উত্তরসূরিদেরকে মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে যেতে পারি না

ইকবাল কাগজী
চমকপ্রদতার দিক থেকে বিষয়টি এক কাঠি বাড়া। অন্তর্নিহিত মর্মার্থ বিশ্লেষণ করলে সহজেই অনুধাবন করা যাবে, এটি একটি মহাকর্মকা- এবং তাৎপর্যের দিক থেকে লঙ্কাকা-ের চেয়ে কীছুতেই খাট কীছু নয় বরং তার মধ্যে নিহিত আছে জাতিগত অবিমৃষ্যকারিতার একটি ধরন, যাকে বলে গিরগিটিপনার মুন্সিয়ানার ঐতিহাসিক মুসাবিদা প্রস্তুতের কল্যাণে মিথ্যাকে সত্যি করে তোলার ভয়ঙ্কর বাসনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতি নিরাপোশ ও একান্ত নিবেদিত প্রাণ কালের কণ্ঠের সাংবাদিক শামস শামীম বিষয়টিকে আবেগে উদ্বেলিত হয়ে বর্ণনা করেছেন, ‘কবর স্থানান্তরে সন্তানের লড়াই’ বলে। একরম আবেগদীপ্ত একটি ঐতিহাসিক ঘটনা সত্যিকার অর্থেই গৌরবোজ্জ্বল ঘটনায় পর্যবশিত হতে পারতো, যদি বিষয়টি নিয়ে মতান্তর দেখা না দিত।
চিকিৎসার্থে ঢাকায় ছিলাম, তখনই খসরু ভাইর (বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু) সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। জানিয়ে ছিলেন, হোসেন বখ্ত স্মারকগ্রন্থের খসড়া পা-লিপির চূড়ান্ত সংশোধনের কাজে সিলেট যাবেন, আমাকেও তাঁর সঙ্গে যেতে হবে। কথা দিয়েছিলাম। যেদিন রাতে ঢাকা থেকে ফিরলাম, তার পরের দিন ২৬ মার্চ সকালে ঘুম থেকে ওঠেই প্রথমে খসরু ভাইর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো। সেদিনই এগারোটার দিকে সুনামগঞ্জ খবরের কার্যালয়ে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দিলেন। যাত্রার জন্য তাঁর নিজস্ব গাড়িটি প্রস্তুত থাকবে। গাড়িতে উঠার আগে স্থানীয় দৈনিক সঙ্গে নিলাম। খসরু ভাই দৈনিক সুনামকণ্ঠে প্রকাশিত ‘কবর স্থানান্তরে সন্তানের লড়াই’ লেখাটি পড়লেন এবং শামস শামীমের সঙ্গে তৎক্ষণাৎ মুঠোফোনে আলাপ করলেন। আমি ও আমার এক কবিবন্ধু শুনলাম। ঘটনা কতটা গুরুতর না জানলেও, এটুকু বোঝা গেলো যে, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ কবিরের নিহত হওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁর জানার ঝুলিতে আছে। কারণ আহমদ কবির যে যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন সে-যুদ্ধক্ষেত্রেই ক্যাপ্টেন হেলালের অধীনে খসরু ভাই কর্মরত ছিলেন। এ বিষয়ে তিনি আলাপ খোলতাই করতে ও রাখতে খুব একটা আগ্রহী হলেন না। তারপরও যা জানা গেলো, একটি বিষয়কে পরিপূর্ণভাবে বুঝতে পারার জন্য তাই যথেষ্ট। তবে সঙ্গত কারণে আজ এখানে তাঁর বক্তব্য পুরোটাই বেমালুম চেপে যাওয়া হলো। আমার মনে হয় তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে এখানে তা পত্রস্থ করা সমীচীন হবে না। এ ব্যাপারে সংযত হওয়াই আপাতত মঙ্গল। অন্যথায় সম্পূর্ণ বিষয়টি নিছক পরচরিতচর্চারূপ পরনিন্দায় পর্যবশিত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে, যা সঙ্গত কারণেই হয়ে উঠতে পারে অনৌপপত্তিক। সুতরাং সে-পথে পদার্পণ না করাই আপাতত কর্তব্য।
এইখানে শুধু এইটুকু বলে রাখি যে, পরচরিতচর্চায় পারদর্শী বাঙালি সত্যিকার অর্থেই পরাৎপর। কিন্তু তার এই পরচরিতচর্চা যতোটাই নিন্দার নিদান থেকে জাত ততোটাই আবার ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে অসার। কারণ পরচরিতচর্চা পরোপুরি অনৌপপত্তিক, যাকে বলে যুক্তিতর্ক দ্বারা প্রতিপন্ন বা প্রতিষ্ঠিত নয়, ঐতিহাসিক বাস্তবতাবহির্ভূত। বিস্মৃত হলে চলবে না যে, পরচরিতচর্চা স্বকপোলকল্পিত বিধায় সঙ্গত কারণেই বাস্তবের সঙ্গে যৎপরনাস্তি অসেতুসম্ভব একটি বিষয়, যার ইতিহাসের মসলা হওয়ার একেবারেই কোনও উপযুক্ততা নেই। পরচর্চার (সচরাচর যা নিছক পরনিন্দা হয়ে উঠে) বিপরীতে বাঙালির আত্মচর্চা আদ্যন্ত আত্মম্বড়িতায় আবিল ও আবিষ্ট বলে সেটা অলৌকিক আত্মকথা হলেও সচরাচর লৌকিক ইতিহাসচর্চার সার্থকতায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। বাঙালির আত্মকথা কিংবা পরকথা যাই বলি না কেন, সেটা ইতিহাসচর্চা বলতে যা বুঝায় তার পরিব্যাপ্তিকে সচরাচর স্পর্শ করতে অপারগ, বাঙালির ইতিহাসে ইতিহাসচর্চার নিয়তি এটাই। বাঙালি ইতিহাসকে বিকৃত করতে জানে, পরিপুষ্ট করতে জানে না। ইতিহাসচর্চায় মনোনিবেশ করে স্বকলঙ্ক ভঞ্জনের নিমিত্ত ঘটনাবহির্ভূত ঘটনার সন্নিবেশ করতে বাঙালি সাতিশয় দক্ষ, অসম্ভবকেও সম্ভব করে তুলতে কোনও কার্পণ্য করে না। বাঙালির এইরূপ অদ্ভুত ইতিহাসচর্চার কারণে সচরাচর ইতিহাস চাপা পড়ার ঘটনা ঘটেই চলেছে, প্রতারিত হচ্ছে উত্তরসূরিরা।
পরে অবশ্য কোনও এক সূত্র থেকে জেনেছি এই আহমেদ কবির মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বটে, কিন্তু যুদ্ধ করতে গিয়ে তাঁর মৃত্যু হয়নি, তাঁর মৃত্যু হয়েছে যুদ্ধের ডামাডোলের অবকাশে লুটপাটের অপরাধ সংঘটনের শাস্তি স্বরূপ এবং সে-শাস্তির ব্যবস্থাপক ছিলেন স্বয়ং ক্যাপ্টেন হেলাল। এমতাবস্থায় লিখিত ও অলিখিত কোন প্রচারণাটিকে সত্যি বলে গ্রহণ করা সমীচীন? সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্যিসত্যিই কঠিন হয়ে উঠে। নয় মাসের যুদ্ধে ৩০ লক্ষ বাঙালিকে হত্যা করেছে পাকিস্তানিরা। এইসব নিহত বাঙালির প্রত্যকেই শহিদ। কিন্তু তারা প্রত্যেকেই মুক্তিযোদ্ধা নন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধার একটা আলাদাত্ব আছে। কোনও অপরাধের দ- হিসেবে মৃত্যুবরণকারী মুক্তিযোদ্ধাকে শহিদের মর্যাদা দেওয়ার মধ্যে কোনও সার্থকতা নিহিত আছে বলে মনে হয় না। মিথ্যা তথ্য প্রতিস্থাপন করে সরকারকে প্রতারিত করে কোনও সুবিধা অর্জন, তা হতেই পারে, কিন্তু পরবর্তীতে তার অপনোদন অসম্ভব তা তো নয়। ইতিহাসের নিয়তি একটাই : সত্যের জয় মিথ্যার ক্ষয়।
আমরা এমন এক জাতি, রাষ্ট্রের স্থপতি স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে পর্যন্ত মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে ব্যাপৃত থেকেছি দশক দু’য়েকেরও বেশি কালব্যাপী, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনীতিবিদেরা সে-মিথ্যা প্রচারণায় কলকাঠি নেড়েছেন । এই মিথ্যাচারের সঙ্গে ওতপ্রোত জাতির সঙ্গে প্রতারণা করার অপরাধের কোনও বিচার হলো না। মিথ্যায় মগ্ন থাকা এবং মিথ্যাকে প্রশ্রয় দেওয়া বোধ করি আমাদের কারও কারও একান্ত মজ্জাগত, সূর্য পশ্চিমে উদয় হওয়া হয় তো সম্ভব, কিন্তু কখনও মিথ্যাকে প্রশ্রয় না দেওয়া আমাদের কারও কারও পক্ষে কখনওই সম্ভব নয়।
অমুক্তিযোদ্ধা থেকে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার ঘটনা দেদার ঘটছে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে। এ দেশে চিহ্নিত রাজাকার মুক্তিযোদ্ধার তকমা গায়ে সেঁটে নিয়ে একাত্তরে ধর্ষিতা নারীকে উপহাস করে চলেছে দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছর ধরে এবং খবরদারি করছে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে এক পঙক্তিতে দাঁড়িয়ে এবং প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করছে এমনভাবে যে, সেটাকে সংশোধন করারও কোনওরকম অবকাশ রাখছে না। তারা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছে এমনভাবে যে, তার বিরোধিতা করাও প্রকারান্তরে বিপদকে ঘাড়ে চাপানোর সামিল, আইনি ঝামেলায় নিজেকে জড়ানো। চিহ্নিত মুক্তিযোদ্ধাদেরই কেউ কেউ চিহ্নিত রাজকারদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন, যৎসামান্য আর্থিক সুবিধা লাভের বিনিময়ে। তারা মুক্তিযুদ্ধকে মুক্তবাজার অর্থনীতির মুক্তবাজারে মুক্ত পণ্য করে তোলেছেন, যে-পণ্যের একমাত্র মালিক মাত্র তারা ক’জন পথভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের মুক্তিযুদ্ধবিমুখ পথ অনুসরণ করা যে একটি আত্মপ্রবঞ্চনার বিষয় এবং এই আত্মপ্রবঞ্চনার কারণে দেশের উন্নয়ন কতোটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে তা বলে কয়ে বুঝানোর কোনও বিষয় নয়, বরং তা চেতনাকে পরিপক্ক করে গভীরভাবে উপলব্ধি করার বিষয়।
এমন ঘটনা হয় তো ঘটে গেছে, যা কারও কাম্য ছিল না। ধরা যাক, কোনও একজন যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি, তিনি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তিনি কোনও কারণে বা হয় তো ভুলবশতই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ঘটনাচক্রে নিহত হলেন। এমনটি হতেই পারে। কিন্তু যুদ্ধোত্তর সময়ে নিহতের পরিবার তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা সাজানোর অভিপ্রায়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তাঁর মৃত্যুবরণের মিথ্যা প্রচারে ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠলেন এবং প্রতিষ্ঠা করলেন মিথ্যাকে সত্য হিসেবে। অন্য আর একটা ঘটনা হতে পারে এমন, তিনি ছিলেন বটে মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু সুযোগে তিনি হত্যা, লুট, ধর্ষণ ইত্যাদি অপকর্মে লিপ্ত করলেন নিজেকে এবং এই অপরাধের শাস্তি স্বরূপ মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই তাঁর মৃত্যু হলো। যুদ্ধোত্তরকালে তাঁর পরিবার মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে তাঁর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি আদায় করে সে-স্বীকৃতিকে নিজেদের সামাজিক, রাজনীতিক ফায়দা লুটার হাতিয়ার করে তোললেন। দু’টি ঘটনাতেই মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে এবং প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা হয়েছে। অথচ শাল্লা উপজেলার চোরের গাঁও খ্যাত গ্রামগুলিতে যে-সব যোদ্ধা একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন এবং সম্মুখসমরে মৃত্যুবরণ করেছেন সমাজ-রাষ্ট্র তাদেরকে কোনও স্বীকৃতি দেয়নি। সেখানে যে-সব নারী পাকিস্তানি ও রাজকার বাহিনীর দ্বারা ধর্ষিত ও নির্যাতীত হয়েছিলেন তারাও পেলেন না কোনও স্বীকৃতি, যে-স্বীকৃতির প্রকৃত দাবিদার তাঁরা। তাঁদের যারপরনাই অসচ্ছল অবস্থায় এই স্বীকৃতি হয়তো তাঁদেরকে সংসার জীবনে একটু স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারতো, তাঁদের তো সামাজিক মর্যাদার লোভ ছিল না। তাঁদের স্বীকৃতির দাবি উপেক্ষিত রইলো যুদ্ধোত্তর সাতচল্লিশ বছর পরেও। ইতোমধ্যেই অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছেন। অন্যদিকে যাঁরা আদতেই মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়ার কোনওই যোগ্যাতা রাখেন না, যেহেতেু তাঁরা বা তাঁদের পরিবার সমাজসংসারে অর্থবিত্ত ও রাজনীতিক শক্তির অধিকারী, ঠিকই তাঁরা উচ্চমহলে যোগাযোগ সম্পন্ন করে নিজেদের স্বীকৃতি আদায়ের পরাকাষ্টা প্রদান করতে কার্পণ্য করেননি। এই মিথ্যার সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের কি কীছুই করণীয় নেই? অমুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা ভোগ করবে বলেই কি মুক্তিযোদ্ধারা জানবাজি রেখে যুদ্ধ করেছিলেন?
পরিস্থিতি পাল্টে গেছে এবং প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে। তারপরও একটা বিষয় এখানে পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন যে, এরকম বিতর্কিত বিষয়ে কেউই ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে দায়িত্ব সহকারে জড়িত করতে পছন্দ করেন না, উটকো একটা ঝামেলা মনে করেন। নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর ঝকমারিতে কেউ নেই। তাই নল তল বাইরা গোছের কথাবার্তা দিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার মওকার সন্ধানে ব্যাপৃত থাকেন এবং প্রকারান্তরে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা তলে তলে প্রবলতর ও অব্যাহত থেকেই যায়। কিন্তু প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা এটা ভাবেন না যে, তারা যে যুদ্ধটা করে ছিলেন ১৯৭১-য়ে সেটা এখনও শেষ হয়ে যায়নি, বরং বলা যায় আরও তীব্র হয়েছে, প্রবলভাবে অব্যাহত আছে, বিরোধীরা যুদ্ধের ময়দান ত্যাগ করেনি অথচ মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং এক এক করে বিভিন্ন এলাকা শত্রুর দখলে চলে যাচ্ছে, এই দখলকাজে কোনও কোনও মুক্তিযোদ্ধা সহায়তা করছেন এবং কেউ কেউ সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন না বা বুঝেও না বুঝার ভান করাকে মঙ্গলজনক কিংবা বৈষয়িক দিক থেকে নিছক লাভজনক ভাবছেন। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, চারদিকে বিপাক তৈরি হয়েছে, চিহ্নিত রাজাকারকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে প্রকারান্তরে আত্মসমর্পণের অলিখিত দলিলে স্বাক্ষর করার বদকাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে তোলছেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ কেউ এবং সেটার অশুভ ফল ভোগ করছে সমগ্র সমাজ। যে-কোনও একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্যে এমন একটি অবস্থা ভীষণ অস্বস্থিকর তাতে কোনও সন্দেহ নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা তো বলেই ফেললেন, একটু গুছিয়ে বললে তা দাঁড়ায় হুবহু এরকম, ‘আমি কী করে সত্যি কথাটা বলবো? আমার সহযোদ্ধা তো মিথ্যেটাকে সমর্থন করছে, যুদ্ধে যে আমার পাশে ছিল। আমি যে ঘটনাকে সত্যি বলছি সেটাকে সে বলছে মিথ্যা। যে-সহযোদ্ধাকে তার অপরাধের দ- হিসেবে মুক্তিযোদ্ধারা গুলি করে মেরে ফেলেছে, সেই মুক্তিযোদ্ধাদেরই একজন ওই অপরাধীকে পরবর্তীতে সম্মুখযুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেছে বলে লিখিত ছাড়পত্র প্রদান করেছে। সুতরাং আমি সত্যি বললেই বা কার কী এসে যায়?’
একাত্তরে যুদ্ধটা ছিল সশস্ত্র। এখন যুদ্ধটা অস্ত্রের নয়, সুচতুর কৌশলের ও এক অর্থে সাংস্কৃতিক। একপক্ষের জন্য ধুরন্ধর অনুপ্রবেশের ও মুক্তিযুদ্ধের জাতীয় অর্জনকে বিনাশ করা ও যতদূর সম্ভব বিকৃত করার, অন্যপক্ষের জন্য তা প্রতিরোধ করার যুদ্ধ। এর সঙ্গে যে-করেই হোক মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস বিকৃত করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করাও একটি বড় ধরনের কাজ। সেটার আওতার মধ্যেই পড়ে একজন অমুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আদায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার অপতৎপরতাকে প্রতিরোধ করার কর্তব্যটিও। এখন অবস্থা এমন যে, প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিরোধটা একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনীতিক ও আর্থনীতিক। যুদ্ধটা তাই একাত্তরের সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়েও সহ¯্রগুণে কঠিন ও জটিল। তদুপরি যতোটা সামাজিক, তারও চেয়ে বেশি সাংস্কৃতিক, রাজনীতিক এবং সর্বোপরি আর্থনীতিক তো বটেই। এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক যুদ্ধের পরিসর যেহেতু অর্থনীতির ভিত মজবুত করার সঙ্গে অনিবার্যভাবে সম্পৃক্ত, তাই এখানে শ্রেণি ও শ্রেণির সঙ্গে সমাজ ও রাষ্ট্রের রাজনীতি অনিবার্যভাবে ওতপ্রোত। ভুলে গেলে চলবে না ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভাবাদর্শের পৃষ্ঠপোষক কোনও কোনও মুক্তিযোদ্ধাভাবাপন্নরা ও তাদের সঙ্গে সকল মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা প্রায় দুই দশক রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসীন ছিল এবং বঙ্গবন্ধুর ক্ষমতারোহেণের ৩ বছর ৮ মাসের মাথায় তাঁকে হত্যা করে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে তারা তৎকালে অকল্পনীয় সফলতা অর্জন করেছিল।
বিতর্কিত হয়ে পড়েছে, এমন ঘটনা নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার আগে সাংবাদিকদের আরও অনুসন্ধিৎসু ও সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের যথাযথ ইতিহাস উদ্ধারের স্বার্থে। ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি ঘটেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কীছু কীছু বিষয় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এমনভাবে স্বীকৃত যে, সেগুলোকে অস্বীকার করার অবকাশ এখন আর নেই। তারপরও সে-বিকৃতিকে ছেঁটে ফেলে সত্যিকারের ইতিহাস প্রতিস্থাপন করতে হবে। এর কোনও বিকল্প নেই। আমরা আমাদের উত্তরসূরিদেরকে মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে যেতে পারি না।