এই রায় বহুল প্রত্যাশিত

দীর্ঘ ১৪ বছর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অবশেষে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় ঘোষিত হল বুধবার। ২০০৪ সনের ওই দিনে, সেই শোকাবহ আগস্টেই, রাষ্ট্রীয় মদদে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা ও তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দকে হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন করা হয়। মামলায় বিভিন্ন স্বাক্ষী ও আসামীদের বক্তব্যে সেদিনের নৃশংস হত্যা পরিকল্পনা ও এর পিছনে জড়িত মাস্টার মাইন্ডদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় জীবনে ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর একই উদ্দেশ্যে পরিচালিত এই হত্যাকা- ইতিহাসের সবচাইতে বড় মর্মান্তিক ও ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। সেদিন আইভি রহমান সহ ২৫ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা বেঁচে যান অল্পের জন্য। ওই ঘটনায় অন্তত পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি বিভিন্ন মাত্রায় আহত হয়েছিলেন। আহতদের অনেকেই এখন শারীরিক বৈকল্যসহ মানসিক সমস্যাগ্রস্ত হয়ে কষ্টের জীবন যাপন করছেন। জাতি অধীর আগ্রহে এই নৃশংস হত্যাকা-ের বিচার দেখতে চেয়েছে। বুধবারের এই রায় তাই পুরো জাতির নিকট ছিল বহুল প্রত্যাশিত। এই দেশকে পাকিস্তানি ভাবধারায় ফিরিয়ে নেয়ার যে প্রত্যক্ষ প্রয়াস শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সনের ১৫ আগস্ট, ২১ আগস্ট তার ধারাবাহিকতা মাত্র। ষড়যন্ত্রকারীরা সেদিন পূর্ণ মাত্রায় সফল হলে অর্থাৎ শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পারলে এতদিনে এই দেশটি পাকিস্তানের রেপ্লিকা হয়ে উঠত। জাতির অশেষ সৌভাগ্য যে সেদিন জনতা মানবঢাল রচনা করে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন।
মামলায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে ফাঁসি ও তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হারিছ চৌধুরীসহ ১৯ ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেয়া হয়। দ-প্রাপ্ত সকলেই রাষ্ট্রের বড় বড় পদের অধিকর্তা ছিলেন। এদের মধ্যে উপরে বর্ণিতরা ছাড়াও পুলিশের আইজি, গোয়েন্দা প্রধানের মত ব্যক্তিরাও রয়েছেন। সাজাপ্রাপ্তদের তালিকা দেখলেই বুঝা যায় ষড়যন্ত্র প্রক্রিয়া কত গভীর ও উচ্চ পর্যায়ের সম্পর্কযুক্ত ছিল। এরকম পরিকল্পিত হত্যাকা-ে স্বয়ং রাষ্ট্রের অংশগ্রহণকারী হয়ে যাওয়া যেকোন জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্যের। আমরা সেই দুর্ভাগা জাতি, যারা বারবার এরকম চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি। পাশাপাশি ক্ষমতালিপ্সা রাজনীতিকে কতটা নোংরা ও কলঙ্কময় করে তুলতে পারে এই ঘটনা তারও বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের সবচাইতে নির্মম বাস্তবতা হল, যারা এরকম হত্যাকা- ঘটিয়ে নিজেদের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার পাশাপাশি দেশের আদর্শিক অবস্থান পালটে দিতে চেয়েছিল, আজ তাঁরা জনগণের সামান্য করুণা ভিক্ষা করে প্রাণপাত করছে কিন্তু জনতা তাতে সাড়া দিচ্ছে না। এরা এখন ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপিত বর্জ্য বিশেষে পরিণত হয়েছে।
যেকোন অপরাধপ্রক্রিয়ার আইনসম্মত বিচার দেশকে আইনের শাসনের দিকে পাকাপোক্ত করে। তথাকথিত ইনডেমনিটি দিয়ে এবং জজ মিয়া নাটকের মত চরম পরিহাস তৈরি করে এই দেশে হত্যাকারীদের রেহাই দিতে রাষ্ট্রীয় অপরাধগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হচ্ছে। দেশের ভাবমূর্তি বাড়ানোর জন্য এই বিচারগুলো বিশাল ভূমিকা রাখছে।
ক্ষমতার নামে, তথাকথিত পশ্চাদপদ আদর্শের নামে, রাজনীতির নামে এই দেশকে হত্যাকা-ের যে উর্বর ভূমি বানানোর চেষ্টা চালিয়েছিল কিছু পথভ্রষ্ট অপরাধী, এই বিচার সেই প্রক্রিয়াকে বন্ধ করতে রাখবে ঐতিহাসিক ভূমিকা। আমরা কামনা করি সুজলা শ্যামলা এই দেশ থেকে সবধরনের হত্যাকা- চিরতরে বন্ধ হোক।