ইউপি সদস্যদের পেটানোর হুমকি চেয়ারম্যানের

ইয়াকুব শাহরিয়ার, শান্তিগঞ্জ
শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়েছেন ইউপি সদস্যারা। চেয়ারম্যান কর্তৃক ইউপি সদস্যদের লাঠিপেঠা করার হুমকির কথাও জানিয়েছেন ইউপি সদস্যারা।
ইউপি সদস্যরা জানান, ইউনিয়নের ‘চিকারকান্দি আগার বাড়ি সড়ক থেকে বেড়িবাঁধের মুখ পর্যন্ত মাটি ভরাট করে সড়ক নির্মাণ’ প্রকল্পের জন্য ২০২১-২০২২ অর্থ বছরে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় (২য় পর্যায়) ৫ লক্ষ ১২ হাজার টাকার বরাদ্দ আসে। ৬নং প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ধারদেনা করে কাজটি সম্পন্নও করে। বরাদ্দের অর্থ যখন অনুমোদিত হয়ে আসে তখন টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে বোকা বনে যান প্রকল্পের সভাপতি ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য কোহিনূর বেগম। প্রকল্পের ওই টাকা প্রভাব খাটিয়ে এর আগেই উত্তোলন করে নেন চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া।
এছাড়াও অন্যান্য সব বরাদ্দের অর্থ ইচ্ছে মতো খরচ করা, পরিষদের সকল সদস্যদের সাথে অসদাচরণ, বিভিন্ন অনিয়ম সম্পর্কে পরিষদের সদস্যগণ জানতে চাইলে তাদের গালিগালাজ, মেয়াদকালীন সময় কোনো বরাদ্দ না দিয়ে আঙুল চুষানোর হুমকি, এমনকি বেশি কথা বললে ছিংলা (বাঁশের ছোট লাঠি) বা ‘গল্লা’ দিয়ে পিটিয়ে পরিষদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকির কথা সদস্যরা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উল্লেখ করেছেন। এজন্য ইউপি সদস্যরা চেয়ারম্যানের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছেন।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩ টায় শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামানের কাছে এমন সব অভিযোগ এনে ইউনিয়ন পরিষদের ১১ জন পুরষ ও নারী সদস্যদের সিল-স্বাক্ষরিত অভিযোগ ও অনাস্থাপত্র জমা দেওয়া হয়। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, জেলা প্রশাসক ও সুনামগঞ্জের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বরাবরে এই অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
পরে সন্ধ্যায় শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন অভিযোগকারী ১১ ইউপি সদস্য। এসময় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইউপির ২নং ওয়ার্ডের সদস্য ও প্যানেল চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন। বক্তব্য রাখেন ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য কোহিনূর বেগম, ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনের মহিলা সদস্য ছুরতুন নেছা ও ৩ নং ওয়ার্ডের সদস্য আমির আলী।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, পূর্ব পাগলা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি ইউপি সদ্যস্যদের সাথে সমন্বয় ছাড়াই পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। ২০২১-২০২২ইং অর্থ বছরে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির আওতায় (২য় পর্যায়) ৩২ জন শ্রমিক দিয়ে ৬নং পিআইসি পাঁচ লক্ষ বারো হাজার টাকা বরাদ্দে ‘চিকারকান্দি আগার বাড়ির রাস্তা থেকে বেড়িবাঁধের মুখ পর্যন্ত মাটি ভরাট করে রাস্তা নির্মাণ’ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে। এতে ১, ২, ৩নং (সংরক্ষিত) ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কোহিনুর বেগম প্রকল্প সভাপতি ও আবুল কাশেম সেক্রেটারি ছিলেন। কিন্তু প্রকল্পে বরাদ্দকৃত টাকা চেয়ারম্যান নিজে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার পর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার অফিসে বিল ছাড় করতে যোগাযোগ করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায় প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুক মিয়ার নিকট দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ২০২১-২০২২ইং অর্থ বছরে জেলা প্রসাশক কার্যালয় থেকে বিশেষ সহায়তা তহবিলের দরিদ্র মহিলাদের কর্মসংস্থনের জন্য ৮টি সেলাই মেশিন এবং ২০২২-২০২৩ইং অর্থবছরে ইউনিসেফ কর্তৃক উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১টি নলকূপ ও ৫টি ল্যাট্রিন বরাদ্দ চেয়ারম্যান কোথায় এবং কাদেরকে বিতরণ করেছেন ইউপি সদস্যগণ তা অবগত নন। অনিয়মিত এবং বিলম্বে অফিসে আসার কারণে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, এটা উনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার, ভালো লাগলে অফিসে আসবেন, না লাগলে আসবেন না।
এসময় ইউনিয়ন পরিষদের ১নং ওয়ার্ডের সদস্য সাদেক মিয়া, ২নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. আনোয়ার হোসেন, ৩নং ওয়ার্ডে সদস্য আমির আলী, ৪নং ওয়ার্ডের সদস্য জাহাঙ্গীর আলম, ৬নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. রুপন মিয়া, ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. জাহিদুল ইসলাম, ৯নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. ওমর ফারুক, মহিলা সদস্য কুহিনূর বেগম, মোছা. ছুরতুন নেছা ও মোছা. রওশন আরা উপস্থিত ছিলেন।
পূর্ব পাগলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুক মিয়া তার বিরুদ্ধে করা সকল অভিযোগে অস্বীকার করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যারা অভিযোগ করেছেন তারা বিভিন্ন সময় মানুষের কাছ থেকে বিভিন্ন প্রকল্প দেখিয়ে টাকা নিলে আমি বাধা দেই। এতে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে জোট করেছে।
প্রকল্পের টাকা উত্তোলনের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি এ টাকার ব্যাপারে কোনো কিছুই জানি না। পিআইসির সদস্যরাই টাকা তুলেছেন। অশালীন কথা-বার্তার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করে বলেন, সকলের ঘরে মা বোন ভাই আছে। আমি এমন ব্যবহার কখনো কারো সাথে করিনি। গল্লা দিয়ে মেরে কাউকে বের করে দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আনোয়ার উজ্ জামান বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। এখন কাজের ধারাবাহিতা বজায় রেখে তদন্ত করা হবে। যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় তাহলে অভিযুক্ত চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।