ঈদ নিয়ে তেলেসমাতি

হাসান শাহরিয়ার
আমার বয়সী যারা তারা খুব ভাগ্যবান। আমরা স্থিতিশীল পৃথিবীকে অস্থিতিশীল হতে দেখেছি। প্রেম-প্রীতি ও ভালোবাসার স্থান দখল করে নিয়েছে ঘৃণা, হিংসা ও কলহ। মানবতা এখন বই-পুস্তকে বন্দি। আমাদের জীবদ্দশায় ভারত ব্রিটিশের কবল থেকে স্বাধীনতা লাভ করে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে, জন্ম নিয়েছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান। যুক্তরাজ্যের সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বাধীনতা দেওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা অব্যাহত রয়েছে। চীনে গণবিপ্লব ঘটেছে, এখন পুঁজিবাদের থাবা বিম্ফোরিত হচ্ছে। চাঁদে মানুষের পদধূলি পড়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালিরা পাকিস্তান থেকে ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতা, অভ্যুদয় ঘটেছে বাংলাদেশের। হিজরি, বাংলা ও ইংরেজি সাল এক শতাব্দী থেকে আরেক শতাব্দীতে পদার্পণ করেছে। কমিউনিস্ট ফেডারেশন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ছারখার হয়ে গেছে। মিয়ানমার বা বার্মায় সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় ‘গণতন্ত্র’ কায়েম হয়েছে, সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গাদের কচুকাটা করে জীবিতদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কানে তুলো দিয়ে, চোখে রঙিন চশমা পরে ও পায়ের ওপর পা তুলে ‘গণতন্ত্রের মানসকন্যা’ অং সান সু চি গণহত্যা সমর্থন করায় তার প্রাপ্ত একের পর এক আন্তর্জাতিক পুরস্কার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার যুদ্ধংদেহী কূটকৌশলের কাছে আফগানিস্তান সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে। আমেরিকার বিরোধিতা করায় ইরাকি নেতা সাদ্দাম হোসেন ও লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী স্টেট বা আইএসের উত্থান হয়েছে, ইসলামের ভুল ব্যাখ্যার কারণে বহু তরুণ যুদ্ধ করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। ঢাকায় একটি রেস্টুরেন্টে বিদেশিদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে, নিউজিল্যান্ডে জুমার নামাজ আদায় করতে গিয়ে এক উ™£ান্ত যুবকের গুলির শিকার হতে হয়েছে অসংখ্য মুসলমানকে।
তবে এর আগে আমরা যা দেখিনি তা হলো, এক দেশে তিন দিনে ঈদুল ফিতর পালিত হওয়া। এই বিস্ময়কর কাজটি ঘটেছে মুসলিমপ্রধান বাংলাদেশে। আমাদের এক পা যখন ভূপৃষ্ঠে ও অন্য পা কবরস্থানে, তখন এই অভূতপূর্ব ঘটনার সাক্ষী হতে পেরে আমরা নিজেকে ধন্য মনে করছি। চন্দ্রদর্শন কমিটির ‘বিজ্ঞ’ সদস্যরা যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন, তা নিশ্চয়ই গিনেজ বুকে স্থান পাবে এবং অন্য মুসলিম দেশ তা অনুসরণ করবে।

এ ধরনের খামখেয়ালিপনা নতুন নয়। পাকিস্তান আমলে দুই দিনে ঈদ উদযাপনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিম পাকিস্তানে চাঁদ দেখা না গেলে ঈদের দিন পিছিয়ে যেত। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কখনও তা মানত, আবার কখনও তা গ্রাহ্য করত না। গত ১০-১৫ বছর আগে সরকারি ঘোষণায় বলা হয়, দেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি; তাই আগামীকাল ঈদ হবে না। কয়েক ঘণ্টা পর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে বলা হয়, চাঁদ দেখা গেছে। অতএব কাল ঈদ।
এবারের ঈদ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অ্যাসস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটির একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তির প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। গত ২১ মে সোসাইটির প্রেস সেক্রেটারি মামুন আহমেদ শরীফ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানান, ‘আগামী ৩ জুন ২০১৯ সোমবার বিকেল ৪টা ২ মিনিটে বর্তমান চাঁদের অমাবস্যা কলা পূর্ণ করে নতুন চাঁদের জন্ম হবে। চাঁদটি ওইদিন সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তরেখা থেকে ১ ডিগ্রি নিচে ২৯২ ডিগ্রি দিগংশে অবস্থান করবে। তাই ওইদিন চাঁদের কোনো অংশই দেশের আকাশে দেখা যাবে না। চাঁদটি পরদিন ৪ জুন মঙ্গলবার সন্ধ্যা ৬টা ৪২ মিনিটে সূর্যাস্তের সময় দিগন্তরেখা থেকে ১১ ডিগ্রি ওপরে ২৮৯ ডিগ্রি দিগংশে অবস্থান করবে এবং ৫৮ মিনিট দেশের আকাশে অবস্থান শেষে সন্ধ্যা ৭টা ৪১ মিনিটে ২৯৪ ডিগ্রি দিগংশে অস্ত যাবে। এই সময় চাঁদের ১ শতাংশ অংশ আলোকিত থাকবে এবং দেশের আকাশ মেঘমুক্ত পরিস্কার থাকলে একে বেশ স্পষ্টভাবেই দেখা যাবে। এই সন্ধ্যায় উদিত চাঁঁদের বয়স হবে ২৬ ঘণ্টা ৪০ মিনিট এবং সবচেয়ে ভালোভাবে দেখা যাবে সন্ধ্যা ৭টা ৮ মিনিটে। সুতরাং ইসলামী নিয়ম অনুযায়ী আগামী ৪ জুন সন্ধ্যায় নতুন চাঁদ দেখাসাপেক্ষে আগামী ৫ জুন ২০১৯ বুধবার থেকে আরবি ১৪৪০ হিজরি ‘শাওয়াল’ মাসের গণনা শুরু হবে এবং ওইদিনই পবিত্র ঈদুল ফিতর পালিত হবে।’ চন্দ্রদর্শন কমিটির কেউ বোধহয় বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে প্রদত্ত এই বিজ্ঞপ্তিটি দেখেননি অথবা তা আমলে নেননি।
আমি কোনো ইসলামী চিন্তাবিদ নই। ইসলাম সম্পর্কে আমার ধারণা অত্যন্ত সীমিত। তবে চন্দ্রদর্শন সাপেক্ষে রোজা যে ২৯ বা ৩০টি হয়, তা আমার মতো প্রতিটি মুসলমানেরই জানা আছে। চাঁদ দেখা না গেলে রোজা রাখতে হবে- এই কথাটি যেমন সত্য, তেমনি পশ্চিমের কোনো দেশে চাঁদ দেখা গেলে পরদিন বাংলাদেশের আকাশে যখন তা উদিত হবে, তখন তার বয়স ২৪ ঘণ্টার বেশি হবে। সবকিছু বিবেচনা করলে পরদিনই ঈদুল ফিতর। কিন্তু তা না করে রোজা রাখলে সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। গত সোমবার ৩ জুন সৌদি আরবে চাঁদ দেখা যাওয়ার পর ৪ জুন সে দেশে ঈদ উদযাপিত হয়। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের আকাশ পরিস্কার ছিল না। ফলে ৪ জুন কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আকাশে চাঁদ ওঠেনি। নিয়মমতো চাঁদ ঠিকই উঠেছিল; কিন্তু আকাশ অপরিস্কার থাকায় তা দেখা য়ায়নি। তাই বলে কি রাত ৯টার দিকে এই ঘোষণা দেওয়া যায় যে, বাংলাদেশের কোথাও চাঁদ দেখা যায়নি; অতএব বৃহস্পতিবারে (৬ জুন) ঈদ। সরকারের এই ঘোষণা শুনে আমার মতো লাখো কোটি মুসলমান তারাবির নামাজ আদায় করেন। কিন্তু রাত সোয়া ১১টার দিকে আরেকটি ঘোষণা এলো :বাংলাদেশে চাঁদ দেখা গেছে, আগামীকাল ঈদ।
চন্দ্রদর্শন কমিটির এই অবিমৃশ্যকারিতায় বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ স্তম্ভিত হয়ে যায়। রাত ৯টার মধ্যে চাঁদ দেখা গেল না অথচ চাঁদ ডুবে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর রাত সোয়া ১১টায় চাঁদের পুনরাবির্ভাবের খবর তেলেসমাতি ভিন্ন অন্য কিছু নয়। জাদুর পরশে কিংবা বেহেশতের পবিত্র পানীয় শরাবন তহুরার মোহনীয় গুণেই এমন ঐন্দ্রজালিক ঘটনা ঘটতে পারে। চন্দ্রদর্শন কমিটির এই বিতর্কিত সিদ্ধান্ত জনগোষ্ঠীর সবাই মেনে নেয়নি। কিছুসংখ্যক লোক ৫ জুন রোজা রেখে ৬ জুন বৃহস্পতিবার ঈদ উদযাপন করেছে। অন্যদিকে, সরকারি সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে অধিকাংশ মুসলমান ৫ জুন বুধবার ঈদের জামাতে শরিক হন। বেশ কয়েক বছর ধরে আরেকটি নতুন গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেছে। সৌদি আরবে বৃষ্টি হলে তারা বাংলাদেশে ছাতা ধরে। পূর্বের ঢাকা ও পশ্চিমের জেদ্দার মধ্যে দূরত্বের ব্যবধান ৫,২৩১ কিলোমিটার হলেও তারা সৌদি আরবের পদাঙ্ক অনুসরণ করে রিয়াদের ঘোষিত দিবসেই রোজা রাখে ও ঈদ পালন করে। ফলে তাদের রোজা শুরু হয় ৬ মে এবং ঈদ হয় ৪ জুন। এসব অনুসারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। তাই বাংলাদেশে তিন দিনে ঈদ পালনের ঘটনা অবিস্মরণীয়।
চাঁদ দেখা এবং পরস্পরবিরোধী দুটি ঘোষণা দিয়ে চন্দ্রদর্শন কমিটি দেশের মুসলমানদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলেছে। চাঁদ দেখার জন্য সরকার তাদের সব সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এমনকি হেলিকপ্টারে চড়ে কমিটির সদস্যরা চাঁদ দেখার মহড়া করেন। এই ছিনিমিনি খেলার খেলোয়াড়দের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। তারা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে। অতএব তাদের এই উজবুকি কাজের দায়ভার সরকার নিতে পারে না। দেশবাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরে এ ব্যাপারে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তা জানতে।
প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্নেষক কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেএ) ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস