এক বিশ্বনেত্রীর প্রতিকৃতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

এম এ মান্নান এমপি
বাংলাদেশ সরকারের চারবারের প্রধানমন্ত্রী, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনার ৭৬তম জন্মদিনে তাঁকে উষ্ণ অভিনন্দন ও ভ্রাতৃপ্রতিম শুভেচ্ছা জানাই! তাঁর সঙ্গে আমার সরাসরি পরিচয় ১৯৮৬ সালে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসেবে তাঁর নাম আমরা আগে থেকেই জানতাম। আমি তাঁর থেকে বয়োজ্যেষ্ঠ; কিন্তু প্রায় সমসাময়িক। সে পরিপ্রেক্ষিতে এখানে আমার ব্যক্তিগত কিছু অনুভূতি প্রকাশ করছি।
জননেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ হয় ১৯৮৬ সালে, আমার ময়মনসিংহে জেলা প্রশাসক থাকাকালে। তিনি তখন সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদের সময়কার জাতীয় সংসদে কেবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় বিরোধীদলীয় নেতা। সার্কিট হাউসে আলাপচারিতার সময় আমি তাঁর পিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আমার স্বাভাবিক আনুগত্যের কথা সবিনয়ে জানাই এবং বাংলাদেশের জনগণের কল্যাণে, প্রয়োজনে জেলা প্রশাসকের পদ ছেড়ে দিয়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করি। তিনি তখন অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আমাকে বলেন, বাংলাদেশে চেপে বসা তখনকার সামরিক শাসন যথানিয়মে অচিরেই শেষ হবে এবং তাঁর দৃঢ়বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষ পুনরায় আওয়ামী লীগের হাতে তাদের দেশের শাসনভার তুলে দেবে। ভবিষ্যতে, তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দেবেন বলেও ‘প্রতিশ্রুতি’ দেন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে পুনরায় তাঁর সঙ্গে জেনেভায় আমার সাক্ষাৎ হয়; তখন তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আমাকে অবাক করে ১৫ বছর আগে তাঁর দেওয়া ‘প্রতিশ্রুতি’ পুনর্ব্যক্ত করেন। আমি তাঁর স্মরণশক্তি ও ‘প্রতিশ্রুতি’ রক্ষার মানসিকতা দেখে অভিভূত হই।
২০০৩ সালে আমি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করি। ২০০৫ সালে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম মেম্বার, সাবেক কৃষি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের শূন্য আসনে উপনির্বাচনের সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁর সমর্থনের আশায় আমি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেয়নি। তাই তিনি আমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উপনির্বাচনে অংশগ্রহণের পক্ষে মত দেন। তাঁর এই প্রচ্ছন্ন সমর্থনের পটভূমিতে আমি সাহস করে একজন প্রায় অচেনা ব্যক্তি হিসেবে উপনির্বাচনে অংশ নিই এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির প্রার্থীর কাছে অল্প ভোটে পরাজিত হই। উপনির্বাচনে পরাজয়ের পর আমি নেত্রীর সঙ্গে ঢাকায় সাক্ষাৎ করি এবং ২০০৫ সালের জুলাই মাসে তাঁর আহ্বানে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আমাকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেন, এতে আমি বিপুল ভোটে জয়লাভ করি। তিনি আমাকে তিনটি সংসদীয় কমিটিতে সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দেন। এই সংসদের শেষের দিকে তিনি আমাকে সরকারি হিসাবসংক্রান্ত সংসদীয় কমিটিতে চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনয়ন দেন। এর বাইরেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিতে তাঁর নিজের স্থলাভিষিক্ত সদস্য হিসেবে আমাকে মনোনয়ন দেন। এটিও আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের একটি দায়িত্ব ছিল।
এরপর ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমি পুনরায় নির্বাচিত হই এবং প্রথমে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং দুই মাসের মাথায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও সমান্তরাল দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
পরবর্তী সময়ে ২০১০ ও ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে তিনি আমাকে কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করে দলীয় কাজে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেন। ২০১৮ সালে নির্বাচনে জয়লাভের পর আমাকে তিনি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব অর্পণ করেন। এখন আমি সে দায়িত্ব পালন করছি। মূলত পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পরই জাতীয় ইস্যুতে তাঁর যে দক্ষতা, বিচক্ষণতা আর রাষ্ট্র পরিচালনায় দূরদর্শী চিন্তাভাবনা-এসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তারই কিছু এখানে আজকে তাঁর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে বলব।
সত্যি কথা বলতে কি-জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, সাহস, দেশপ্রেম ও পোড় খাওয়া অভিজ্ঞতার প্রকাশ আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করেছে। তাঁর সহজাত সৌজন্যমূলক আচরণ, তীক্ষè দায়িত্ববোধ, আমার মতো একজন বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সহকর্মীর প্রতি সৌজন্যমূলক আচরণ-এসবই চিরদিনের জন্য আমাকে কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করেছে। তাঁর মহান পিতা আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দূর থেকে দেখে যেভাবে আশৈশব মুগ্ধ হয়েছি, এখন পরিণত বয়সে তাঁর কন্যাকে কাছে থেকে দেখে প্রতিটি মুহূর্ত তাঁর মহান পিতার কথা স্মরণ করছি।
প্রায় ৯ বছর ধরে আমি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের অন্যতম সর্বোচ্চ ফোরাম একনেকের সভাগুলোতে তাঁর প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করেছি। বাংলাদেশের মাটি, জল, হাওয়া ও মানুষের প্রতি তাঁর সহজাত ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রতিটি ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিকভাবে সমুজ্জ্বল রয়েছে। আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর বিষয়ে তাঁর সাহসিকতা এখন সর্বজনস্বীকৃত।
বাংলাদেশের আনাচে কানাচে কোথায় কোন নদীর চর বা জলাশয় রয়েছে, সেগুলো তাঁর নখদর্পণে। একনেক সভায় প্রকল্প পর্যালোচনাকালে তিনি প্রতিটি প্রকল্পের খুঁটিনাটি বিষয়ে খোঁজখবর নেন এবং অন্তর্ভেদী প্রশ্ন উত্থাপন করেন। উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে জনকল্যাণ সংশ্লিষ্টতা, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য সম্ভাব্য সুযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন ও খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণ-এসব বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে এবং নির্দেশনা দিয়ে তিনি একনেক সভাগুলোকে প্রাণবন্ত আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
জননেত্রী শেখ হাসিনার সময়ানুবর্তিতা, একজন বাঙালি হিসেবে আমি তাঁর এক অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্য হিসেবে গণ্য করি। কোনো সভায়ই তিনি দেরিতে আসেননি। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে দেরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে তিনি আগেই সভাকে অবহিত করেছেন। এ প্রজন্মের মানুষের কাছে এটিকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে গণ্য করি। ব্যয়সাশ্রয়ী প্রকল্প ও তা দ্রুত বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি পরিষ্কার ও বোধগম্য নির্দেশনা দিয়ে থাকেন, যা আমার মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার কাজের ক্ষেত্রে সহায়ক হচ্ছে।
নেতৃত্বের অপার গুণাবলির জন্য বিশ্ব অঙ্গনেও সমানভাবে তাঁর বিচরণ করছেন। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য বা এমডিজি এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি বাস্তবায়নেও তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এসব ক্ষেত্রে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য তিনি জাতিসংঘ ও অন্যান্য অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থা কর্তৃক বারবার পুরস্কৃত হয়েছেন। গর্বের সঙ্গে বলতে পারি, বিশ্বমঞ্চের একজন প্রথম সারির নেতা হিসেবে তিনি স্বীকৃতি পেয়েছেন।
বেশভূষায়, আহারে, আচরণে তিনি আবহমান বাঙালি নারীর প্রতিভূরূপে বর্তমান প্রজন্মের কাছে নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরেছেন। বাংলা ভাষায় তাঁর সমৃদ্ধ জ্ঞান, লেখনী এবং বাচনিক দক্ষতা একনেক সভাসমূহ এবং অন্য সব ক্ষেত্রে সবার কাছে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ভোজ পর্বে মর্যাদায় কনিষ্ঠতম ব্যক্তিরও সমানভাবে খোঁজখবর নিয়ে থাকেন। সব অনুষ্ঠানে তিনি সাদামাটা দৈনন্দিন বাঙালি খাবার পরিবেশন করতে উৎসাহ দেন এবং আমার মন্ত্রণালয়ের সব সভায় একই ধরনের অনাড়ম্বর বাঙালি খাবারসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনা সহজ করার নির্দেশনা দেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাকালে কখনো আমার বা আমার সহকর্মীদের কোনো কাজের প্রতি তিনি বিরক্তি বা রূঢ় মনোভাব দেখাননি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একমত না হলেও তিনি তাঁর মতামত দৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেছেন এবং সভা প্রধান হিসেবে চূড়ান্ত মতামত প্রদর্শন করেছেন। সভায় প্রত্যেক সদস্যকে মত প্রকাশের ও কথা বলার সুযোগ তিনি অবারিত করে দিয়েছেন।
দীর্ঘ চাকরিজীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সভায় আমি উপস্থিত থাকার সুযোগ পেয়েছি। তবে শেখ হাসিনার সভাসমূহে উপস্থিতির আনন্দ চিরদিন আমার মনে অম্লান থাকবে। একনেক ছাড়াও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট সরকারি সারসংক্ষেপগুলো তাঁর কাছে পাঠিয়ে দ্রুততম সময়ে ফেরত পেয়েছি। বিদেশ থেকে দীর্ঘ উড়ালের পরও স্বল্পতম সময়ের মধ্যে একনেক সভায় তিনি উপস্থিত হয়ে আমাদের অবাক করেছেন সব সময়। তিনি ‘জেট ল্যাগ’ জয় করার শক্তি কোথায় পান, তা আমাকে ভাবায়।
২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এত বছর কোনো বিষয়ে তিনি আমাকে ফোনে বা সাক্ষাতে অথবা লিখিত কোনো নেতিবাচক বা উষ্মামূলক নির্দেশনা দেননি। তাঁর অভিপ্রায় দৃঢ়ভাবে সভায় সবার সামনে উপস্থাপন করেছেন। এটিই তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অনন্যসাধারণ দিক। আমি তাঁর ৭৬তম জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমার ব্যক্তিগত আনুগত্য ও বিপুল শ্রদ্ধা পুনরায় ব্যক্ত করছি। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে মাতৃভূমির সেবায় আমি উৎসর্গ করতে পেরেছি; তাঁর সান্নিধ্যে সরাসরি নির্দেশনা পেয়ে দায়িত্ব পালন করেছি। আমি তাঁর কাছে চির কৃতজ্ঞ, শুভ জন্মদিন মাননীয় জননেত্রী।
লেখক : পরিকল্পনা মন্ত্রী