একটি বর্ধিষ্ণু গ্রামের নাম ‘মিয়ারচর’

হোসেন তওফিক চৌধুরী
দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলে বিশ্বম্ভরপুর থানার প্রতিষ্ঠা। তদানীন্তন সুনামগঞ্জ সদর থানার পলাশ, তাহিরপুর থানার বাদাঘাট ইউনিয়ন এবং জামালগঞ্জ থানার ফতেহপুর ইউনিয়নের অংশ বিশেষ নিয়েই নতুন থানা বিশ্বম্ভরপুরের সৃষ্টি। ১৯৮৩ সালে উপজেলা পদ্ধতি কর্মসূচীর আওতায় এই থানা উপজেলায় উন্নীত হয়। উপজেলা হওয়ার আগেও বিশ্বম্ভরপুর ভাটি এলাকার একটি প্রসিদ্ধ নদীবন্দর ছিল।
বিশ্বম্ভরপুরের একটি গ্রামের নাম মিয়ারচর। গ্রামটি একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম। খর¯্রােতা পাহাড়িয়া নদী যাদুকাটার পূর্ব তীরে এই গ্রামের অবস্থান। গ্রামে একটি বেশ বড় বাজার আছে। মাদ্রাসা ও জুনিয়র স্কুল রয়েছে। মনবেগ, আমড়িয়া, ছত্রিশ, শাহপুর ও মিয়ারচরের মানুষ এই স্কুলের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই পাঁচ গ্রামের মানুষ পঞ্চগ্রাম নাম দিয়েই স্কুল করেছেন। যাদুকাটার তীরে বলেই বালু-পাথরের ব্যবসাও জমজমাট। গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে।
এই গ্রামের একটি ইতিহাস আছে। এই গ্রামের প্রাণ পুরুষ ছিলেন ফর্সা মড়ল নামে এক ব্যক্তি। তিনি তাহিরপুর থানার বাদাঘাট ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের ধনাঢ্য ও প্রচুর ভূ-সম্পত্তির মালিক হাজী মকবুল পুরকায়স্থের প্রিয়পাত্র ছিলেন। হাজী মকবুল পুরকায়স্থকে মানুষ “মিয়া” বলে সম্বোধন করতো। মিয়া নামেই তিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন। এই গ্রামের ভূমি তখন পতিত ছিল। ফর্সা মড়ল সেখানে বসতি নির্মাণের জন্য মিয়ার কাছে প্রস্তাব করলেন। “মিয়া” প্রস্তাবে সম্মত হলেন এবং ধীরে ধীরে বসতি গড়ে উঠলো। গ্রামের মানুষ এই নতুন গ্রামের নাম মিয়ার নামানুসারেই রাখল “মিয়ারচর”। মিয়ার স্মৃতি এভাবেই গ্রামের সাথে জড়িয়ে গেলো। হাজী মকবুল পুরকায়স্থ (মিয়া) সুনামগঞ্জের হাজী মকবুল পুরকায়স্থ এম.ই মাদ্রাসা (এইচএমপি) এবং বর্তমান এইচএমপি হাইস্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর পুত্র গোলাম রব্বানী পুরকায়স্থ (মালু মিয়া) তাহিরপুরের বাদাঘাট কলেজের ভূমি দান করেছেন। তিনি কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। শাহজাহান পুরকায়স্থ, সাংবাদিক সাজু পুরকায়স্থ, শাহাদাত পুরকায়স্থ ও মানিক পুরকায়স্থের পিতা গোলাম রব্বানী পুরকায়স্থ। এই নিবন্ধের লেখক হোসেন তওফিক চৌধুরী, সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ার “মিয়ার” মেয়ের দিকের নাতি। মিয়া তাঁর দুই মেয়েকে বিন্নাকুলী গ্রামে বিয়ে দেন। সাংবাদিক-রাজনীতিবিদ মকবুল হোসেন চৌধুরী ও সাবেক জেলা ও দায়রা জজ ইকবাল হোসেন চৌধুরী তাঁর জামাতা। মিয়ারচর গ্রামটি প্রাচীন না হলেও বেশ পুরনো। গ্রামের বেশীর ভাগ মানুষ কৃষিজীবী ও ব্যবসায়ী। গ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আব্দুল মজিদ, তারা মিয়া, নুরুল ইসলাম প্রমুখ। আব্দুল মজিদ ভাইস চেয়ারম্যান ও তারা মিয়া ও নুরুল ইসলাম দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। মিয়ারচরের মধ্যে দিয়েই সুনামগঞ্জ-বাদাঘাটের চলাচলের সহজ পথ। এখন যাদুকাটা নদীতে নৌকা ফেরী চালিয়ে চলাচল করা হয়। এখানে একটি ব্রীজ নির্মাণ করা হলে যোগাযোগ সহজ হবে। এতে সময় কম লাগবে এবং বাদাঘাট বাজারের পণ্য পরিবহন সহজ হবে। এ ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করলে এলাকা উপকৃত হবে। এতে চলাচলের সুবিধা ছাড়াও বৃহৎ বাদাঘাট বাজারের সমৃদ্ধি হবে। ব্রীজ নির্মাণ একটি সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। চলাচলের ব্যবস্থাকে সচল ও অব্যাহত রাখার জন্য অবিলম্বে যাদুকাটা নদীতে গাড়ী পাড়াপাড়ের জন্য ফেরী ব্যবস্থা চালু করতে হবে। তবে মোল্লাপাড়ার মিয়া হাজী মকবুল পুরকায়স্থ ও ফর্সা মড়ল দীর্ঘদিন পূর্বে মারা গেছেন। কিন্তু তাদের স্মৃতি গ্রামের সাথে জড়িয়ে রয়েছে এবং যুগ যুগ ধরে তাঁদের স্মৃতি স্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণও তাঁদেরকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় স্মরণ করে।
লেখক : আইনজীবী-কলামিষ্ট।