ঋষি সুনাকের জন্য উচ্ছ্বাস ও ভাবাবেগ

ঋষি সুনাকের ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার খবর শুনে উপমহাদেশের কিছু মানুষের মধ্যে এক ধরনের উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে। ঋষি সুনাকের বংশধারায় ভারতীয় সংযোগ আছে, আপাতত উচ্ছ্বাসের কারণ এটি। যে ইংল্যান্ড একদা দুর্দন্তপ্রতাপে ভারতবর্ষ শাসন-শোষণ করেছিলো, সেই ইংল্যান্ডে একজন ভারতীয় বংশদ্ভূত ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মধ্যে বিশেষ ঐতিহাসিক রহস্যময় যোগসূত্র রয়েছে। ভারতে ইংল্যান্ডের প্রত্যক্ষ উপনিবেশ অবসানের ৭৫ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এই পরিবর্তন আবার বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক-সামাজিক সমীকরণও বটে। পৃথিবীর নানা দেশে অভিবাসী নাগরিকদের সে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন জায়গায় ভালো অবস্থানে যাওয়ার খবর আমরা প্রায়ই দেখতে ও শুনতে পাই। পৃথিবীর অন্যতম শক্তিধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের রয়েছে ভারতীয় রক্তধারা। দেশে দেশে এই যে অভিবাসীদের প্রভাবশালী উত্থান সেটি প্রমাণ করে একদা বর্ণবৈষম্যে জর্জরিত পৃথিবী এখন অনেক বেশি নমনীয় চরিত্র ধারণ করেছে। ইংরেজদের রাজ্য ইংল্যান্ডের শাসনস্তম্ভের শীর্ষে একজন অ-ইংরেজ, অ-খ্রিস্টান এলেন কিনা সে নিয়ে ওইদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে মাথাব্যথা নেই। বরং যিনি এলেন তিনি যোগ্য কি-না এবং জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে তিনি কতটা সামর্থবান; এসব বিবেচনাবোধই কাজ করে বেশি। ঋষি সুনাকের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, তিনি কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য হয়েও এই সমর্থন পেতে কোনো বর্ণবাদী আচরণের শিকার হননি। বিপুল দলীয় সমর্থন নিয়ে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ট প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিতে যাচ্ছেন তিনি। তাঁকে আমাদের অভিনন্দন।
ঋষি সুনাকের পিতামহ বা মাতামহরা নিজ নিজ দেশ ভারত ও তানজানিয়া ছেড়ে কালক্রমে ইংল্যান্ডের অধিবাসী হলেও সময়ের প্রবাহে ঋষি এখন পুরোদস্তুর ইংল্যান্ডের নাগরিকে পরিণত হয়েছেন। তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম এক ধনি ব্যক্তি। বলা হয়, ইংল্যান্ডের রাজার সম্পদের চাইতেও তাঁর সম্পদের পরিমাণ বেশি। অর্থাৎ একজন শীর্ষ ধনি ব্যক্তি হয়ে পুঁজির রক্ষক হিসাবে একজন ইংরেজ পুঁজিপতি ও তাঁর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। নিজের পশ্চাদইতিহাসের সুতো কখনও তাঁকে ইংল্যান্ডের চাইতে ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলবে না। সুতরাং ঋষি সুনাকের জন্য যে উচ্ছ্বাস তা একান্তই সাধারণ মানুষের ভাবাবেগ মাত্র। এই ভাবাবেগ কখনও চলমান আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোকে উল্টে দেওয়ার বেগে পরিণত হবে না।
ঋষি সুনাক তাঁর দুই পূর্বসূরি বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের মেয়াদ পূর্তির আগেই বিদায় নেয়ার কারণে একই মেয়াদের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী হলেন। লিজ ট্রাসের ক্ষমতা চর্চার অল্প দিনের কথা মাথায় রাখলে সকলের মনেই প্রশ্ন জাগে যে ঋষি কতদিন সফলভাবে এই পদ ধরে রাখতে পারবেন? যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি দলীয় নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সমর্থন লাভ করেছেন সেই আসল কাজে তিনি কতটা সফলতা অর্জন করতে পারবেন মূলত তার উপরই নির্ভর করছে ঋষি সুনাকের ক্ষমতার সময়টা কুসুমাস্তীর্ণ হবে নাকি পূর্বসূরিদের মতো ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে বিদায় নিতে হবে। কনজারভেটিভ দলের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী লেবার পার্টি আবার মধ্যবর্তী জাতীয় নির্বাচন দাবি করেছে। ওই চাপ সামলানোও ঋষি সুনাকের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ। ঋষি সুনাকের রক্তে রয়েছে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকা এবং উন্নতি করার ইতিহাস। কঠোর পরিশ্রম আর বুদ্ধিমত্তার দ্বারা তিনি ও তাঁর পূর্বপুরুষরা যেভাবে শূন্য অবস্থা থেকে এখন বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন সেই অভিজ্ঞতা যদি এখন ইংল্যান্ডের বিপর্যস্ত অর্থনীতির নি¤œগামিতা রোধে নিয়োজিত করে সফলতা দেখাতে পারেন তাহলে ইংল্যান্ডের শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তিনি অনেকদিন নিজের প্রভাব ধরে রাখতে সমর্থ হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। কাজটি যদিও খুব কঠিন তবুও আমরা ঋষি সুনাকের সফলতা কামনা করি।