনের নজির স্থাপিত হলে অন্যান্য জায়গায়ও এর প্রভাব পড়বে। আমরা আশা করব অভিযোগকারী সদস্যগণ শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকবেন। তা না করে মাঝপথে যদি তাঁরা আপোস ফর্মুলায় নতজানু হয়ে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেন তাহলে তাদের ভাবমূর্তিও কলুষিত হবে।