ইচ্ছাখুশি পাঠদান করেন শিক্ষকরা

ইয়াকুব শাহরিয়ার, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ
কোনো নিয়মের তোয়াক্কা না করে শিক্ষকরা যেমন খুশি তেমন ভাবেই চালাচ্ছেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। এই অবস্থা দক্ষিণ সুনামগঞ্জের পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের বসিয়া খাউরি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বহীনতা ও অবহেলায় ভঙ্গুর অবস্থায় পড়েছে সরকারি স্কুলটি। এলাকাবাসীর অভিযোগ ক্লাসে অনুপস্থিত, নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে স্কুল ছুটি দেয়া, সুষ্ঠু পাঠদান না দেওয়ার কারণে এ স্কুল এখন চলছে দায়সারাভাবে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে থাকা মুজিবুর রহমানের দায়িত্বহীনতার কারণেই প্রাথমিক পর্যায়ের মফস্বলের এ বিদ্যাপীঠের এমন নাজুক অবস্থা বলে অভিযোগ তুলেছেন এলাকার নবীণ-প্রবীণ সকলেই।
অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান।
এলাকাবাসী অভিযোগ করে জানান, দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকহীনভাবে চলছে এ প্রতিষ্ঠানটি। ২০১০ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান পার্শ্ববতী জয়সিদ্ধি গ্রামের বাসিন্দা স্কুলের সহকারী শিক্ষক মুজিবুর রহমান। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ স্কুলের শিক্ষক মোট ৩ জন। একজন শিক্ষিকা প্রায় ৫ মাস ধরে আছেন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। এরপর থেকেই দু’জন শিক্ষকে চলছে এ বিদ্যালয়টি। কিন্তু ওই দুইজন শিক্ষকও নিয়মিত আসেন না। যদিও আসেন তাও সকাল ১০টার স্থলে ১১টায় বা সাড়ে ১১টায় আসেন। বিকাল ৪টায় স্কুল ছুটি দেওয়ার কথা থাকলেও দেড়টায়, সর্বোচ্চ ২টায় প্রতিদিন স্কুল ছুটি দিয়ে বাড়ি চলে যান তারা। এছাড়াও স্কুলের শিক্ষার মান একেবারে তলানিতে। স্কুলে যে সময়টুকু তারা থাকেন তাও হয় না রীতিমত ক্লাস।
এতে শিক্ষার্থীরা ব্যপকভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। ফলাফল বিপর্যয় হচ্ছে বিদ্যালয়ের।
১৬০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে বিদ্যালয়ে। ২০১৭ সালের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ২২জন শিক্ষার্থী অংশ নিলেও শতভাগ ফলাফল আসেনি। জিপিএ ৪ পর্যন্ত পায়নি কোন শিক্ষার্থী।
গত শনিবার দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে গিয়ে দরজা তালাবদ্ধ পাওয়া যায় বিদ্যালয়টির।
এলাকাবাসীর সাথে কথা বললে এলাকাবাসী জানান আরও অনিয়মের কথা। খোদ বিদ্যালয় পরিচালনা  
কমিটির সভাপতিও তার অসহায়ত্বের কথা জানান।
সভাপতি মাহিন মিয়া বলেন,‘আমরা বার বার হেড স্যারকে হুঁশিয়ার করেছি। তবু স্যারের টনক নড়ে না।’
সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে আস্তে আস্তে মানুষ এসে ভিড় জমান এবং নানা অভিযোগের কথা জানান।
স্কুলের অনিয়ম আর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতার কথা বলতে ভুলেননি স্কুলের পাশের বাড়ির মহিলারাও।
একজন মহিলা এসে বলেন, ‘বাফের মোর একটা দিন যুদি ইশকুলো ভালা খরি ফড়ানি অইতো। আর ইশকুল ছুটি দিয়া মাস্টর অখল যাইনগি জোহরের ওক্ত।’
কথা হয় গ্রামের শতবর্ষী মুরব্বি রেজওয়ান আলী তালুকদারের সাথে। তিনি বলেন,‘এই বয়সে আমি এসে মাঝে মাঝে খবর নেই। কিন্তু ভালো করে স্কুল চলছে বলে মনে হয় না। জোহরের সময় স্কুলের ছুটি দেওয়ার কোনো বিধান আছে বলে আমার  জানা নাই।’
প্রবীণ এ মুরব্বির সাথে একমত পোষণ করেন জেবিবি উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি সদস্য মোশাহিদ খান।
তিনি বলেন, ‘যেমন খুশি তেমনি ভাবেই চলের এই স্কুল। মাস্টর সাব নিয়মিত আইন না। আইজও তো ১২টার সময় আমারে সালাম দিয়া গেচইন। তাইন ইচ্ছা-খুশি চালাইরা স্কুল। তাইনের সমস্যা থাকলে চাকরি ছাড়িয়া যাওকাগি।’
এ ব্যপারে কথা বলতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে কল করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তিনি কথা বলতে চান নি। নানা অনিয়মের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জানান, তিনি স্কুলে নিয়মিত যান।
এক পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক বলেন, স্কুল ছুটি দিলে ২টায় ছুটি দেন। শনিবারে স্কুল তালাবদ্ধ ছিল না, তিনি অফিসেই ছিলেন বলে দাবি করেন। দম্ভোক্তি করে বলেন, মানুষ বললেই হবে নাকি?’ এ প্রতিবেদক ওই সময় স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন জানালে ফোনের সংযোগ কেটে দেন তিনি।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বজলুর রহমান বলেন,‘আমরা বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। এমন অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’