এই আন্দোলনের অন্তর্গত শক্তি ও চেতনা বজায় রাখুন

অযৌক্তিক পরিবহন ধর্মঘট ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে উঠা ঐতিহাসিক শিক্ষার্থী আন্দোলনের যৌক্তিক পরিণতি না ঘটানোর কারণে সাধারণ মানুষের কষ্ট দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। পরিবহন মালিক শ্রমিকরা এখন স্পষ্ট করেই চলমান শিক্ষার্থী আন্দোলনকে তাদের গাড়ি নামানোর জন্য অনিরাপদ বলে উল্লেখ করছেন। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় সকল দাবি মেনে নেওয়ার পরও শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছেন না। শিক্ষার্থীদের রাজপথে অবস্থান ক্রমশ বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলনটি রাজনীতিকীকরণ হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সাথে জনৈক ছাত্রের ফোনালাপ গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পাওয়ায় এই অভিযোগের গুরুত্ব বাড়িয়ে তুলেছে। একটি অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন আজ সফলতা লাভ করার পরও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের উপলক্ষ হয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এখনই সাবধান না হলে তাদের হাত দিয়ে সুযোগসুন্ধানীরা তামাক খেয়ে যাবে আর ঐতিহ্যবাহী ছাত্র আন্দোলনের গায়ে রঙ চড়িয়ে দিবে আড়ালে বসে থাকা এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী নানা মহল। ছাত্র আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।
ছাত্র আন্দোলনটি শুরু থেকেই বেশ জনসমর্থন পাচ্ছিল। কিন্তু শনিবার থেকে মানুষ কিছুটা নেতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করছেন বলে গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ দেখে ধারণা করা যায়। মূলত পরিবহন ধর্মঘটের কারণে জনজীবনে স্থবিরতা ও দুর্ভোগ নেমে আসায় সাধারণ মানুষ চলমান ছাত্র আন্দোলনের বিষয়ে মৃদু সমালোচনামুখর হয়ে উঠছেন। পরিবহন মালিক শ্রমিকরা কিশোর শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ বানিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করার প্রয়াস শুরু করেছে। চলমান ছাত্র আন্দোলনটি স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে গড়ে উঠেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় সহপাঠীর মৃত্যুতে প্রতিবাদ জানানোর এই কর্মসূচীটি এতোটাই সকলকে নাড়া দিয়েছে যে, এটি দেশের সকল মানুষের কাছে সমর্থন লাভ করে। ফলে ভীষণ গতি পায় এই আন্দোলন। ছাত্র আন্দোলনের তীব্রতার কারণে সরকার তাদের পূরণযোগ্য সকল দাবিই মেনে নিয়েছে। এখন ছাত্রদের ঘরে ফেরার পালা। কিন্তু তারা আশ্বাসে অবিশ্বাসের কথা বলে রাজপথে অবস্থান নিয়ে আছে। কিছু বিষয় রয়েছে, যা সরকার ইচ্ছা করলে আজকেই বাস্তবায়ন করে ফেলতে পারে না। যেমন পরিবহন আইন। এটি করতে একটি ন্যূনতম সময় লাগবে। এই সময়টুকু কি সরকারকে দেওয়া উচিৎ নয়? এখন এই ছাত্ররা যদি দিনের পর দিন সড়কে অবস্থান নিয়ে বসে থাকে তাহলে কেমন নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে সেটি কি চিন্তা করা যায় না?
কিশোর প্রাণের আবেগ নিয়ে খেলা করার সময় নয় এখন। আন্দোলনরত কিশোররা নেতৃত্বহীন। তারা তেমন করে রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বুঝে না। সুতরাং এক্ষেত্রে অভিভাবকদের দায়িত্ব নিতে হবে। সন্তানদের বুঝাতে হবে, কোন দাবিই তাৎক্ষণিক আদায় হয়ে যায় না। এ জন্য প্রয়োজনীয় সময়টুকু দিতে হয়। আর যে দাবিগুলো তাৎক্ষণিক মেনে নেয়ার মত, সেগুলো তো কালবিলম্ব না করে মেনে নেয়া হয়েছে। সরকার পক্ষকে আইন প্রণয়ন কিংবা নিরাপদ সড়কের জন্য আর যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করার কথা সেগুলো দৃশ্যমান করে এখনই শুরু করতে হবে। কোনভাবেই পরিবহন শ্রমিকদের চাপে মাথা নত করা চলবে না।
আমাদের শেষ কথা হলো, বিশ্বকে দেখিয়ে দেয়ার মত যে গৌরবজনক ছাত্র আন্দোলনটি হয়ে গেল এই লাল সবুজ পতাকাখচিত দেশটিতে, তার অন্তর্গত শক্তি ও চেতনা বজায় রাখতে সকল পক্ষকে কঠোর সংযমী মনোভাব দেখাতে হবে। নতুবা কৃষকের খেত উজাড় করে দিবে অন্য তৃণভোজীরা।