উৎপাদনের ২৫ ভাগ ধান সরকারিভাবে সংগ্রহ করতে হবে

বাংলাদেশে ধান চাষের সংকটের লক্ষণটি বেশ কয়েক বছর যাবৎই স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। একদা সোনালি আঁশ খ্যাত পাটের পরিণতি বরণ করতে পারে এই ধান, এমন আশঙ্কার কথাও জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে। জনসংখ্যা কম থাকার পরও যে দেশে খাদ্য ঘাটতি বিদ্যমান ছিল, সংগ্রামি কৃষকরা জনসংখ্যা বাড়া এবং চাষযোগ্য জমি হ্রাস পাওয়ার পরও সেই দেশকে খাদ্য উদ্বৃত্ত দেশে পরিণত করেছেন। বড় আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে বোরো এবং আমন মৌসুমে প্রতিবছরই বাম্পার ফলন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য ভাত। চালের অভাবকেই দুর্ভিক্ষ বলা হয়। নানা খাতে প্রশংসাযোগ্য উন্নয়নের পরও কৃষি তথা ধান চাষই বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদ- এখনও। এমন অবস্থায় কেন ধানের এমন পরিণতির আশঙ্কা? প্রধান কারণ হলো, কয়েক বছর যাবৎ কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পেলে উৎপাদক সেই পণ্য উৎপাদন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন। পাটের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কৃষকদের অভিযোগ, ধান চাষাবাদে যে খরচ হয়, উৎপাদিত ধান বিক্রি করে তারা ক্ষেত্রবিশেষে সেই টাকাও উঠাতে পারেন না। সাধারণ মানুষকে কম দামে চাল কেনার সুযোগ করে দেওয়ার এক ধরনের আনন্দে মগ্ন আছে সরকার। ধান-চালের দাম কম থাকলে সাধারণ মানুষ খুশি, আনন্দের পিছনে মূল কারণ এটি। এই কথা সত্য। কিন্তু এই কথার অর্থ এটা নয় যে, কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকারকে যেমন চাষিদের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হয় তেমনি বাজারেও চালের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখতে হয়। এই দ্বিবিধ কাজটি কুশলতার সাথে করতে পারাটাই সফল সরকার ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এখন বাজারে চালের দাম কম রাখতে গিয়ে কৃষকদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। হালে এর প্রতিফল যে ভয়ানক হতে পারে তা বলাই বাহুল্য।
গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে হাওরাঞ্চলে আগামী মৌসুমের বোরো চাষাবাদ নিয়ে জমির মালিকদের হতাশার খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদ অনুযায়ী, সামনের মৌসুমের জন্য বোরো জমি পত্তন নিতে কোনো বর্গাচাষি পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণত জমির মালিকরা এখন চাষাবাদের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত থাকেন না। তারা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে জমি বর্গা দিয়ে দেন। বর্গাদাররাই এখন মূলত ধান চাষাবাদের কাজটি সারেন। কিন্তু এবার এই বর্গাচাষি পাওয়া যাচ্ছে না। বিগত মৌসুমে যে মূল্যে রঙজমা দেয়া হয়েছিল এবার অনেকক্ষেত্রে তার চাইতে কম অর্থের বিনিময়েও বর্গাচাষি পাওয়া যাচ্ছে না। বর্গাচাষিরা বলছেন, ধান উৎপাদন করে এখন লাভ নেই। ধান চাষের পরিবর্তে অন্য কাজ করলে লাভ বেশি। তাই তারা জমি পত্তন নিতে অনাগ্রহী। এই অনাগ্রহের কারণে হাওরাঞ্চলে এবার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কৃষিজমি চাষাবাদের বাইরে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। বছর বছর ধান চাষের প্রতি আগ্রহ কমতে থাকবে, যদি কৃষকদের ধানের ন্যায্যমূল্য দিতে না পারা যায়। একটা সময় আসবে যখন হাওরের পর হাওর জমি অনাবাদি থাকবে। তখন দেশ আবার খাদ্য ঘাটতিতে ভোগা শুরু করবে। সেই বিপর্যয় সামাল দেয়ার সাধ্য আছে কি কারও?
সরকার যে বিষয়টি অনুধাবন করতে পারছে না তাও নয়। কিন্তু সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অপ্রতুলতা লক্ষণীয়। ন্যায্যমূল্যে খাদ্যশস্য কিনে ভর্তুকি দিয়ে বাজারে ছাড়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর বহু দেশই অনুসরণ করে। এটি যেকোনো দেশের মৌলিক দায়িত্ব। আমাদের এই জায়গায় এখনও ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারিভাবে প্রকৃত কৃষকদের নিকট থেকে পর্যাপ্ত ধান কিনতে হবে। উৎপাদিত ধানের ১ ভাগ ধানও প্রচলিত ব্যবস্থায় সরকারিভাবে সংগ্রহ করা হয় না। সরকারিভাবে খাদ্যশস্য সংগ্রহের পরিমাণ উৎপাদনের ২৫ ভাগে উন্নীত করতে হবে। তাহলে বাজারে এর প্রভাব পড়বে।
ধানকে পাটের পরিণতি বরণ করার দুর্যোগ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকাটা একান্ত জরুরি।