- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - http://sunamganjerkhobor.com -

উৎপাদিত ধানের ১ শতাংশ কিনতে পারেনি সরকার

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে উৎপাদিত ধানের এক শতাংশও ক্রয় করতে পারে নি সরকার। সরকার কিনতে কিনতে কম দামে ধান চলে গেছে ফড়িয়াদের হাতে। ধানের দাম উৎপাদন খরচের চেয়ে কম হওয়ায় ভবিষ্যতে অনেক কৃষকই ধান চাষাবাদ ছেড়ে দিতে পারেন বলে আশংকা করা হচ্ছে।
বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওরপাড়ের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘বাজারে বর্তমানে ধানের দাম ৫৫০ থেকে ৬৫০ টাকা। লটারীর মাধ্যমে কিছু ধান সরকারি খাদ্য গোদামে দিবার আশায় আছলাম। লটারীতে নাম ওঠেনি। সরকারি খাদ্য গোদামে ধান দিতে পারলে কিছুটা জীবন রক্ষা অইলোনে। অখন যে অবস্থা ধান করার চেয়ে না করাই ভালা, খেতের মাঝেই খরচ অয় মন প্রতি ৬০০ টাকা। অখন ধান বেইচ্ছা নিজে চলমু না ঋণ দিমু, ধান পাইয়া আরো বিপদও পড়ছি।’
তিনি জানালেন, মুক্তিখলা গ্রামে ১৯০ ঘর কৃষক আছে, ধান দেবার জন্য লটারীতে ৮-১০ জনের নাম ওঠছে। বাকীদের সকলেরই একই অবস্থা।
বিশ্বম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি কৃষক নেতা স্বপন কুমার বর্মণ জানালেন, উপজেলার প্রত্যেক গ্রামের কৃষকরা চাষাবাদের সময়ই ব্যাংক ঋণ বা মহাজনদের কাছ থেকে ধানী ঋণ নেয়। ধান বিক্রি করে এই ঋণ পরিশোধ করে। এইবার ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই ওঠেনি। এখন ঋণ দেবে কীভাবে। ছেলে- মেয়েদের পড়াশুনাসহ অন্যান্য খরচ মেটাবে কীভাবে। ঘর-বাড়ি মেরামত, ছেলে-মেয়ের বিয়েশাদী কীভাবে হবে। ১ মণ ধান বিক্রি করে ১ কেজি মাছ কেনা যায় না, এর চেয়ে কষ্টের কী আছে। কৃষক কৃষি কাজের উপর নির্ভর করে এখন আর বাঁচতে পারবে না।
জানা গেছে, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় সরকারি খাদ্য গোদামে ধান দেবার জন্য ১৪০০ কৃষক আবেদন করেছিলেন। ৫৫৫ জনের নাম লটারীতে ওঠেছে। বাকী ৮৪৫ জন ধান কোথায় বিক্রি করবে এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।
কেবল বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায়ই এই চিত্র নয়। পুরো জেলায় কৃষকের এমন দুর্দশা।
শাল্লা উপজেলায় সরকারি খাদ্য গোদামে ধান দেবার জন্য আবেদন করেছিলেন ৬৬১৯ জন কৃষক। লটারীতে নাম ওঠেছে ১৪৩৮ জনের। এরমধ্যে ধান দিতে পারবেন ৯১২ জন। আগে যারা আসবেন, কেবল তারা ধান দেবেন। ৯১২ জনের ধান নেবার পর লটারীতে নাম ওঠলেও সেই কৃষকের ধান নেওয়া হবে না।
লটারীতে নাম ওঠার পর কেন ধান দিতে পারবে না, এমন প্রশ্নের উত্তরে উপজেলা খাদ্য গোদাম কর্মকর্তা আশিষ কুমার রায় বলেন, ‘কৃষকরা যাতে প্রতিযোগিতামূলক ভাবে আগে আগে আসেন, এজন্য এই ব্যবস্থা করা হয়েছে।’
জেলার সাড়ে তিন লাখ কৃষকের উৎপাদিত প্রায় ১২ লাখ টন ধানের মধ্যে ৭ আগস্ট বুধবার পর্যন্ত জেলার সব কয়টি ক্রয় কেন্দ্র মিলে ধান কেনা হয়েছে ৭৪৮৬ টন। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই ধান কেনা চলবে। সব মিলিয়ে ধান কেনার কথা ১৭৩৫৩ টন।
অন্যদিকে, মিলারদের কাছ থেকে জেলায় এবার আতব চাল কেনা হবে ১৭৭৯৮ টন এবং সিদ্ধ কেনা হবে ১৪১৭৯ টন। ৭ আগস্ট পর্যন্ত আতব কেনা হয়েছে ৯২০০ টন এবং সিদ্ধ কেনা হয়েছে ৬৩৫৪ টন।
ধান নিয়ে কৃষকদের এমন উৎকণ্ঠা প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে ধর্মপাশার কৃষক নেতা, কেন্দ্রীয় কৃষক সংগ্রাম সমিতির আইন বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল বাশার ঠাকুর খান বলেন, সরকারের ধান কেনার সদিচ্ছা নেই। লটারী’র নামে দলীয় নেতা-কর্মীদের সুবিধা দেবার অপচেষ্টাও হয়েছে। সবকিছু মিলে এমন পরিবেশ হয়েছে, কৃষক যে সরকারি গোদামে ধান দিতে পারবে এই আশাই ত্যাগ করেছে। কৃষকের এই নেতিবাচক মনোভাব ভবিষ্যতে ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনবে। আমরা মনে করি ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন বড় বড় বাজারে-ইউনিয়নে ইউনিয়নে সরকারিভাবে প্রকাশ্যে ধান ক্রয় করতে হবে। ধান ক্রয়ের পরিমাণও বাড়াতে হবে।
জেলা সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক, হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’এর সদস্য সচিব চিত্ত রঞ্জন তালুকদার বলেন, ধান কেনা বিলম্বে শুরু হয়েছে। নিয়মের নামে শুভঙ্করের ফাঁকি হয়েছে। কৃষক যেন মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে, পরবর্তীতে কৃষি কাজে নিরুৎসাহিত হয়, এই ছবি দেখতে পাচ্ছি আমরা।
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ধানের আড়ৎ মধ্যনগরের ধান আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জ্যোতির্ময় রায় জানালেন, কোরবানির ঈদের জন্য গত সপ্তাহে ধান ক্রয় বেশি করা গেছে। আমরা ধান কিনছি ৬৪০ থেকে ৬৮০ টাকা মণ দরে। ধান বিক্রি করে হাতে টাকা নিয়ে কৃষকরা মন খারাপ করে বাড়ি ফিরছেন। কৃষকরা বলছেন, এভাবে ধান বিক্রি করতে হলে, কীভাবে কৃষি কাজ করবেন তারা।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, সময় মত সরকারিভাবে ধান না কেনায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করেছেন। সরকারিভাবে ধান কেনার পরিমাণও তুলনামূলক একেবারেই কম। আবার ধানের চেয়ে চাল কেনা হচ্ছে বেশি। চাল কিনলে কৃষকের কোন উপকার হয় না। অথচ. চাল কেনা হচ্ছে বেশি। এসব বিষয় নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত না নিলে, হাওরাঞ্চলে ধানের উৎপাদন কমে যাবে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জাকারিয়া মোস্তফা জানালেন, ধান কেনার নির্দেশনা এসেছিল ২৯ এপ্রিল। কৃষক তালিকা পেতে পেতে হয়েছে ১৮ মে। দ্বিতীয় দফায় ধান কেনার লক্ষমাত্র বাড়ানো হয় ১৮ জুনে। ওই সময় আবার বন্য দেখা দেওয়ায় আমরা গোডাউনে রাখা ধান নিয়েই চিন্তায় ছিলাম। এজন্য ধান কিনতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। সময় মত ধান কিনতে পারলে ভালো হতো স্বীকার করে তিনি জানালেন, কৃষক ছাড়া কোন ভাবেই অন্য কারো কাছ থেকে ধান কেনা হবে না। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান ক্রয়ের শেষ সময়সীমা হলেও সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করবেন তারা।