এইসব প্রশিক্ষণ ও হরিলুটের গল্প

হাসান হামিদ
কিছুদিন আগে ব্রিটিশ কাউন্সিলের একটা ক্যারিয়ার ডেপেলপমেন্ট ট্রেনিং-এ গিয়েছি। গিয়ে ওখানকার লাইব্রেরিতে Carol Ann Duff এর The Bees বই পড়তে পড়তে এমন ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম যে, সেদিন আর ট্রেনিং করিনি। এমন অনেকবার হয়েছে আমার। গিয়েছে এক কাজে, করে এসেছি অন্য কাজ। তবে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব নিয়ে আমি দুই বছর আগে একটি লেখা লিখেছিলাম। আর শুরুতেই এই কথা বলে নিচ্ছি যেন কেউ মনে না করেন, আমি প্রশিক্ষণের বিপক্ষে কথা বলছি। আমি মূলত আজকের লেখাটিতে বলতে চেষ্টা করবো, প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণার্থীদের বাছাই নামের তালিকায় দুর্নীতি, প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ অর্থ লুটপাট, প্রশিক্ষণ যিনি গ্রহণ করবেন তার আগ্রহ শেখায় নয় টাকায় এসব বিষয়ে। আর তাতে প্রশিক্ষণের লক্ষ্য পুরোপুরি বিচ্যুত হয়। সবচেয়ে বড় কথা, প্রশিক্ষণের টাকা ঠিকমতো খরচ হয় কিনা সে নিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের মোটেই আগ্রহ থাকে না। এই উদাসীনতার কারণে সরকারি ও বেসরকারি খাত থেকে পাওয়া বেশির ভাগ টাকা এককথায় কাজে খুব একটা লাগে না বলেই মনে হয়। প্রশাসনে থাকা কর্তাদের চুরির বাইরে এর অবশ্য অন্য গভীর একটি কারণও আছে। আমাদের দেশে যিনি সমাজসেবা কর্মকর্তা হলেন, তিনি হয়তো তা হতে চাননি। ফলে চাকরিতেই তার বিশেষ আগ্রহ নেই; সুতরাং এই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণে আগ্রহ থাকবে সেটা ভাবাই বরং বোকামি।
কয়েক মাস আগে পত্রিকার খবরে পড়েছিলাম একটি মন খারাপ হওয়ার মতো খবর। খবরটা হলো, চিকিৎসকদের জন্য যে প্রশিক্ষণ সেটির জন্য কয়েকজন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম তালিকাভুক্ত করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ থেকে বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য ২০ জনকে মনোনীত করে এ বছরের ৫ মার্চ একটি সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়। মালয়েশিয়ায় সাত দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণের জন্য স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর, ব্যক্তিগত কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষক, উচ্চমান সহকারী, সিভিল সার্জন অফিসের হিসাবরক্ষক, হাসপাতালের স্টেনো টাইপিস্ট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর এসব কর্মচারীকে মনোনীত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে চিকিৎসকদের এই প্রশিক্ষণ গ্রহণের কথা। কিন্তু মনোনীত ২০ জনের মধ্যে চিকিৎসক ছিলেন মাত্র ৭ জন। জনগণের টাকা তথা সরকারি অর্থ ব্যয় করে এসব কর্মচারীকে বিদেশে প্রশিক্ষণের আবশ্যকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে কী করবেন? কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে কেনইবা তাদের প্রশিক্ষণের নামে বিদেশে পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল? জানতে খুব ইচ্ছে করে!
পত্রিকার খবরে সংশ্নিষ্টরা সেই সময় বলেছেন, বিদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার বিষয়টি চিকিৎসকদের জন্য নির্ধারিত। কিন্তু মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে। আবার যেসব চিকিৎসককে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়, তাদের বিষয়ভিত্তিক অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য তা সমীচীন নয়।
মালয়েশিয়ায় ‘আপডেট এক্সামিনেশন অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম’ শীর্ষক অন্য একটি প্রশিক্ষণের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের নামে জিও হয়েছিল। তিনি পত্রিকায় বলেছিলেন, প্রতিবছরই তাদের মতো কর্মচারীরা প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে যান। প্রশিক্ষণের শিরোনাম উল্লেখ করে সেটির বাংলা জানতে চাইলে তিনি উত্তর দিতে পারেননি। বোঝাই যাচ্ছে, এখানে সমস্যাটা কোথায়। অথচ চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে অবৈধভাবে অন্যদের পাঠানো অত্যন্ত গর্হিত কাজ। কম্পিউটার অপারেটর, উচ্চমান সহকারী প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে কী করবেন? তারা কী চিকিৎসা অথবা শিক্ষায় ভূমিকা পালন করবেন? যদি সেটি না হয়, তাহলে কেন তাদের পাঠানো হয়। এর সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। আর এটি একটি উদাহরণ মাত্র। প্রতিবছর প্রশিক্ষণের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট চলছে। যেন দেখার কেউ নেই।
গত বছর নার্সিংয়ের প্রশিক্ষণ খাতে সিন্ডিকেটের কারণে চরম অব্যবস্থাপনা নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। নার্সসহ ১৫৬ জনকে বিদেশে স্বল্পমেয়াদে প্রশিক্ষণে পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে নার্সিং অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয়ে যে তালিকা প্রেরণ করা হয়েছিল, তাতে যেসব নার্সদের প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রয়োজন তাদের নাম ছিল না। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের কাছে ফাইলটি অনুমোদনের জন্য গেলে তিনি এক সঙ্গে নার্সসহ ১৫৬ জনের বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ১৫৬ জনের বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি বাতিল করে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
সামান্য ঘাঁটাঘাঁটি করেই আমি জেনেছি, প্রতি বছর এভাবে অযোগ্যদের বিদেশে স্টাডি ট্যুর এর নামে পাঠানো হয়। এতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। এর জন্য দায়ী মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠা শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এইসব শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট যাদের প্রয়োজন নেই, তাদেরই প্রশিক্ষণে বিদেশে পাঠায়। সংশ্লিষ্ট পেশার সাথে জড়িত নন, এমন ব্যক্তিরাই ইচ্ছামতো অযোগ্য ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণে মনোনয়ন দিয়ে থাকেন। এর নেপথ্যে হলো প্রশিক্ষণ প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা যা সিন্ডিকেটের পকেটে চলে যায়। আমাদের দেশে প্রশাসনের নিচ থেকে শীর্ষ বেশিরভাগ পদে ঘুষ এখন ‘ওপেন সিক্রেটে’ পরিণত হয়েছে। অধিদপ্তর থেকে মন্ত্রণালয় প্রতি পদে পদে ঘুষ। মন্ত্রণালয়ের এক শ্রেণীর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের কাছে জিন্মি হয়ে গেছে নিচের স্তরের অন্যরা। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, বদলি বাণিজ্য ও প্রশিক্ষণ নিয়ে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য বন্ধ না হলে এসবের সারমর্ম জনগণের কাজে আসবে না।
২০১৬ সালে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের নামে অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছিল। সে বছর ইউপি নির্বাচনে প্রশিক্ষণ খাতের ৪৫ কোটি টাকা ব্যয় নিয়েও নানা প্রশ্ন তুলেছিলেন ইসির কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের অভিযোগ ছিল, ইসি সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তাদের যোগসাজশেই ইটিআইয়ের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা হয়েছে। কর্মকর্তারা এসব টাকা নামে-বেনামে ব্যয় দেখিয়ে বিল-ভাউচার প্রদান করেছিলেন। আবার প্রশিক্ষণের নামে অর্থ লোপাটের অভিযোগ ছাড়াও প্রশিক্ষণের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার। তিনি এক নোটে লিখেছিলেন, ইটিআই প্রশিক্ষণের বর্তমান মান সন্তোষজনক নয়। পরিমাণগত ও গুণগত উভয় ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে। প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা সেসময় অভিযোগ করেছিলেন, একই সময় ইসির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেশনে প্রশিক্ষক হিসেবে অংশ নেন। অনেকে অংশ না নিয়ে স্বাক্ষর করেই টাকা তুলে নেন। এই প্রশিক্ষণের টাকা লুটপাট এভাবেই হয়েছিল।
কয়েক বছর আগে প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত টাকা শিক্ষকদের মধ্যে বিতরণ না করে লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। একটি উপজেলায় প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষকদের দুপুরের খাবারের জন্য অর্থ বরাদ্দ থাকলেও তা খরচ করা হয়নি। উল্টো যেসব বিদ্যালয়ে ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ওই সব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের নিজস্ব অর্থে খাবারের ব্যবস্থা করতে বাধ্য করেছে উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তারা। এছাড়া মান নিয়েও অজস্র অভিযোগ রয়েছে এইসব প্রশিক্ষণের। শিক্ষা যারা দেবেন, সেই সেক্টরে যদি লজ্জাজনক এই কা- ঘটে, তবে আমাদের তা দারুণভাবে ভাবায়। শুধু এই নয়, বেশি টাকা বিল ভাউচার দেখিয়ে বেশিরভাগ কর্মকর্তারাই লুট করেন সরকারি অর্থ, একথা একটা বাচ্চাও এখন জানে।
প্রশিক্ষণে লুটপাটের অৎ¯্র খবর গুগলে সার্চ করলে আপনি পেয়ে যাবেন। যদিও ঘটনা যা যা ঘটছে, তার কত পার্সেন্ট আর জানাজানি হচ্ছে? বাকি সব চুরি কিন্তু আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। এবার চড়া একটি লুটপাটের কথা বলি! জ্বালানি তেলের চাহিদা মেটাতে সরকারি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে আমরা কদিন আগে জেনেছি। এই প্রকল্প বাস্তবায়নকালে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের বিদেশে প্রশিক্ষণ ও স্টাডি ট্যুরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
জানতে পেরেছি, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, জ্বালানি বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও ইআরএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ‘ট্যুর’ ও ‘প্রশিক্ষণে’ অংশ নেবেন। তবে ৩০ দিন ও ১৮০ দিনের প্রশিক্ষণে মূলত ইআরএলের জনবল থাকবে। কর্মীদের জন্য এত ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আর তা খুব স্বাভাবিক। তাছাড়া শুধু প্রশিক্ষণেই শতাধিক কোটি টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরাও।
আসলে মানবজীবনে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই। চাকরিতে প্রবেশের পূর্বে যেমন প্রশিক্ষণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, তেমনি চাকরিতে প্রবেশের পরেও প্রশিক্ষণ সমান গুরুত্ব বহন করে থাকে। একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ারে যেকোনো সময়েই প্রশিক্ষণের দরকার হতে পারে। কেননা চাকরি করতে গিয়ে এমন অনেক কাজের মুখোমুখিই পড়তে হতে পারে, যা আপনার জানা নেই। সেক্ষেত্রে যথাযথ প্রশিক্ষণ নিলে সেই কাজটি করা অনেক সহজ হবে আপনার জন্য। প্রশিক্ষণ বলতে এখনও আমাদের অনেকের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে, শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করার পর চাকরিতে প্রবেশের পূর্বেই শুধুমাত্র প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। চাকরিতে প্রবেশের পূর্বে প্রশিক্ষণের প্রয়োজন যেমন রয়েছে চাকরিরত অবস্থায়ও একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ারে উন্নতির জন্য প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা প্রয়োজন। চাকরিতে প্রবেশের পূর্বেই আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনার জীবনের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য সম্বন্ধে। যদিও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে পরিকল্পনা অনুযায়ী পছন্দের চাকরি অর্জন করা খুবই কঠিন একটি বিষয়। তথাপি আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ চাকরিপ্রাপ্তিতে আপনার সম্ভাব্যতা বৃদ্ধি করবে নিঃসন্দেহে। তাছাড়া প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রশিক্ষণার্থীদের চাহিদার নিরিখে তাদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও মূল্যবোধ অর্জনের উপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন প্রশিক্ষণার্থীকে তার কাজের উপযোগী করে তোলা যায় এবং কর্মক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল লাভ করা যায়। তবে কর্মক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীর দক্ষতা যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রশিক্ষিত মানব সম্পদ তৈরির যথার্থতা নিরূপণ করা সম্ভব।
চীন, মিশর ও ভারতীয় সভ্যতার প্রাচীন ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, সে সময়ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো (আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দ)। প্রাচীন মিশরের আমলাগণও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন (৩১০০-২২০০ খ্রিপূ)। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াস (আনু ৫৫১-৪৭৯ খ্রিপূ), গ্রিক দার্শনিক প্ল্যাটো (৪২৮-৩৪৭ খ্রিপূ) এবং ভারতের কৌটিল্য (আনু ৩২৪-২৪৮ খ্রিপূ) সরকারি আমলাদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। জীবনের উদ্দেশ্য, প্রাথমিক কর্তব্য, শিক্ষার উদ্দেশ্য, বিষয়/পাঠক্রম এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে তারা নির্দেশনা দিয়েছেন। আধুনিক ভারতে গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলি (১৭৯৮-১৮০৫) প্রথমবারের মতো ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা চালু করেন। ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত বেসামরিক আমলাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ব্রিটিশ শাসনের শেষ অবধি অক্ষুন্ন ছিল এবং ক্রমশ পাকিস্তান আমল, এমনকি বর্তমান বাংলাদেশেও অব্যাহত রয়েছে।
একথা সত্য যে, একটি প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন ও পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবল জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশের প্রকল্পগুলোতে দেখা যায় যাদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, তারা সুযোগ পান না। তদবির ও দুর্নীতির মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় লোকজন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন। যা প্রকল্পের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে। তাই যাদের দরকার, তারাই যেন প্রশিক্ষণে সুযোগ পান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এই ব্যাপারে সংশ্লষ্ট কর্তারা দৃষ্টি দেবেন বলে আশা করি।
আসলে এই দেশে সরকারি প্রকল্পে প্রশিক্ষণের নামে এখন প্রহসন চলছে। প্রতিযোগিতাহীন প্রকল্পে কিছু খাতে বেশি বেশি বরাদ্দ রাখা হয়। আর এই প্রকল্প প্রস্তাবগুলো যেসব কর্মকর্তা প্রস্তুত করেন, তারাই প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এতে জনস্বার্থ কতটুকু রক্ষিত হয় তা ভাবার বিষয়। এসব ডিপিপি মন্ত্রণালয়গুলো নামেমাত্র যাচাই-বাছাই করে। পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্প ব্যয় কমাতে তেমন ভূমিকা রাখে না। স্টাডি ট্যুরের নামে বিদেশ গমনে অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশনসহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি থাকেন। ফলে তাদের প্রকল্প ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় না। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রকল্পে এ ধরনের প্রশিক্ষণের নামে প্রচুর জনবল বিদেশে ঘুরে এসেছেন; কত টাকা তারা খরচ করেছেন আমি জানি না, কিন্তু খনি নিয়ে তারা কতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছেন তা বড়পুকুরিয়ার বর্তমান চিত্র দেখে কিছু হলেও আন্দাজ করতে পারি!
লেখক – তরুণ কবি ও কলামিস্ট।