একুশ হলো লক্ষবিন্দু স্থির করার দিন

বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার সবচাইতে সফল উদ্ভাসন-ইতিহাস ছিল ভাষা আন্দোলন। ১৯৪৮ সনে এর শুরু শেষ ১৯৫২ সনে। ভাষার প্রশ্নে নিজেদের অধিকার রক্ষার আন্দোলন করতে যেয়ে বাঙালি নিজেদের চিনতে শিখল আর বুঝতে শিখল জাতীয়তাবোধের প্রগতিশীলতাকে কোন উপায়ে দেশ ও জাতির উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়। ভাষা আন্দোলনের যে চেতনা বাঙালি জাতিকে এক নতুন চিন্তার জগতে নিয়ে গিয়েছিলো সেখান থেকেই তৈরি হয় ১৯৭১ সনে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় কাহিনি। সুতরাং শহীদ দিবস নিছক ইতিহাসের একটি তারিখ নয়। এ হলো একটি জাতির একটি জনপদের জেগে উঠার পথে লক্ষবিন্দু স্থির করার দিন। আমরা এখনও ওই চেতনার অগ্নিমশাল হাতে জ্বালিয়ে রেখেছি। ওই আলোয়ই আমরা পথ দেখি। আজ ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের পুনরাগমন বাৎসরিক পরিবৃত্ত সম্পাদনের পথে বেয়ে। রক্তরাঙা, পলাশ শিমুল ফোটাÑ বসন্তের জাগরণী দিন। অহংকারী চিত্তে আজ আমরা স্মরণ করি আমাদের জাতীয় বীরÑ ভাষার দাবিতে রাজপথে আত্মোৎসর্গকারী মহানায়ক রফিক, জব্বার, সালাম… থোকা থোকা অমর শহীদদের। এই দিনে সকল ভাষাসংগ্রামীদের সাথে পরম গৌরবে স্মরণ করি আমাদের এই জনপদের ভাষাসংগ্রামী আব্দুল হাই, বরুণ রায়, আব্দুস সামাদ আজাদ, প্রিয়ব্রত দাস মঞ্জু, সত্যব্রত দাস কাজল, আব্দুল মতিন, আব্দুল হক, আলফাত উদ্দিন মোক্তার, হোসেন বখত সহ সকলকে। একটি জাতি, জনপদ অথবা রাষ্ট্র একদিনে গড়ে উঠে না। উত্থান পর্বের নানা বাঁকে বিন্দু থেকে সিন্ধুসম অবদান রাখেন অনেকে। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সকলের সম্মিলিত অবদানের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায় এই ইতিহাস। সুতরাং এমনসব ঐতিহাসিক দিনে অতীতের দিকে ফিরে তাকানোর দিকে সকলের অন্তরের তাগিদ হওয়া বাঞ্ছনীয়।   
এইসব দিনে আত্মোপলব্ধি ও আত্মসমালোচনারও রয়েছে ভীষণ প্রয়োজন। যে মহান আদর্শগুলোকে সামনে রেখে আমাদের পূর্বপুরুষরা ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত, এবং এর পরেও নানা ঐতিহাসিক প্রয়োজনে, রক্ত বিলিয়েছেন, ত্যাগ করেছেন নিজেদের বর্তমান; তাঁদের সেইসব উদ্দেশ্য কি আমরা পূরণ করতে পেরেছি, পারছি? শহীদ দিবসের চেতনার প্রশ্নে বলা যেতে পারে, ওখানে বড় জাতীয় অর্জন থাকলেও অপূর্ণ রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু। ১৯৪৮-১৯৫২ কালপর্বে উন্মেষ ঘটা জাতীয়তাবাদী চেতনার মর্মবাণী ছিলÑ সমতা, ন্যায্যতা, মর্যাদা, প্রগতি। পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে এই মর্মবানীগুলোই আমাদের পথ দেখিয়েছে। কিন্তু আমরা এখনও এর অনেক কিছুকেই আজ অস্বীকার করে এগিয়ে চলেছি। ইতিহাসের শিক্ষাকেই আমরা বহুক্ষেত্রে  পদদলিত করেছি। তাই তো আজ রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিকতা; সর্বত্র প্রবল বিচ্ছিন্নতাবোধ, আত্মকেন্দ্রীকতার ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে আছি আমরা। এইসব ঘেরাটোপকে ভাঙতেই বারে বারে একুশকে ফিরে দেখা ও একে কেন্দ্র করে নিজেদের মূল্যায়ন করে ইতিকর্তব্য নির্ধারণ করা জরুরি।
যে জাতির ভিত্তিমূলে রয়েছে ভাষা আন্দোলনের মতো ইতিহাস সেই জাতি কখনও পরাস্ত হতে পারে না। ইতিহাসের ভূততাড়িত পশ্চাদগমনকে তাই বার বার এই জাতি রুখে দিয়ে সঠিক পথের সন্ধান করতে পেরেছে। আজও পারবে। তাই এবারের একুশের উপলব্ধি হোক ওই প্রত্যয়ে প্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণের।