ইতালী যাওয়ার পথে একুয়ানের মৃত্যু/ অভিভাবকরা আরও সচেতন হোন

প্রতারণার ফাঁদ পাতা ভুবনে প্রতিদিন কত মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে, জীবন দিচ্ছে; তার হিসাবের খেরোখাতা কেউ রাখে না। স্বজনের আহাজারি বাতাসে মিলিয়ে যাওয়ার আগেই সকলে সবকিছু ভুলে যায় আর পৃথিবী ঘুরতে থাকে সেই একই বিষের নিঃশ্বাসে ভর করে। বিদেশ যাওয়ার ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হওয়া একটি নৈমিত্তিক ঘটনা আমাদের দেশে। ইউরোপে অবৈধপথে পারি দিতে যেয়ে অসংখ্য যুবকের প্রাণপ্রদীপ নিভে গেছে, তাদের দেহ অজানা সমুদ্রের গহীনে হারিয়ে গেছে। মরার পরও যাদের লাশ পাওয়া যায় সেই ‘ভাগ্যবান’রা কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফিরেন। সন্তানহারা মা—বাবার করুণ আর্তনাদে আকাশ ভারী হয়। দালালচক্র গোপনে সে আর্তনাদ উপভোগ করে আর পরবর্তী শিকার ধরার জন্য নতুন ফাঁদ পাতার ধান্দায় লিপ্ত হয়। জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীধরপাশা গ্রামের ১৯ বছর বয়সী যুবক একুয়ান ইসলাম অবৈধভাবে ইতালী যাওয়ার পথে মৃত্যুবরণ করে। সে ‘ভাগ্যবান’, কারণ তার লাশ দেশে এসেছে। বাবা তরিকুল ইসলামসহ স্বজনদের কান্না ভেজা মাটিতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরের সংবাদ তথ্য জানাচ্ছে, স্থানীয় মানবপাচারচক্রের সদস্য আলী হোসেনের মাধ্যমে ৪ লাখ টাকার বিনিময়ে লিবিয়া যায় একুয়ান। লিবিয়ায় পৌঁছার পর একুয়ানের উপর দালালচক্রের নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতন থেকে বাঁচাতে একুয়ানের পিতা ১০ লাখ টাকা দেন। পরে আরও ৫ লাখ টাকা দেন একুয়ানকে ইতালী পাঠানোর জন্য। মোটমাট ১৯ লাখ টাকা খরচ করার পর ওই সর্বস্বান্ত পিতা ফেরৎ পেলেন তরতাজা সন্তানের লাশ। সন্তানহারা পিতা বিচার চাইলেন দালালচক্রের। তার এই চাওয়া কখনও পূরণ হবে না। কারণ অপরিমেয় শক্তি ও প্রভাবের অধিকারী এই দালালচক্র। এরা সবকিছু ম্যানেজ করে মানবপাচার নামের এই ঘৃণ্য পেশায় নেমেছে। এরা সর্বভুক প্রাণীর মতো গ্রামের কর্মহীন বেকার তরুণ যুবক জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে তাদের অভিভাবকদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে সবকিছু গিলে খেতে সিদ্ধহস্ত। সরকার থেকে বলা হয় বটে, অবৈধ মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে যেন কেউ বিদেশ যাওয়ার চেষ্টা না করেন। কিন্তু যে সমাজ এখনও কর্মক্ষম ব্যক্তির কর্মের নিশ্চয়তা দিতে পারেনি, যেখানে সংসারে কর্মক্ষম সন্তান থাকার পরও দারিদ্রতা দূর হয় না; সেখানে এসব কথার চাইতে দালালদের মিষ্টি প্রতিশ্রম্নতি ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানো প্রলোভন অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। তাই তো একুয়ানের অভিভাবকরা সর্বস্ব বিক্রি করে সন্তানকে বিদেশ পাঠাতে চান একটুখানি স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়ার আশায়। কিন্তু কোথায় সেই স্বাচ্ছন্দ্য?
সরকার কেন বিদেশ গমনের অবৈধ পথ বন্ধ করতে পারছে না, প্রশ্নটি একেবারে মৌলিক। এটি তো সরকারেরই করার কথা। এই অবৈধ কর্মটি হয়ে আসছে সবসময়। আর ক্রমাগত ঠকছে, মরছে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ। অভিভাবকদের সচেতন করার কথা বিভিন্ন পক্ষ থেকে বলা হয়। আমরাও এই পত্রিকায় কতবার এসব বিষয়ে লিখেছি তার হিসাব নেই। কিন্তু সংসারে অভাব রেখে এসব কথায় যে খুব কাজ হয় না তা এক একটি ঘটনা ঘটার পর আমরা বুঝতে পারছি। তবুও বিরামহীনভাবেই এসব কথা বলতে হবে, দালালদের চাতুরীপূর্ণ কথার মায়াজালে প্রলুব্ধ হয়ে নিজের সন্তানকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিবেন না। বরং সন্তানদের উদ্যোক্তা তৈরি করুন, তাদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশেই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিন। আর বিদেশ পাঠাতে চাইলে সরকারি ও বৈধ চ্যানেল ব্যবহার করুন। সকল লেনদেন ও চুক্তি লিখিতভাবে সম্পাদন করে তা নিজের কাছে সংরক্ষণ করুন। তাহলে আইনি প্রতিকার পেতে সুবিধা হবে।
জগন্নাথপুরের একুয়ানকে যে দালালচক্র মেরে ফেলল, আমরা তাদের শাস্তি চাই।