ঐক্যফ্রন্টের তফসিল পেছানোর দাবি বিবেচনার ইঙ্গিত ইসির

সু.খবর ডেস্ক
সংলাপের ফল বিবেচনায় নিয়ে তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাদেরকে তাৎক্ষণিকভাবে আশ্বস্ত করা না হলেও বিবেচনার কথা জানানো হয়েছে।
সোমবার বিকেলে ঐক্যফ্রন্টের একটি প্রতিনিধি দল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে কমিশনের অন্য চার সদস্য মাহবুব তালুকদার, রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম, শাহাদত হোসেন চৌধুরী ও কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, বরকত উল্লাহ বুলু, আব্দুল মালেক রতন, মোকাব্বির খান ও নঈম জাহাঙ্গীর। বৈঠক থেকে বেরিয়ে দু’পক্ষই সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনার কথা জানান।
তবে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বৈঠকে দু’পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়েছে। বিশেষ করে সিইসি কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্নার মধ্যে একাধিক ইস্যুতে বিতর্ক হয়।
এক পর্যায়ে সিইসি’র উদ্দেশ্যে মান্না বলেন, ‘মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ।’ বৈঠকে ঐক্যফ্রন্টের নেতারা কমিশনকে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচনের চেষ্টা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ওই নির্বাচনের চেষ্টা করে ফল পাওয়া যাবে না। কমিশন নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অন্যের ইশারায় চালিত হয় বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বৈঠক থেকে বেরিয়ে ঐক্যফ্রন্টের নেতা আ স ম আব্দুর রব জানান, কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে তারা তফসিল ঘোষণার সময় নির্ধারণে চলমান রাজনৈতিক সংলাপকে বিবেচনায় নেওয়া, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন ও ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারসহ বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনা করেন। কিছু বিষয়ে কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে আশ্বস্ত করলেও কিছু বিষয়ে তারা সময় নিয়েছেন। তফসিল পেছানোর দাবিটি তারা বিবেচনায় নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা না করার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতের অনেক নির্বাচনে তফসিল পিছিয়েছে; কিন্তু কোনো সমস্যা হয়নি। অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা না করে নির্বাচন হলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
আ স ম রব বলেন, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের বক্তব্যের জবাবে তারা বলেছেন, এজেন্টদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তারা ভোট কেন্দ্রের রেজাল্ট শিট তৃণমূল পর্যায়ে বিতরণ করবে বলেও ওয়াদা করেছে।
অন্যদিকে ইসির মুখপাত্র সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ পৃথক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়েই কমিশন ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের নেতারা ৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের সংলাপের কথা জানিয়ে তার ফল বিবেচনায় নিতে বলেছেন। কমিশন ৮ নভেম্বর আবারও বৈঠকে বসবে। ওই বৈঠকের সিদ্ধান্তে সংলাপের প্রতিফলন থাকবে।
ইসি সচিব বলেন, সেনা মোতায়েনের বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে তফসিলের পর এ নিয়ে আলোচনা হবে। ঐক্যফ্রন্ট ইভিএম ব্যবহার না করার প্রস্তাব দিলেও ইসির পক্ষ থেকে সীমিত পরিসরে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বৈঠক সূত্র জানায়, ইসি ও রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের আস্থা আছে কি-নেই এ নিয়েই দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। তবে বৈঠকের পরে ইসি সচিবকে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের নেতাদের গলার আওয়াজ একটু চড়া হয়। এটা উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় নয়।
তফসিল পেছানোর দাবিতে এর আগেও একবার ইসিতে চিঠি দিয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। তবে ওই চিঠি আমলে না নিয়েই রোববার কমিশন সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় আগামী ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করা হবে।
সূত্র জানায়, বৈঠকে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। জবাবে ঐক্যফ্রণ্টের অন্যতম নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, মেশিনে কারসাজি করা যাবে না-এটা বিশ্বাস করতে বলছেন?
জবাবে সিইসি একটু উচ্চস্বরে বলে ওঠেন- আপনারা বড় বড় কথা বলেন, রাজনৈতিক দল ও তার নেতারাই একে অপরকে বিশ্বাস করে না। রাজনৈতিক দলের ওপরেই তো জনগণের আস্থা নেই।
এক পর্যায়ে সিইসি’র উদ্দেশ্যে মান্না বলেন, নির্বাচন কমিশনের প্রতি কোনো অনাস্থার কথা বলতে তারা এখানে আসেননি। তবে এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা নেই।
ঐক্যফ্রন্টের প্রতিনিধি দলের আরেক সদস্য সুলতান মনসুর বলেন, সদ্য সমাপ্ত সিটি নির্বাচনে দেখা গেছে এক দলের নেতাকে আরেক জেলার জেলে নিয়ে রাখা হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না।
তিনি ইসিকে সতর্ক করে বলেন, ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর করা যাবে না। সেই চেষ্টা করে কোন ফলও পাওয়া যাবে না।
বৈঠক সূত্র জানায়, আ স ম রব নির্বাচনে ম্যাজিষ্ট্রেসি ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েনের দাবি জানান। তিনি বলেন, সেনা মোতায়েন হলে মানুষ নির্ভয়ে ভোট কেন্দ্রে আসার সুযোগ পাবে।
জবাবে কমিশনার শাহাদত হোসেন চৌধুরী বলেন, সেনাবাহিনীকে বিচারিক ক্ষমতা দেওয়া অসাংবিধানিক। তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে সেনা মোতায়েন বিষয়ে কমিশনে কোনো আলোচনা হয়নি। তবে অতীতের নির্বাচনগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে।
এদিকে সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতিও তফসিল পেছানোর দাবি জানিয়ে একটি চিঠি নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছে। এতে স্বাক্ষর করেছেন সমিতির সভাপতি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন।
সূত্র : সমকাল