এইসব মৃত্যু অসহনীয়

দুর্বৃত্তদের হামলায় গুরুতর আহত কৃষক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও মোল্লাপাড়া ইউনিয়ন বিএনপি’র আহ্বায়ক আজাদ মিয়া চিকিৎসাধীন অবস্থায় রবিবার রাতে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন। গত বৃহস্পতিবার রাতে শহরের পিটিআই’র সামনে দুর্বৃত্তরা তার উপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত করে। আজাদ মিয়া প্রতিবাদী চরিত্রের মানুষ ছিলেন। ২০১৭ সনে বাঁধ দুর্নীতি ও ব্যাপক ফসল হানির প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠা ‘হাওর বাঁচাও কৃষক বাঁচাও’ সংগঠনের একজন সক্রিয় সংগঠক ছিলেন তিনি। গতবছর দেখার হাওরে ফসল রক্ষার নামে গৃহীত ৬টি অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের নামে ব্যাপক দুর্নীতি ও ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের মাধ্যমে সরকারি টাকা অপচয়ের বিরুদ্ধে তিনি আদালতের দ্বারস্ত হয়েছিলেন। এতে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের স্বার্থে আঘাত লাগে। নিহত আজাদ মিয়ার ভাই ওই প্রভাবশালী চক্রের দিকে ইঙ্গিত করে গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘আমার ভাই পরোপকারী, ন্যায়পরায়ণ এবং প্রতিবাদী ছিলেন। এলাকার লুটেরা কোন চক্র তার হত্যার ঘটনায় যুক্ত থাকতে পারে।’ পুলিশ ইতোমধ্যে মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের উকিল আলী নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে। এ কথা স্পষ্ট, তার কর্মকা-ে অসন্তুষ্ট কোন পক্ষই এই হত্যাকা-ের অনুঘটক। পিটিআইর সামনে রাতের বেলা তার উপর হামলা এবং হামলার ধরন দেখে এই সন্দেহ বদ্ধমূল হয় যে, কোন একটি পক্ষ তাকে প্রাণে মেরে ফেলতেই চাইছিল। অকুস্থলে মৃত্যু না ঘটলেও ৩ দিন পর হাসপাতালে মারা গিয়ে দুর্বৃত্ত চক্রের মনোবাসনা পূরণ করেছেন তিনি। প্রতিবাদী কৃষক সংগঠক আজাদ মিয়ার উপর নৃশংস আক্রমণ ও হত্যাকা-ের তীব্র প্রতিবাদ জানাই আমরা। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনের প্রতি সমবেদনা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। আমরা তাঁদের সাথে সমব্যথী।
শান্তির শহর নামেই সুনামগঞ্জের পরিচয় দেয়া হয়ে থাকে মুখ বড় করে সর্বত্র। এর কারণ আছে। সারা দেশে সন্ত্রাস, অপরাধবৃত্তি যে পরিমাণের, সেই তুলনায় আমাদের শহরটিকে শান্ত নিরিবিলিই বলা চলে। কিন্তু এই শহরটিকে অশান্ত করার একটি প্রচেষ্টা সবসময়ই চালু ছিল। কিন্তু শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের কারণে শহরটি কখনও বেশি অশান্ত হয়ে উঠতে পারেনি। শান্তির শহরের এই ঐতিহ্য কি আমরা হারাতে বসেছি? আজাদ মিয়ার উপর হামলার বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করলে দেখা যায় তার উপর পরিকল্পিত আক্রমণ চালানো হয়েছে। পিটিআই রাস্তাটি রাতের বেলা নিরিবিলি থাকে। এমন জায়গায় একজন মানুষের উপর দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলা শান্তিপ্রিয় শহরবাসীর আশঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। আজাদ মিয়ার হত্যাকারীরা চিহ্নিত না হলে শহরে অনুরূপ হামলা ও আক্রমণের সংখ্যা ভবিষ্যতে বৃদ্ধি পাওয়ার দুর্ভাবনা সকলকে এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সুতরাং যেকোনো মূল্যে আজাদ মিয়ার হত্যাকারী কারা তা খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে তাদের বিচার করতে হবে। আমরা এই দাবিটি সংশ্লিষ্টদের নিকট পেশ করলাম।
২। শহরের মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের বাথরুম থেকে ৭৮ বছর বয়সী জলফে আলী নামের এক মুক্তিযোদ্ধার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে রবিবার। প্রাপ্ত তথ্যমতে বাথরুমে ঢুকে কীটনাশক পান করে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু জীবন-সায়াহ্নে পৌঁছানো একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কেন আত্মহত্যা করবেন সেই কারণটি উদ্ঘাটিত হওয়া দরকার। জলফে আলী বেঁচে থাকলেই বা আর কতদিন বেঁচে থাকতেন। এই শেষ বয়সে তার ভিতরে কোন্ দুঃখবোধ ও কষ্ট তীব্রতা পেয়েছিল যে কারণে তিনি আত্মহননের মত একটি পথ বেছে নিলেন তা জানতে হবে। একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আত্মহননের চূড়ান্ত পথ বেছে নিতে যদি কারও প্ররোচনা থাকে তবে সেটি বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করতে তিনি একাত্তরে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন, তাঁর মত অনেকেই জীবন দান করেছিলেন। জলফে আলী সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন সেটি তাঁর ভাগ্য।