ইতিহাসকে পিছনে ঠেলে নেয়া যায় না

ভারতের সাম্প্রতিক রাজনীতির দিকে ইঙ্গিত করে ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক আশীষ চক্রবর্তী বলেছেন, ইতিহাসের চাকাকে কখনও পিছনে ঠেলে নেয়া যায় না। এনআরসি, কয়েকটি দেশ থেকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভারতে আশ্রয় দানের ঘোষণা এবং এসব ডামাডোলে ভারতের অভ্যন্তরে সংঘটিত তীব্র আন্দোলনের বিষয়ে তিনি এই মন্তব্য করে দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বলেছেন, পরিত্যক্ত টু নেশন থিউরি কখনও ভারতের মাটিতে বাস্তবায়িত হবে না। সুতরাং ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই। মঙ্গলবার রাতে সুনামগঞ্জে সাংবাদিক হোসেন তওফিক চৌধুরীর দেয়া নৈশভোজে তিনি এমন কথা বলেছেন। উপমহাদেশের রাজনীতি নিয়ে বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল ও বিশ্লেষক আশীষ চক্রবর্তী যখন এমন প্রত্যয়দৃপ্ত উচ্চারণ করেন তখন সকলেই আশান্বিত হন বৈকি। রাষ্ট্র-রাজনীতি থেকে ধর্ম ও ধর্মীয় সংগঠনকে বিযুক্ত করার যে বৈশ্বিক প্রয়াস শুরু হয়েছিল কয়েক শতক আগে থেকে তার ফলে পৃথিবী গণতান্ত্রিক ও জনগণের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দিকে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছিল। যে টু নেশন থিওরির বুলি আওরিয়ে ১৯৪৭ সনে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুইটি পৃথক রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তা ২৪ বছরের মাথায়ই পরিত্যক্ত হয়। ভারতের সংবিধানে ধর্মনিরেপক্ষতা অন্তর্ভূক্ত করে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে পৃথক করা হয় শুরুতেই। তার পরেও উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাতাবরণ থেকে ধর্ম কখনও তিরোহিত হয়নি। কখনও প্রচ্ছন্নভাবে কখনও প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করেছে ধর্ম। ধর্ম হয়ে উঠে উপমহাদেশের রাজনীতির অবিচ্ছেদ অঙ্গ। পাকিস্তান তো জন্মের পর থেকে অদ্যাবধি এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশ একাত্তরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর সেক্যুলার অভিযাত্রায় শামিল হলেও মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় কতিপয় বিশ্বাসঘাতকের চক্রান্তে আবারও পথ হারায় এবং রাজনীতিতে ধর্মীয় যোগসূত্রের প্রতাপ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার মাঝখানের পাঁচ বছর বাদে ১৯৯৬ সন থেকে আবারও সেক্যুলার বাংলাদেশ গঠনের লক্ষে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে চলেছে। ভারত দীর্ঘদিনের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বিসর্জন দিয়ে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদির শাসনামলে এখন ধর্মকে আবারও সরাসরি রাজনীতির ময়দানে নিয়ে আসল। এইসব ঘটনা উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তথা শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে আঞ্চলিক অবিশ্বাস ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই অবস্থায় সাংবাদিক আশীষ চক্রবর্তীর কথার মধ্যে যে ঐতিহাসিক সত্যতা ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সংশ্লেষ রয়েছে, আশার জায়গা ওইটুকুই।
পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাস ক্রমোন্নতির ইতিহাস। সভ্যতা কখনও ইউ টার্ন করে পেছনে ফিরে যায়নি। ইতিহাসের কোনো বাঁকেই এমন বাস্তবতার সন্ধান মিলে না। সাময়িক বিচ্যুতি ঘটে, পদস্খলন হয়, ভাবাবেগ যুক্তিবোধের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে; কিন্তু চূড়ান্ত অর্থে এর সবই একসময় বর্জ্য পদার্থের মত আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। এর বড় প্রমাণ বাংলাদেশ। বারবার এই দেশটিকে সাম্প্রদায়িক বিভেদের মধ্যে ঠেলে দিতে চাইলেও বারবারই গাঙ্গেয় এই ব-দ্বীপ ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এর পেছনে বড় সত্য হল- সবার উপরে ,মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই। নিছক স্বার্থের সম্পৃক্ততা ব্যতীত উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর মধ্যে কখনও সাম্প্রদায়িক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়নি। বরং আন্ত ধর্মীয় সদ্ভাবই সকল সম্প্রদায়ের মানুষের অন্তর্গত সংকল্প। এর পেছনে উপমহাদেশ জুরে সভ্যতা গড়ে উঠার যে ঐক্যসূত্র তাই মূল ভূমিকা রেখেছে। এই জায়গা থেকে সরে আসার কোনো উপায় নেই। সুতরাং ভারতও নিছক ভোটের রাজনীতির কারণে এখন যে অযৌক্তিক উন্মাদনা তৈরির চেষ্টা শুরু করেছে ভারতের সাধারণ মানুষই ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবিলা করবে। সারা ভারত জুরে হিন্দু-মুসলমান একজোট হয়ে যে প্রতিবাদের আগুন জ্বলে উঠেছে তাই এর বড় প্রমাণ।
মানুষের উপর আর বড় কিছু নেই, মানব সভ্যতার অগ্রগতির এই সারাসারেই ভরসা আমাদের।