ঐক্যপ্রক্রিয়ার শুরুর ভাঙন বনাম রাজনীতির নীতি

ড. কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী, মাহমুদুর রহমান মান্না, আসম আব্দুর রবের নেতৃত্বাধীন জোটের সাথে বিএনপির ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং অভিন্ন কর্মসূচী ঘোষণা নিয়ে গণমাধ্যম যে আগ্রহ দেখাচ্ছে তার কোন কারণ বোধগম্য নয়। এই ঐক্য নিয়ে রীতিমত হৈ-হট্টগোল শুরু হয়ে গেছে। সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশনের টকশো ইত্যাদিতে ব্যাপক আলাপ আলোচনা থেকে যে কেউ ধরে নিতে পারেন এই ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বোধ করি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে কিছু একটা হতে যাচ্ছে। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির হালহকিকত সম্পর্কে যারা অভিজ্ঞ তাদের কাছে এমন প্রক্রিয়া তেমন কোন গুরুত্ব বহন করে না। ড, কামাল হোসেন, বি. চৌধুরী, আসম রব বা মান্না; এদের মুখমূল্য যেমন উচ্চমুখী, কার্যত কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাবক বা নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠার মতো কোন ক্ষমতা তাঁদের নেই। বিএনপি বরং কৌশলগত কারণে এই মুখমূল্যবান ব্যক্তিগণের সাথে ঐক্য স্থাপন করে কিছুটা সুবিধা নিতে পারে। তবে বিএনপি এক্ষেত্রে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান বা কৌশলে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় নি। বিকল্পধারা নেতা মাহী বি. চৌধুরী যেমন দৃঢ়ভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, জামায়াত বা স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গ না ছাড়লে বিএনপির সাথে কোন ঐক্য হবে না, বাস্তবে দেখা গেল শনিবার ওই ঘোষণা তো বাস্তবায়ন হয়ইনি উল্টো বিকল্পধারাই ঐক্যপ্রক্রিয়া থেকে অপমানজনকভাবে ছিটকে পড়েছে। শনিবার ঐক্যপ্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে বিকল্পধারা প্রধান বদরুদ্দোজা চৌধুরী পূর্বনির্ধারিত স্থানে গিয়ে দেখেন সেখানে এমন সভার কোন আলামত নেই। অথচ একই সময়ে অন্য একটি স্থানে বিএনপি নেতৃত্বের সাথে ড. কামাল, রব ও মান্না সাহেবদের আলোচনা চলছিল। সেখান থেকে ঐক্যের ঘোষণাও আসে। ওই ঐক্য করতে যেয়ে বিএনপিকে জামায়াত সঙ্গ ছাড়তে হয়নি। বিএনপির নেতৃত্বাধীন আগের ২০ দলীয় জোট যথারীতিই বহাল আছে। এর সাথে পৃথকভাবে আরও তিনটি দল যুক্ত হল মাত্র।
ঐক্যপ্রক্রিয়ার এমন অবস্থা থেকে আমরা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির একটি করুণ চিত্র দেখতে পাই। সেটি হল, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হলেও ক্ষমতার ছিটেফোটা ভাগ বাটোয়ার পেতে নামসর্বস্ব ব্যক্তিবৃন্দের আদর্শহীন মরিয়া প্রচেষ্টা। যেখানে আগের দিনের ঘোষণার সাথে পরের দিন কোন মিল থাকে না। গতকালের মিত্রকে আজ ছুড়ে ফেলে দিতে এক মুহূর্ত চিন্তা করা হয় না। এই ধরনের ঐক্য জাতীয় রাজনীতিতে বিন্দুমাত্র প্রভাব বিস্তার কিংবা গুণগত পরিবর্তনে সামান্য ভূমিকা রাখতে সক্ষম, এমন চিন্তার কোন অবকাশ নেই। ঐক্যপ্রক্রিয়ার অন্তর্গত দলসমূহের ঐক্যস্থাপনের আগেই ভাঙনের এমন করুণ দশা দেখে অনেকেই সহাস্যে নানা তির্যক মন্তব্য করছেন। তবে একটি জিনিস ভাল হয়েছে যে, এ ধরনের জোট গঠন যে অন্তসারশূন্য ও গুরুত্বহীন এই জিনিসটি বুঝা গেছে।
এই ঐক্যপ্রচেষ্টা থেকে আরও একটি হতাশাজনক বিষয় সামনে চলে আসল। ড. কামাল হোসেন, আসম আব্দুর রব ও মাহমুদুর রহমান মান্না এ দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত এক একটি ঐতিহাসিক নাম। অতীতে নানা সময়ে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখা এই ব্যক্তিরা নিজেদের পড়ন্ত সময়ে এখন স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে জোট বাঁধতেও দ্বিধা করেননি। ক্ষমতা, নির্বাচন, ভোটে জিতে আসার জন্য ডিগবাজি খেয়ে কেমন বিপরীত অবস্থানে নিমিষেই চলে যাওয়া যায়, আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন এই ঐক্যপ্রচেষ্টা থেকে সেটিও বুঝা গেল।