এক পরিবারে এত অস্ত্র কেন?

ছাতকে ৫ সহোদরের ছয় আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের খবরটি ঈদের আগে ছিল আলোচিত একটি খবর। জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই আগ্নেয়াস্ত্রগুলোর লাইসেন্স বাতিল করেছেন সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক তথা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ব্যাপকভাবে অভিযোগ ছিল, গত ১৪ এপ্রিল ছাতক পৌর এলাকায় নদীপথের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সৃষ্ট রক্তক্ষয়ী বন্দুক যুদ্ধে এই বৈধ অস্ত্রগুলোর অবৈধ ব্যবহার হয়েছিল। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে ওই বন্দুক যুদ্ধে বৈধ অস্ত্রের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারেরও অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বৈধ অস্ত্র যেহেতু সরকারের নথিতে তালিকাভুক্ত আছে তাই সেগুলোর লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। কিন্তু বন্দুক যুদ্ধের পর প্রায় দুই মাস পার হতে চললেও অবৈধ অস্ত্রের কোন খোঁজ মিলেনি। এই অবৈধ অস্ত্রগুলো কিন্তু যথারীতি সংশ্লিষ্টদের হাতে ঠিকই রয়ে গেছে ছাতকবাসীর জন্য মূর্তিমান আতংক হয়ে। সকলেই জানেন জেলার মধ্যে ছাতক একটি সংঘর্ষপ্রবণ এলাকা। এখানে প্রায়শই নানা কারণে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঘটে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে এসব অবৈধ অস্ত্র সকলেরই ভয় বাড়িয়ে দেয়। ছাতকের তথা পুরো জেলার মানুষই চান সর্বত্র অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ হোক।
ছাতকে যে ছয় অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে সেগুলো একই পরিবারের ৫ ভাইয়ের। আলোচিত এই পরিবার কালাম চৌধুরী ও শামীম চৌধুরীর নামে হালে ব্যাপকভাবে পরিচিত। ছাতকে এই ভ্রাতৃদ্বয়ের রয়েছে ব্যাপক প্রভাব-প্রতিপত্তি। ছাতকের বহু লোক বিভক্তভাবে দুই জনেরই অনুসারী। সম্প্রতি দুই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছে যার বিস্ফোরণ ঘটেছিল ১৪ এপ্রিল ভয়াবহ একটি সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে। ওই সংঘর্ষে এক ঠেলাচালকের মৃত্যু হয়। ৯ পুলিশসহ উভয়পক্ষে কমপক্ষে ৪০ ব্যক্তি আহত হয়েছিলেন। বলাবাহুল্য লাইসেন্স বাতিল হওয়া অস্ত্রগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছিল এই সংঘর্ষে। তাই এসব অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে জেলা পুলিশ ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একটি ভাল কাজ করেছেন। তাঁদের আমরা অভিনন্দন জানাই। আলোচিত এই পরিবারে আরও অস্ত্র আছে কিনা আমরা জানি না। তবে আমরা আশা করতে পারি এই লাইসেন্স বাতিলের মধ্য দিয়ে ছাতকে অস্ত্রের ঝনঝনানি কমে আসবে।
গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষা তথা আত্মরক্ষার জন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়। একটি পরিবারে এত অস্ত্রের প্রয়োজন রয়েছে কিনা সেটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ভাল বলতে পারবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অস্ত্রাধিক্য দেখে রীতিমত ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার জোগাড় হয়েছেন। দেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনির ব্যাপক উপস্থিতির পরও যে পরিবার এতগুলো অস্ত্র রাখতে পারেন, নিশ্চিতভাবেই তারা মনে করেন যে তাদের প্রচুর শত্রু রয়েছে। এই শত্রুরা যেকোন সময় তাঁদের যে কারও প্রাণনাশের কারণ হতে পারে। তাই নিজেদের সুরক্ষার জন্য তারা অস্ত্র রেখেছেন। এই যে ভয়, আত্মীয়-স্বজন-প্রিয়জন-অনুগতজন পরিবেষ্টিত হয়েও কেন তারা এত ভয় পান? এই দেশের সাধারণ মানুষ তো কলহপ্রিয় নয়। পাকিস্তান-আফগানিস্তানের মতো গোষ্ঠী বিরোধে অকারণে প্রাণ কেড়ে নেয়ার বাস্তবতা বাংলাদেশে কখনও ছিল না। তার পরেও কেন তাদের এই ভয়, বিষয়টির পিছনে কোন আর্থ-সামাজিক কারণ রয়েছে তা উদ্ঘাটন আবশ্যক। এই সাথে এই প্রশ্ন তোলাও অসংগত হবে না, এরা আত্মরক্ষার জন্য নাকি অন্যদের ভয় দেখানোর জন্য এত অস্ত্র রেখেছিলেন? এইসব প্রশ্নের উত্তর না মিলালে অশান্ত জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনার কাজটি সুকঠিন হয়ে পড়বে বৈকি। মনে রাখতে হবে অশান্তির কাজটি করে থাকে সামান্য কিছু মানুষ। এই সামান্য মানুষের কাছে সকল মানুষের জিম্মি হয়ে যাওয়াটা একেবারেই অনাকাক্সিক্ষত।