ঈদের আগে মানবেতর জীবন তাদের

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদী চলতির পাড়ের কমপক্ষে ২০ হাজার বারকী শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। মেঘালয় থেকে নেমে আসা পাহাড়ী নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করতে না পারায় জীবিকা সংকটে পড়েছেন শ্রমিকরা। গত প্রায় ২ মাস ধরে কর্মহীন রয়েছেন এসব শ্রমিক। সোমবার বালু-পাথর উত্তোলন করতে গিয়ে বিজিবির হাতে আটক হয়েছেন ২ বারকী শ্রমিক। এরা হলেন- সীমান্ত গ্রাম ডলুরার রুখন মিয়া ও রুখু মিয়া। শ্রমিকরা বলেছেন,‘মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা, ঈদের আগ মুহূর্তে কাজ করতে না পারলে ঈদের আনন্দ ম্লান হয়ে যাবে তাদের।’
সুনামগঞ্জ সীমান্তের পাহাড়ী নদী চলতিতে সীমান্ত গ্রাম কালীপুর, ডলুরা, শহীদ মিনার, আদাং, মথুরকান্দি, কাইয়ারগাঁও, ঝরঝরিয়া, সৈয়দপুর, ঝিনারপুর, কোচগাঁও, রতারগাঁও, বাঘবেড়, মাঝেরটেক, মনিপুর হাটিসহ সুনামগঞ্জ সদর বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কমপক্ষে ৫০ টি গ্রামের বারকী শ্রমিকরা চলতি নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গত প্রায় দুই মাস হয় এরা সীমান্তের এই নদীতে নামতেই পারছেন না। শ্রমিকরা প্রায় ১০ হাজার বারকী নৌকা পানিতে ডুবিয়ে রেখেছেন। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন এরা।
ডলুরার বারকী শ্রমিক আনোয়ার হোসেন বলেন,‘নদীতে বালু-পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করা ছাড়া বিকল্প কোন আয়ের উৎস্য নেই আমাদের। আমাদের বাঁচার অন্য কোন অবলম্বন নেই। গত প্রায় দুই মাস বেকার কাটানোয় অনেকে ঘটি-বাটিও বিক্রি করেছেন। ঈদে ছেলে- মেয়েদের একটি গেঞ্জি কিনে দেবার ক্ষমতাও নেই আমাদের। এই এলাকার মানুষের ঈদের আনন্দও নেই।’
ডলুরার শ্রমিক দেলোয়ার মিয়া বলেন,‘সীমান্তের আইন শৃঙ্খলা রক্ষা করেই মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নদী ছাড়া এতো মানুষের কর্মসংস্থান সুনামগঞ্জের আর কোথাও দেওয়া যাবে না।’
বারকী শ্রমিকদের সংগঠন বারকী শ্রমিক সংঘের সহসভাপতি নাছির মিয়া বলেন,‘দেশ স্বাধীন হবার পর চলতি নদীর পাড়ের শ্রমিকরা এমন কষ্টে পড়েনি কখনই। নদীর যে অংশে বালু-পাথর আছে, সেখানে যেতেই দিচ্ছে না বিজিবি। গেলেই আটক করা হচ্ছে। কমপক্ষে ২০ হাজার বারকী শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। মানবেতর জীবন-যাপন করছেন শ্রমিকরা। ১০ হাজার বারকী ডুবিয়ে রাখা হয়েছে। অনেক বারকী নৌকা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বাঁচার কোন পথ পাচ্ছে না শ্রমিকরা।
বারকী শ্রমিক সংঘের সভাপতি নাছির উদ্দিন বলেন,‘ঈদ আসন্ন, এর মধ্যে শ্রমিকদের করুণ অবস্থায় আমরা চিন্তিত, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে ধরণা দিয়ে লাভ হচ্ছে না। বিজিবির অধিনায়ক সাহেবের সঙ্গে দেখা করে আমরা বলেছি, মানবিক কারণে হলেও ঈদের আগ মূহূর্তে একটু সুযোগ দেন। কিন্তু সোমবারও কয়েকজন বারকী শ্রমিক বালু-পাথর উত্তোলনের চেষ্টা করেছিল। বিজিবি ২ জনকে আটক করেছে। এভাবে আমরা বাঁচবো কীভাবে ?’
জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির রোববারের সভায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মতিউর রহমান বলেছেন,‘মানুষের জন্যই আইন, সীমান্তের আইন-শৃঙ্খলাও ঠিক থাকতে হবে, মানুষও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। বারকী শ্রমিকরা নদীতে কাজ না করতে না পারলে কীভাবে জীবন চালাবে। অবশ্যই কাজের সুযোগ দিতে হবে।’
সুনামগঞ্জ বিজিবি’র ২৮ রাইফেল ব্যাটেলিয়ানের অধিনায়ক লে. কর্ণেল এসএম আবুল এহসান বলেন,‘সীমান্তের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্যই বলা হয়েছে জিরো পয়েন্টের ২০০ গজের মধ্যে কেউ বালু-পাথর উত্তোলন করতে পারবে না। এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সীমান্ত সম্পর্ক ভালো রাখার জন্য। সোমবার আটককৃত ২ জন সীমান্ত অতিক্রম করে বালু-পাথর উত্তোলন করে ফেরার সময় আটক হয়েছে। মানবিক বিবেচনা আমাদেরও আছে, কিন্তু শ্রমিকদের কিছু বিষয় বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।’