এক ব্যবস্থাপত্রে ছয় ব্যথানাশক- গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমন বিচ্যুতি কেন?

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি ও গৌরব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর কর্ণধার ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী একাত্তরে বিলাতে এফসিপিএস শেষ পর্বের অধ্যয়ন চুকিয়ে দেশমাতৃকার ডাকে দেশে ফিরে আসেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য আগরতলায় গড়ে তুলেন হাসপাতাল। একটি স্বাধীন দেশের স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো কেমন হবে, কেমন হবে সেই দেশের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, যেখানে স্বল্পবিত্ত বা বিত্তহীন জনগোষ্ঠী সুলভে ন্যূনতম চিকিৎসা সেবা পাবেন; এই ধরনের গণমুখী নীতি-আদর্শই ড. জাফরুল্লাহকে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ও হাসপাতাল গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাঁর অনুরোধে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধু গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তুলতে সার্বিক সহযোগিতা দেন। গণমুখী স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অর্জন করে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম অর্জনকারী তথা স্বল্পমূল্যে ও অনেকক্ষেত্রে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য শিক্ষা দিয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি সকলের অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল সেই প্রতিষ্ঠানটি আজ এর প্রধান উদ্যোক্তার রহস্যজনক রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়ে চলেছে। চিকিৎসা সেবা আর রাজনীতির মাঝে বাহ্যত কোন সম্পর্ক না থাকলেও আমরা জানি রাজনীতি এবং এর সাথে অনুসৃত অর্থনৈতিক নীতিই আর সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। আজ সারা দেশে চিকিৎসা পদ্ধতিটি যেভাবে অতি বাণিজ্যিক হয়ে উঠেছে তার পিছনে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নীতিই মুখ্য ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের চিকিৎসা কাঠামোকে সাধারণের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বগ্রাসী মুনাফামুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে। এই জায়গায় একটি গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র হতে পারত উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। কিন্তু এর প্রধান উদ্যোক্তা ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরী আজ চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন চিন্তাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে রাজনৈতিক অভিলাষকে প্রধান করে তুলেছেন। তাও এমন এক রাজনীতি যা কিনা প্রচলিত মুনাফামুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। ফলে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি নিজের সুনাম ও ঐতিহ্যকে আজ বিপন্ন করে তুলেছে।
উপরে এত কথা বলার কারণ হলো, এই জেলার একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল পাগলায় (দক্ষিণ সুনামগঞ্জ জেলার অন্তর্গত)
গণস্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হাসপাতালের চিকিৎসকগণের বিরুদ্ধে অবৈধতার অভিযোগ উঠেছে। দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে গতকাল প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, জনৈক রোগীকে ওই হাসপাতালের এক চিকিৎসক ছয় প্রকারের ব্যথানাশক ঔষধ ব্যবস্থাপত্রে লিখে দিয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে অবহিত হয়ে জেলার সিভিল সার্জন সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে দেখতে পান হাসপাতালের কোন চিকিৎসকেরই বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশন নেই। বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশন ব্যতিত কারও রোগী দেখার অধিকার না থাকায় সিভিল সার্জন তাঁদের চিকিৎসা সেবা দান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। আমাদের ভাবতে আশ্চর্য লাগে, আশির দশকে ড. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নেতৃত্বে যে স্বাস্থ্যনীতি প্রণীত হয়েছিল সেখানে যাবতীয় ব্যথানাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার রোধ সহ তথাকথিত ভিটামিন জাতীয় ঔষধ সহ বহু আইটেমের ঔষধ উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; সেই ড, জাফরুল্লাহ চৌধুরীর একটি হাসপাতালের কোন এক চিকিৎসক কিনা হাঁটুর ব্যথা সাড়াতে একসাথে ছয় ধরনের ব্যথানাশকের ব্যবস্থাপত্র দেন। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের এই মৌলিক বিচ্যুতিটি এর কর্ণধারের রাাজনৈতিক বিচ্যুতির সাথে সম্পর্কিত কিনা সেই বিতর্কে না গিয়েও আমরা বলতে পারি, চিকিৎসার নামে এই অপচিকিৎসার দায়ভার উনাকে নিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে বিএমডিসি’র রেজিস্ট্রেশনবিহীন চিকিৎসকদের কীভাবে তিনি হাসপাতালে নিয়োগ দেন সে বিষয়েও উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে হবে তাঁকে। নতুবা একসময় তিনি যে ইমেজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন সেটি ধূলায় গড়াগড়ি যাবে।