উত্তম চিকিৎসকের নিকট উত্তম সেবাই প্রত্যাশিত

সংগত কারণেই প্রধানমন্ত্রী দেশের সরকারি কাঠামোয় কর্মরত চিকিৎসকদের বিষয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, ‘পদ আমরা সৃষ্টি করে দিয়েছি, নিয়োগও আমরা দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু সেখানে আমরা ডাক্তার পাই না।’ আমরা যদি আমাদের জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দিকে তাকাই তাহলেই প্রধানমন্ত্রীর বিরক্তির মর্মার্থ ভালভাবে অনুধাবন করতে পারি। জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে যে পরিমাণ চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে সম্ভবত তার দুই তৃতিয়াংশ পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। কালেভদ্রে কাউকে এ জেলায় পদায়িত করা হলেও হয় তিনি এখানে না এসেই নানা কৌশলে বেতন ভাতা গ্রহণ করেন অথবা যোগদান করলেও তদবির করে অল্প দিনের ভিতরই অন্যত্র চলে যান। এমন বাস্তবতার কারণে জেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবাদান কাঠামোটি কখনও খুব বেশি জনসেবী প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠতে পারেনি। অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি থাকলেও হয় অপারেটরের অভাবে অথবা আনুষাঙ্গিক সুবিধাদি না থাকার কারণে সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। মানুষ যেমন সরকারি হাসপাতালে কোন ছোট ধরনের পরীক্ষাও করাতে পারেন না তেমনি কোন অসুখ বিসুখে পূর্ণাঙ্গ সেবা প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হন। প্রধানমন্ত্রীর এসব বিষয় জানা। তাই তিনি আগেও বলেছিলেন, যারা সরকারি চাকুরি করতে চান না তারা যেন চাকুরি ছেড়ে দেন, সেক্ষেত্রে নতুন নিয়োগ দিয়ে ডাক্তার আনা হবে। কিন্তু চিকিৎসকরা সেবা দানের ব্যাপারে যতটা নিরুৎসাহী ততটাই উৎসাহী চাকুরি টিকিয়ে রাখতে। এমন প্রেক্ষাপটে সোমবার এক ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর এই বিরূপ মন্তব্য থেকে যদি এদেশের চিকিৎসকরা একটি বার্তা পেয়ে সেটি ধারণ করেন তাহলেই মঙ্গল।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই এখন পর্যন্ত আর্থিক স্বচ্ছলতার দিক দিয়ে প্রািন্তক পর্যায়েই অবস্থান করেন। বেসরকারি কাঠামো থেকে চিকিৎসা সেবা পেতে যে পরিমাণ টাকা ব্যয় করতে হয় সেই পরিমাণ টাকা খরচের সঙ্গতি এই দেশের সিংহভাগ মানুষের নেই। এই বিপুল জনগোষ্ঠী তাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠানগুরোর দিকে মুখিয়ে থাকে। কিন্তু এখানে প্রত্যাশিত সেবা দান পরিবেশ না থাকায় আমাদের ওই গরিষ্ট জনগোষ্ঠী মূলত আধুনিক চিকিৎসা সেবা থেকে আজীবনই বঞ্চিত থেকে যান। অথচ স্বাস্থ্যসেবা জনগণের সংবিধান স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার।
চিকিৎসকরা সেবাদানকারী হিসাবে মানুষের মনে অনেক উঁচু স্থানে অবস্থান করেন। চিকিৎসকরা মানুষের জীবন রক্ষা করেন। এই উচ্চ ভাবমূর্তির জায়গা থেকে ক্রমশ চিকিৎসকরা সরে এসে নিজেদের পার্টিজান চরিত্র স্পষ্ট করে তুলছেন। এর সর্বশেষ উদাহরণ হল, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা নিয়ে স্বাচিপ ও ড্যাব এমন রাজনৈতিক বিভাজন রেখার মাধ্যমে চিকিৎসকদের বিভক্ত করে রাখার মনোভাব। একটি সেবাদান পেশায় জড়িত পেশাজীবীগণের পরিচয়ের এমন রাজনীতিকরণ চরম দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এই জায়গা থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাই। চিকিৎসকরা শুধু ভাল জায়গায় পদায়ন পাওয়ার জন্য সরকারি দলের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়ে থাকবেন, সেটি কখনও কাম্য নয়। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও সেটি চান না। যা তাঁর বক্তব্য থেকেই বুঝা যায়। আমাদের ভরসার আশ্রয়স্থল চিকিৎসক সমাজ যদি প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষা বুঝতে পারেন তাহলে অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটতে সময় লাগার কথা নয়। আমরা সেই শুভ দিনের প্রত্যাশায় থাকলাম। উত্তম চিকিৎসকের নিকট থেকে আমরা সর্বদাই উত্তম সেবা পেতে আগ্রহী।