একজন স্বাধীনতা যোদ্ধার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু

মতিউর রহমান

আমার যখন চশমা ছাড়াই দুনিয়া দেখার বয়স, স্কুলের গÐি ছেড়ে মহাবিদ্যালয়ে পড়ি। বিকেলে সর্বক্ষণের সঙ্গী ভাংগা সাইকেলে, এ পাড়া থেকে ও পাড়া হাওয়া খেয়ে না বেড়ালে পেটের ভাত হজম হয় না, প্রেমের পাঠশালায় সবেমাত্র হাতেখড়ি নিচ্ছি। তখনই অসহযোগ আন্দোলন শেষে শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ। মনে, মগজে বঙ্গবন্ধুর কথা কিলবিল করা শুরু করে। শয়নে, স্বপনে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কানের কাছে বাজতে থাকে। ‘মনে রাখবা রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ’… ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বাংলার মানুষ ৭ মার্চের ভাষণ শুনে দ্বিগুণ উৎসাহে ও অসীম সাহস নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। সুনামগঞ্জ নূরজাহান সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ ঢাকা থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের একখানা রেকর্ড সংগ্রহ করে আনে। সিনেমার শো শুরু হওয়ার আগে তারা মাইকে বাজাত। শত শত মানুষ হলের সামনে জময়েত হতো ও ভাষণ শুনে উজ্জীবিত হতো।
শুরু হয় মফস্বল শহরের আমার মতো অনেক যুবক বন্ধুদের চলাফেরা উঠাবসায় একটা ফাটাফাটি ভাব। পাকিস্তানের পেয়ারা বান্দারা কয় অত বাড়িস না। পাকিস্তান ভাঙ্গা কী অত সোজা। পাকিস্তান প্রেমী পুলিশ আর সেনাদের প্যাদানী খেলে বাপ বাপ বলে বলবি পাকিস্তান জিন্দাবাদ। আমরা বলি সোনার বাংলা শ্মশান কেন ? জবাব চাই। জিন্নাহ মিয়ার পাকিস্তান আজিমপুরের গোরস্থান। এই সব শ্লোগান আমাদের মুখস্ত। সরকারি লোক আর পাকিস্তানের দালাল দেখলে একহাত দেখিয়ে দিতে চাই। মুসলিম লীগ আর পিডিপি’ র চামচারা কয়, ‘শেখ সাহেব ছেলে পেলেদের জীবন শ্যাষ কইরাই দিলো।’
পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর শাসন, শোষণ, বঞ্চনা ও সামরিক জান্তার বিষয়ে তেমন জানতাম না, জানার বয়সও ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণে যেগুলো শুনেছিলাম তাতেই সচেতন হয়েছিলাম ও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হওয়ার দীক্ষা নিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রæর মোকাবেলা করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব। তখন থেকেই মাথায় ভন ভন করে ঘুরছিলো প্রয়োজনে যুদ্ধ করে হলেও এ অবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। মাথায় নিত্য ঘুরপাক খাচ্ছিল কোথায় পাব অস্ত্র?
১৯৭১ সালের মার্চ মাস। বহু চড়াই, উৎরাই পেরিয়ে শুরু হয় অসহযোগ আন্দোলন। আপোষ ফর্মুলা বের করার জন্য পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাঝে আলোচনা ভেস্তে যায়। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন। সারাদেশ জুড়ে ইপিআর, পুলিশ, বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈন্য, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্র তথা স্বাধীনতাকামী মানুষের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর যুদ্ধ শুরু হয়।
সুনামগঞ্জে কোন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ছিল না। কিন্তু ছিল মুষ্টিমেয় বাঙালি দালাল। ২৭ মার্চ সুনামগঞ্জ আওয়ামী লীগ নেতাদের নির্দেশে ট্রেজারিতে রক্ষিত ৫০টি রাইফেল লুট করে এনে আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর ও ছাত্রকর্মীদের মধ্যে বণ্টন করা হয় পাকসেনাদের প্রতিরোধ করার জন্য। সুনামগঞ্জ শহরের পুরাতন ডাকবাংলায় পাকিস্তানিরা আশ্রয় গ্রহণ করে এবং যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট পরাজয় বরণ করে। ৮ মে পাকসেনারা আবার সুনামগঞ্জ দখল করলে আমরা তখন ভারতে আশ্রয় প্রার্থনা করি। ভারতে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে পাকসেনাদের সাথে সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ করি।
আজকে মনে হয় সে সময় নিজের জীবন বাজী রেখে যে যুদ্ধ করেছিলাম সে দিন মনের জোর কোথায় পেয়েছিলাম? কার উৎসাহ, কার প্রেরণায় জনগণ অকাতরে আমাদের সাহায্য করেছে? কারণ এই ক্ষেত্রটা বঙ্গবন্ধু তার নেতৃত্ব দিয়ে তৈরি করেছিলেন। যার কারণে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জনযুদ্ধে পরিণত হয়েছিলো।
তার ভাষণে মুগ্ধতা ছিলো, কান ও মন একসাথে শুনতে বাধ্য ছিলো। তার আদরে আন্তরিকতা ছিলো, শাসনে প্রশ্রয় ছিলো। কর্মী বা নেতার নাম তার ঠোঁটের আগায় ছিল। তাঁর স্মরণ শক্তি প্রবাদে রূপান্তরিত ছিলো। মাটি যেমন সকল ভার বহন করার ক্ষমতা রাখে ঠিক তেমনি তাঁর সারা জাতির ভার বহন করার ক্ষমতা ছিলো।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক কুলাঙ্গার সীমারের দল তাকে হত্যা করে সব তছনছ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুকে আয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের মতো সামরিক জান্তারা মারার সাহস পায়নি, সে জায়গায় বাঙালিরা তাদের প্রিয় নেতাকে সপরিবারে হত্যা করে বেতার টিভিতে সদম্ভে ঘোষণা করে। হতবাক হয়ে যায় দেশ ও জাতি।
তিনি সূর্য্যরে আলোতে, চন্দ্রালোকে, গাছের সবুজ লতা পাতায়, ভক্তদের প্রাণে ফুলের সৌরভে, বাঙালির গৌরবে, নদীর প্রবাহে, বাঙালির আবহে তিনি ছিলেন তিনি আছেন এবং থাকবেন। আগের চেয়ে তীব্রভাবে, শাণিত হয়ে, প্রচুর সম্ভাবনার উদার ভান্ডার হয়ে থাকবেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের অহংকার হয়ে, দেশপ্রেমের উজ্জ্বল পতাকা হয়ে তিনি বাঙালির প্রাণের ভিতর, প্রাণের গহীনে বেঁচে থাকবেন।
লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা।