ঈদ মোবারক আচ্ছালাম

মাও: কাজী শাহেদ আলী এম.এম
পবিত্র রমজানের রোজার শেষে আমাদের মাঝে হাজির হয় পবিত্র ঈদুল ফিতর। ঈদ উৎসব মুমিন, গায়ের মুমিন, আবেদ, ফাসেক সকলেই অংশগ্রহণ করে থাকেন। সকলেই ইহাকে সেরা খুশির দিন মনে করেন। অবশ্যই  খোদাভীরু রোজাদারদের আবেদ পরহেজগার লোকের জন্যই পবিত্র ঈদুল ফিতর। ইহা শুধু আল্লাহতা’লার রাজি ও খুশি হাছিলের লক্ষ্যেই উদ্যাপন করেন। ঈদ অর্থের দিকে লক্ষ্য করলেই ঈদের দিন আল্লাহতা’লা স্বীয় বান্দাগণকে আনন্দ ও খুশি দান করেন বলে এই দিনটির নাম ঈদ রাখা হয়েছে।
গুনিয়াতুত্বালিবীন কিতাবে আছে ওয়াহাব ইবনে মারাহ (রাঃ) বলেন, হুজুর পাক (সাঃ) এরশাদ করিয়াছেন ঈদের দিন আল্লাহতা’লা বেহেস্ত সৃষ্টি করেছেন এবং ঈদের দিনই তুবা নামক বৃক্ষ বেহেস্তের মধ্যে রোপণ করেছেন। ঈদের দিনই ফেরেস্তা হযরত জিব্রাইল (আঃ) কে ওহী বহন করার জন্য মনোনীত করা হয়েছে এবং এই দিনেই ফেরাউনের পক্ষীয় জাদুকরগণ হেদায়াতের আলোপ্রাপ্ত হয়েছিল। হুজুর পাক (সাঃ) আরো এরশাদ করিয়াছেন যে, ঈদের দিন রোজাদার লোকগণ যখন ঈদের নামাজ আদায় করতে ঈদগাহে যায়, তখন আল্লাহতা’লা তাদেরকে লক্ষ্য করে বলেন যে, ‘হে আমার বান্দাগণ তোমরা আমার উদ্দেশ্যে রোজা রেখেছ এবং আমারই খুশির জন্য ঈদগাহে এসেছ এখন আমার পুরস্কার নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করো।’ হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, হুজুরেপাক (সাঃ) এরশাদ করেছেন, সমগ্র রোজাদারকে আল্লাহতা’লা ঈদের রাত্রে যাবতীয় নিয়ামত দান করে থাকেন। ঈদের দিনে প্রত্যুষে আল্লাহতা’লা ফেরেস্তাদেরকে আদেশ করেন যে, তোমরা দুনিয়াতে গমন কর, ফেরেস্তাগণ আল্লাহর হুকুমে দুনিয়াতে আগমন করে রাস্তাঘাট, হাট ও বাজার মানুষের সমাবেশ উচ্চস্বরে বলতে থাকেন, হে আখেরী নবী (দঃ) উম্মতগণ! তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে অগ্রসর হও। আজ তোমাদের স্বল্প মূল্যের সম্পদের বদলে অমুল্য বস্তুদান করা হবে। তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করা হবে। ফেরেস্তাদের এই ঘোষণা জ্বীন ও ইনছান ব্যতীত অন্যান্য সকল জীবই শুনতে পায়। যখন লোকগণ নামাজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় এবং নামাজ পড়তে দাঁড়ায় ও দোয়া পাঠ করে তখন আল্লাহতা’লা বান্দাদের সমস্ত আশা পূর্ণ করে দেন।
ঈদুল ফিতরের আরও অনেক ফজিলত, রহমত, বরকত ও নাজাত সমৃদ্ধও রয়েছে। ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ রোজা। রোজা রাখা সম্মন্ধে আল্লাহপাক পবিত্র কোরআন শরীফে ফরজ ঘোষণা করেছেন। পবিত্র হাদীস শরীফে রোজা রাখার পুরস্কার আল্লাহতা’লা নিজ হাতে প্রদানের ওয়াদা করেছেন। এছাড়াও সেহরী ও ইফতার সম্মন্ধে হযরত রাসুলে কারীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন, হে রোজাদারগণ তোমরা সেহরী খাও। যে এই নিয়ামত খাবে রোজ হাসরে তার কোন হিসাব হবে না।
রমজানের প্রথম ভাগে আল্লাহর রহমত মধ্যভাগে মাগফিরাত অর্থাৎ গুনাহ মাফ ও শেষ ভাগে জাহান্নাম হতে মুক্তি। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত হয়েছেÑ হযরত রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি এশার নামাজের বাদে অর্থাৎ এশার চার রাকাত ফরজ ও দুই রাকাত ছুন্নতের বাদে ও তিন রাকাত বিতরের আগে তারাবিহর নামাজ আদায় করবে। তার সমস্ত গুনাহ মাফ করা হবে। জ্ঞাতব্য বিষয় এই তারাবীহর নামাজ বিশ রাকাত হযরতের ছুন্নত।
লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আল্লাহতা’লা  পবিত্র কোরআন শরীফে উল্লেখ করেছেন, শবে কদর হাজার মাসের রাত্রি হতে অতি উত্তম রাত্রি। হাদীসে শরীফে হযরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হযরত রাসুলেকারীম (সাঃ) এরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছোয়াবের জন্য সবে ক্বদরে দন্ডায়মান হয় অর্থাৎ নামাজ পড়ে তার অতীতের সমুদয় গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ইহা পরকালে নাজাতের খুশীর সংবাদ বটে। ইতিবাচক সম্মন্ধে হুজুরপাক (সাঃ) এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি একদিন ও ই’তিকাফে বসবে আল্লাহতা’লা কেয়ামতের দিন তার মধ্যে এবং দোযখের মধ্যে তিন খন্ডক দূরত্বের ব্যবধান করবেন। এক খ-ক পাঁচ শত বৎসরের রাস্তা। তাহাজ্জুতের নামাজ এর ব্যাপারে হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন নিদ্রা বা অসুস্থতাবশত কোন রাতে যদি আল্লাহর নবী (সাঃ) তাহাজ্জুদ আদায় করতে অক্ষম হতেন তবে দিনের বেলায় বার রাকাত নামাজ কাব্জা স্বরূপ আদায় করতেন।
হযরত ওসমান গণী (রাঃ) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি সারারাত জাগ্রত থাকতেন এবং নামাজের মাত্র এক রাকাতেই সমস্ত কোরআন শরীফ খতম করতেন (ছুবহান আল্লাহ)। তাবেয়ীনদের মধ্যে চল্লিশ জন বিশেষ ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বর্ণিত আছে- যে তারা সারারাত জাগ্রত থাকিয়া ইবাদত বন্দেগীতে অতিবাহিত করতেন। চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত তারা এশার অজুর দ্বারা ফজরের নামাজ আদায় করেছেন। মোনাকেবে মোহাম্মদী কিতাবে লিখিত আছে পবিত্র রমজান শরীফের মাসে ১৫টি রহমত নাজিল হয়।
১। রিজিক প্রশস্ত হয়। ২। ধনজন বৃদ্ধি হয়। ৩। যাহা কিছু এই মাসের মধ্যে খাওয়া যায় তাহা আল্লাহর ইবাদতে মধ্যে গণ্য হয়। ৪। ইবাদত ও নেক কাজ ইত্যাদি দ্বিগুণ বৃদ্ধি করিয়া দেওয়া হয়। ৫। আসমান জমিনের সমস্থ ফেরেস্তা তাহার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতে থাকে। ৬। সমুদয় শয়তান বন্দী হয়। ৭। রহমতের দরজা অতি প্রশস্ত হয়। ৮। বেহেস্তের দরজা খুলিয়া দেওয়া হয় ও দোজখের দরজা বন্ধ করিয়া দেওয়া হয়। ৯। রমজানের প্রত্যেক রাত্রে সাত লক্ষ গুনাহগারদেরকে জাহান্নাম হইতে মুক্তি করিয়া দেওয়া হয়। ১০। রমজানে প্রত্যেক শুক্রবার ্র রাতে এই পরিমাণ গোনাহাগার আজাদ হয়, সেই পরিমাণ সাত দিনে আজাদ হয়। ১১। রমজানের শেষ রাত্রে সমস্ত মানুষের সমস্থ গোনাহ মাফ করিয়া দেওয়া হয়। ১২। প্রত্যেক মুমিন রোজাদারদের জন্য বেহেস্ত সজ্জিত করা হয়। ১৩। রোজাদারের দোয়া কবুল হয়। ১৪। রোজাদারদের শরীর সমস্ত গোনাহ হইতে পবিত্র হয়। ১৫। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।
পবিত্র ঈদুল ফেতরকে জানাই ঈদ মোবারক আচ্ছালাম।
লেখক : জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ পদকপ্রাপ্ত সুপার, ইয়াকুবিয়া দাখিল মাদরাসা মীরেরচর, সদর, সুনামগঞ্জ।