একটি মানুষ কুপানোর ভিডিও এবং ভীরুতা ও কাপুরুষতা

গতকাল রাত থেকে ফেসবুকে একটি ভিডিও, কয়েকটি ছবি ও একটি সংবাদ ভাইরাল হয়েছে। পরে দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের অনলাইন সংস্করণেও খবরটি গুরুত্ব পেয়েছে। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অবশ্য ভিডিওটি খুঁজে খুঁজে সরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ছবি ও খবরটি ঠিকই লক্ষ জনের নানা ধরনের মন্তব্যে মুখরিত ছিল। খবরটি খুবই মর্মান্তিক, হৃদয়বিদারক, একই সাথে মনুষত্বের অবনমনের দৃষ্টান্ত। ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, দুই ব্যক্তি রাম দা দিয়ে কুপাচ্ছে এক তরুণকে। তার স্ত্রী দুর্বৃত্তদের রুখার প্রাণান্ত চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। ঘটনাস্থলে বেশ কয়েকজন মানুষ দর্শকের ভূমিকায়। তারা নির্বিকার। গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা গেল, রাম দার উপর্যুপরি কুপে রক্তাক্ত তরুণটি মারা গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে প্রকাশ্য রাস্তার উপরে। স্পট বরগুনা সরকারি কলেজের সামনের রাস্তা। নিহত তরুণের নাম রিফাত শরীফ। আর যারা কুপিয়েছে সেই হন্তারক দুইটির নাম নয়ন বন্ড ও রিফাত ফরাজী। ভিডিওটি দেখে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকার রাস্তায় কুপিয়ে হত্যা করা বিশ্বজিতের চেহারা সকলের সামনে ভেসে উঠবে। সেই একই কায়দা, একই নৃশংসতা। সংবাদ মাধ্যম সূত্রে জানা যায়, অন্যতম খুনি রিফাত ফরাজী স্থানীয় এক সরকারি দলীয় নেতার আত্মীয়। এখানেও আশ্চর্য সাযুজ্য। বিশ্বজিৎ হত্যাকারীরাও ছিল সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা। এই দেশে বিশ্বনন্দিত লেখক-প-িত হুমায়ুন আজাদকে প্রকাশ্য রাস্তায় কুপিয়ে জখম করা হয়েছে। কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে ব্লগার অভিজিৎকে, চাপাতির আঘাতে মরেছেন আহমদ রাজিব হায়দার, কুপিয়ে কুপিয়ে মারা হয়েছে ওয়াশিকুর রহমানকে। সিলেটে প্রকাশ্য রাস্তায় ফেলে মারা হয়েছে অনন্ত বিজয় সিংহকে। হুমায়ুন আজাদ থেকে শেষোক্তরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর। কুপিয়ে মানুষ মারার মাঝে ধর্মান্ধ উগ্রবাদীরা অলৌকিক কিছু প্রাপ্তির নেশাশক্ত ছিল, তাদের মগজের কোষ এমনভাবেই বদলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই যে বিশ্বজিৎ কিংবা রিফাত শরিফকে কুপানো, তার বেলায় কী? এ তো হত্যাকে উৎসব বানিয়ে ফেলার মতো সভ্যতা বিরোধী এক নিষ্ঠুরতা। এমন নিষ্ঠুরতার পুনরাবৃত্তি কেন বার বার দেখতে হচ্ছে আমাদের ?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রিফাত হত্যার প্রেক্ষিতে যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে তা হলো, উপস্থিত দর্শকদের নির্বিকার মনোভাব। তারা কেউ রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। যদি সাহস করে এক দু’জন এগিয়ে আসত তাহলে দুই খুনি পালানোর পথ খুঁজে পেত না। কিন্তু তার পরেও কেউ আসেনি। অথচ এদেরই কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও ধারণ করেছে। নতুবা হত্যাকা-ের ভিডিও ফেসবুকে আসল কেমন করে? দর্শক সারি থেকে প্রতিরোধ গড়ে না তোলার জন্য ভীরুতা ও কাপুরুষতাকে দায়ী করা হচ্ছে। দু’টিই সত্যি। আমরা ক্রমশ শামুকের ভিতর গুটিয়ে যাচ্ছি। নিজেকে ছাড়া জগৎ-সংসারের সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখার প্রচ- আত্মকেন্দ্রিক সময় আমরা গড়ে তুলেছি। এই আত্মকেন্দ্রিকতা থেকেই জন্ম নেয় ভয় ও কাপুরুষতা। রিফাতকে কুপানোর সময় কারও প্রতিরোধ না করার দৃষ্টান্ত থেকে আমাদের সমাজ মানসের এই অন্ধকার দিকটিই উন্মোচিত হয়। এমন অন্ধকার মনোজগত একটি আলোকিত দেশ গড়ে তুলবে কী করে, এই প্রশ্নও তাই স্বাভাবিক।
রিফাত হত্যাকা-ের ভিডিওটি যারা দেখেছেন তারা কেউই ধাতস্থ থাকতে পারবেন না। তারও প্রচ-ভাবে ভীত হয়ে পড়বেন, নিজেকে নিয়ে-স্বজনকে নিয়ে। নাগরিক সমাজ যদি ব্যাপকভাবে ভীরুতার চাদরে এভাবে সেঁধিয়ে যায় তাহলে ওই জনগোষ্ঠী বেড়ে উঠবে নিতান্তই অপুষ্ট মানসিকতা নিয়ে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিক সমাজকে ভীরুতার কবল থেকে উদ্ধার করা। বরগুনার রিফাত নিজের জীবন দিয়ে সেই সত্য বলে গেল।