ইতিহাসের আলোয় ৬ দফা দিবস

মনোরঞ্জন তালুকদার
৭ই জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস। স্বায়ত্ত্বশাসন ও স্বাধিকার চেতনায় আন্দোলিত জনতার আত্মহুতির দিন। এই দিন আওয়ামী লীগের ডাকে হরতালে টঙ্গী, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআর এর গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হকসহ মোট ১১ জন শহীদ হন। সেই থেকেই ৭ই জুন ঐতিহাসিক ৬ দফা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে।
১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধীদলগুলোর এক সন্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ঐ সম্মেলনে যোগদান করে এবং সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের দাবি সংবলিত এক কর্মসূচি উপস্থাপন করেন। সেটাই ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি। অবশ্য সন্মেলনের বিষয় নির্বাচনী কমিটি এ ৬ দফা দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ঐ সন্মেলন বর্জন করে এবং সাংবাদিক সন্মেলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তাঁর এই কর্মসূচি সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন। ৬ দফা কর্মসূচি প্রচারিত হওয়ার পরপর পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ এ কর্মসূচিকে সমর্থন করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, ৬ দফা আন্দোলন বাঙালির রাজনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায় এবং পরবর্তীকালে রাজনৈতিক আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে। বস্তুত, ১৯৬৬ পরবর্তী বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনভিত্তিক আন্দোলন, ৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় তথা ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের পেছনে উৎসাহ যুগিয়েছিল ৬ দফা ভিত্তিক স্পৃহা।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বাঙালির মন ও মননে, আশা ও আকাংখা, স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের চেতনা উদ্ভুত স্বপ্নের রূপরেখা ছিল ৬ দফা কর্মসূচী। পক্ষান্তরে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভাব ও ভাবনা, চিন্তা ও চেতনা, মন ও মানসিকতার বিপরীতধর্মী এক কর্মসূচি ছিল ৬ দফা কর্মসূচী। তাই বিরোধ ও বিরোধিতা, দ্বন্দ্ব ও সংঘাত ছিল অনিবার্য। ভাষার দাবিকে কেন্দ্র করে যদি পশ্চিমাদের সাথে আমাদের বিরোধের সূত্রপাত ঘটে থাকে তবে ৬ দফাকে কেন্দ্র করে সূচনা হয় বিদ্রোহের।
বঙ্গবন্ধুর ৬দফা কর্মসূচি প্রণয়নের প্রেক্ষিত অনুধাবনের জন্য আমাদের পাকিস্তান আন্দোলনের দূরবর্তী ইতিহাস পাঠের প্রয়োজন নেই। পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোতে যেভাবে ও যে প্রক্রিয়ায় বাঙালি উপেক্ষিত, বঞ্চিত ও শোষিত হয় তার প্রতিক্রিয়াই ৬ দফা কর্মসূচি প্রণয়নকে অনিবার্য করে তুলে। ৬ দফা কর্মসূচি প্রণয়নের পূর্বে কখনো রাষ্ট্র ভাষা আন্দোলন, কখনো স্বায়ত্ত¦শাসনের আন্দোলন, কখনো জনসংখ্যা ভিত্তিক আইন পরিষদ গঠনের দাবি এবং কখনো কখনো বৈষম্য দূরীকরণের দাবিতে সংঘাতের ¯্রােত উত্তরোত্তর প্রবল হয়ে উঠছিল। এই প্রেক্ষিতেই ৬দফা কর্মসূচি ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রকাঠামোর অধীনে বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ দাবি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ১৯৫০ সালের জাতীয় সন্মেলনে গৃহীত খসড়ার উপর ভিত্তি করেই ৬ দফা প্রস্তাব প্রণয়ণ করা হয়। মূলনীতি কমিটির সুপারিশের বিরোধিতা করে শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর পাল্টা প্রস্তাব হিসেবে উপরোক্ত খসড়া তৈরি করা হয়েছিল।
তাজউদ্দিন আহমেদের তত্ত্বাবধানে ছোট্ট একটি গ্রুপ মূল খসড়াটি তৈরি করে এবং পরে ১৯৬৫ সালের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমেদ ও রুহুল কুদ্দুস তা চূড়ান্ত করেন। ৬ দফা কর্মসূচি ছিল নিম্নরূপ
১ম দফা ঃ ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা করে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকার যুক্তরাষ্ট্র রূপে গড়তে হবে। সেখানে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার থাকবে। সকল নির্বাচন সার্বজনীন ও প্রাপ্ত বয়স্কের সরাসরি ভোটের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে। আইন সভা সমূহের সার্বভৌমত্ব থাকবে।
২য় দফা ঃ ফেডারেল (কেন্দ্রীয়) সরকারে এখতিয়ারে কেবল দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র এই দুইটি বিষয় থাকবে। অবশিষ্ট সমস্ত বিষয় ‘স্টেট’ (প্রদেশ) সমূহের হাতে থাকবে।
৩য় দফা ঃ এ দফায় মুদ্রা সম্পর্কে দুটি বিকল্প প্রস্তাব ছিল এবং তাদের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণের দাবি করা হয়। প্রস্তাব দুটি নিম্নরূপ ঃ
ক) পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি সম্পূর্ণ পৃথক অথচ সহজে বিনিময়যোগ্য মুদ্রার প্রচলন করতে হবে। দু অঞ্চলের জন্য দুটি স্বতন্ত্র ‘স্টেট ব্যাংক’ থাকবে। অথবা,
খ) দু অঞ্চলের জন্য একই মুদ্রা থাকবে, কিন্তু শাসনতন্ত্রে এমন এক সুনির্দিষ্ট বিধান থাকতে হবে যাতে পূর্ব পাকিস্তান হতে মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে। পাকিস্তানে একটি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে এবং দু অঞ্চলের জন্য দুটি রিজার্ভ ব্যাংক থাকবে।
৪র্থ দফা ঃ সকল প্রকার টেক্স, খাজনা ও কর ধার্য্য এবং আদায়ের ক্ষমতা আঞ্চলিক সরকারের হাতে থাকবে। আঞ্চলিক সরকারের আদায়যোগ্য অর্থের একটি নির্ধারিত অংশ আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফেডারেল তহবিলে আপনা আপনি জমা হয়ে যাবে, এ মর্মে রিজার্ভ ব্যাংকসমূহের উপর বাধ্যতামূলক বিধান শাসনতন্ত্রে থাকবে। এভাবে জমাকৃত অর্থ নিয়ে ফেডারেল সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
৫ম দফা ঃ এ দফায় বৈদেশিক বাণিজ্যের ব্যাপারে নিম্ন লিখিত শাসনতান্ত্রিক বিধানের সুপারিশ করা হয় ঃ
ক) দুই অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পৃথক পৃথক হিসাব রাখতে হবে।
খ) পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানের এখতিয়ারে এবং পশ্চিম পাকিস্তানের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা পশ্চিম পাকিস্তানের এখতিয়ারে থাকবে।
গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা দু অঞ্চল হতে সমান ভাবে অথবা শাসনতন্ত্রে নির্ধারিত হারে আদায় হবে।
ঘ) দেশজাত দ্রব্যাদি বিনা শুল্কে উভয় অঞ্চলের মধ্যে আমদানি-রফতানি চলবে।
ঙ) ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে বিদেশের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদন, বিদেশে ‘ট্রেড মিশন’ স্থাপন এবং আমদানি-রফতানি করবার অধিকার আঞ্চলিক সরকারের হাতে ন্যস্ত করতে হবে।
৬ষ্ঠ দফা ঃ পূর্ব পাকিস্তানে ‘মিলিশিয়া’ বা ‘প্যারা-মিলিটারি’ (আধা-সামরিক) বাহিনী গঠন করতে হবে।
১৯৬২ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই শীর্ষক একটি পুস্তিকায় বলা হয় যে, বৈষম্য রোধের একমাত্র কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে কতিপয় সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন ঘটাতে হবে। এই পরিবর্তনের রূপরেখা হিসেবে প্রস্তাব করা হয় যে কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশন ভেঙে দিয়ে পরিবর্তে দুটি শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিকল্পনা সংস্থা গঠন করতে হবে এবং অর্থ ও অর্থনীতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়গুলোকে (দেশের দুই অংশের জন্যে) দুই ভাগে বিভক্ত করতে হবে।
অর্থনীতিবিদদের বিশ্লেষণে দেখানো হয় যে পূর্ব থেকে পশ্চিমে সম্পদ পাচারের মূলে রয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রাভান্ডার ও বৈদেশিক সাহায্যের উপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।
মূলত আইয়ুব খানের প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনের বিরুদ্ধে এবং কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ও লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে ৬ দফা কর্মসূচি প্রণীত হয়। ১৯৫৪ সালের ২১ দফা কর্মসূচিতে কেবলমাত্র প্রতিরক্ষা এবং পররাষ্ট্র বিষয় কেন্দ্রের হাতে রেখে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ণ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দেবার জোর দাবি জানানো হয়। এক কথায় ৬ দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার সমূহ প্রতিষ্ঠার বিস্তৃত ও বাস্তব কাঠামোসম্পন্ন। এমন এক সময় এই ৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যখন বাঙালিরা ছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদারত্বের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে প্রায় আট বছর যাবত বঞ্চিত এবং শোষণের মাত্রা ছিল সীমাহীন।
সেই সময় ৬ দফা কর্মসূচি বাঙালির কাছে আসে ম্যাগনাকার্টা হয়ে। ম্যাগনাকার্টা অর্থ যেমন ‘স্বাধীনতা সনদ’ বাঙালির কাছে সমস্ত অর্থেই ৬ দফা ছিল তার মুক্তির সনদ। ব্যাপক গণআন্দোলনের পরিণতিতে ইংল্যান্ডের জনগণ যেমন ১২১৫ খ্রিস্টাব্দ রাজা জন এর নিকট থেকে এই সনদ আদায় করে নিয়েছিল বাঙালিও তেমনি এই কর্মসূচিকে সামনে রেখে আন্দোলনের নানা স্তর অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত রক্তাক্ত স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে তার সমস্ত অধিকার অর্জনে সফল হয়।
আজকের এই ৬ দফা দিবসে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, ৬ দফার আন্দোলন সহ আমাদের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী, নেতৃত্ত্বদানকারী আর আত্মদানকারী সবাইকে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, জগন্নাথপুর সরকারি কলেজ।