উন্নীত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো কি নিধিরাম সর্দার?

সরকার দেশের কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করেছে। মূলত বৈশ্বিক ধারণার সাথে সংগতি রেখে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার স্তর বিবেচনা করেই সরকার এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। একটা সময়ে হয়তো শিক্ষার স্তর বিন্যস্তকরণের কাজটিও করা হবে। কিন্তু বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক লাফে তিনটি উচ্চতর শ্রেণি সংযোজন করা হলেও বিদ্যালয়গুলোর ভৌত অবকাঠামো কিংবা জনবল বর্ধিতকরণের কাজটি করা হয়ে উঠেনি। ফলে যেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান কার্যক্রম চালু আছে সেগুলোর ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ কার্যক্রম চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। এরকম এক বাস্তবতায় পড়ে কিছু শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। পাঠদান যথাযথভাবে চালু না থাকায় এরকম উন্নীত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর ৬ষ্ঠ-৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হয় শিক্ষা জীবন থেকে ঝরে পড়ছে নয় তারা মানসম্মত শিক্ষা গ্রহণ থেকে হচ্ছে বঞ্চিত। এর একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ধর্মপাশা উপজেলার চাপাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২০১৭ সনে এই বিদ্যালয়টিতে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়। ওই বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিল ১৮ জন শিক্ষার্থী। এই ১৮ জনেরই এবার জেএসসি পরীক্ষায় বসার কথা। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, এই বিদ্যালয় থেকে এবার একজন শিক্ষার্থীও জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে না। ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া ১৮ জনের মধ্যে ১৫ জনই ইতোমধ্যে নানা কারণে ঝরে পড়েছে। বাকি ছিল ৩জন। এদের একজন অন্য একটি বিদ্যালয় থেকে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। কারণ চাপাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অষ্টম শ্রেণিতে শেষ পর্যন্ত থেকে যাওয়া ৩ শিক্ষার্থীর রেজিস্ট্রেশন করানোর কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেননি। ফলে ৩ শিক্ষার্থীর মধ্যে তাহমিনা ও সেগুনমনি নামে দুই শিক্ষার্থী রীতিমত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থেকেও প্রধান শিক্ষকের গাফিলতির কারণে জেএসসি পরীক্ষা দিতে পারছে না। তাহমিনা ও সেগুনমনির শিক্ষা জীবন বিপর্যস্ত হওয়ার দায় এখন কে বহন করবে?
তাহমিনা ও সেগুনমনির জেএসসি রেজিস্ট্রেশন না হওয়ার জন্য কেউ দায় নিতে চাচ্ছেন না। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে ওই বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও বর্তমান দুই প্রধান শিক্ষকই দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। শুকনো দুঃখ প্রকাশ করেছেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। চাপাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই দায়িত্বহীনতার বিষয়টি সোমবার জেলা পর্যায়ে প্রধান তথ্য কমিশনারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত একটি মতবিনিময় সভায়ও উঠে এসেছে। এজন্য প্রধান তথ্য কমিশনার নিজের ক্ষোভের কথাও জানিয়েছেন। বলা প্রাসঙ্গিক যে প্রধান তথ্য কমিশনারের গ্রামের বাড়ি ওই চাপাইতি গ্রামে। সংগত কারণেই নিজের গ্রামের বিদ্যালয়ের এমন বেহাল দশা শুনে তিনি ক্ষুব্ধ হয়েছেন। সংবাদে উঠে এসেছে, বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চালু করা হলেও এখানে শ্রেণিকক্ষ বাড়ানোসহ শিক্ষক বাড়ানোর কোনো কাজই করা হয়নি। সীমিত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক থাকায় বর্ধিত শ্রেণিগুলোতে আদৌ কোনো ক্লাস গ্রহণ করাই সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।
অন্য যেসব বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করা হয়েছে সেগুলোর অবস্থা কেমন চাপাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা থেকে তা অনুমেয়। এই অবস্থায় শিক্ষা প্রশাসনকে কার্যকরভাবে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুবা সরকারের শিক্ষা সংস্কারের এই মহতী উদ্যোগটি ভেস্তে যাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণিকক্ষ যেমন নতুন করে তৈরি করতে হবে তেমনি বাড়াতে হবে শিক্ষকের সংখ্যাও। নতুবা ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার এর মতো অবস্থা হবে উন্নীত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর।
চাপাইতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জেএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা তাহমিনা ও সেগুনমনিকে বিশেষ পরিচর্যার মাধ্যমে আগামী বছরের জেএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বিশেষ আন্তরিক হতে হবে।