ঐশ্বর্য মহীয়ান/ মৃত্যুর কোলে বসে হেসেছেন পুষ্পের হাসি

সারাহ ইসলাম ঐশ্বর্য। মাত্র ২০ বছরের এক তরুণী। স্কেলেরোসিস নামের এক জটিল রোগে ভোগছিলেন তিনি। এই রোগ থেকে পরিত্রাণের কোনো চিকিৎসাপদ্ধতিই আবিষ্কার করতে পারেনি পৃথিবীর চিকিৎসাবিজ্ঞান। মৃত্যু অবধারিতই ছিলো। নিজের দুরারোগ্য অসুখের কথা বহু আগে থেকেই জানতেন ঐশ্বর্য। এজন্য কোনো আক্ষেপ ছিলো না তাঁর। বরং যতদিন জীবন ছিলো সচল ততদিন সকলের ভালোর জন্য কাজ করে গেছেন অবিশ্রাম অবিরাম। নিরাপদ সড়ক, নারী নিরাপত্তা প্রভৃতি ইস্যুতে তিনি সবসময় সামনের কাতারে থেকে উচ্চকণ্ঠ থাকতেন। অসুখের কারণে তিনি সবসময় রক্তস্বল্পতায় ভোগতেন। কিন্তু সবার আগে ছুটে যেতেন কারও রক্তের প্রয়োজন হলে। ঐশ্বর্য নিজের মৃত্যু বিষয়ে স্থির নিশ্চিত হওয়ার পর এমন এক মানবিক সিদ্ধান্ত তাঁর মাকে জানিয়েছিলেন যা আজ বিশ্বমানবতার ইতিহাসে মহান কীর্তি হিসাবে স্থান করে নিয়েছে। নিজের প্রতিস্থাপনযোগ্য অঙ্গগুলো আর্ত-পীড়িতদের দান করে যাওয়ার সেই ইচ্ছার কথা জানিয়ে রেখেছিলেন প্রাণপ্রিয় জননীকে। তিন দিন আগে শারীরিক সংকটাপন্ন অবস্থায় ঐশ্বর্যকে ভর্তি করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি তখন ক্লিনিক্যালি ডেড ছিলেন। ডাক্তাররা বুঝতে পারেন তাঁর বাঁচার কোনো সম্ভাবনা নেই। তখন ডাক্তাররা রোগীর স্বজনদের কাউন্সেলিং করা শুরু করেন। ঐশ্বর্যের মা মেয়ের প্রতিশ্রুতি রাখতে অঙ্গ দানে সম্মত হন। পরে ঐশ্বর্যের শরীর থেকে দুইটি কিডনি ও দুইটি কর্ণিয়া অপসারণ করে অপর চার ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। এই হলো ঐশ্বর্যের গল্প। যে গল্প দেশ ছাপিয়ে পুরো পৃথিবীর ইতিহাসে মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ধন্য মেয়ে তুমি ঐশ্বর্য। সত্যিই নামের মাহাত্ম্য রেখেছো তুমি। শুধু নামেই নও মহত্বেও ঐশ্বর্যবান তুমি। আমাদের অন্তহীন শ্রদ্ধা তোমাকে।
ঐশ্বর্যের এক জীবনের বিনিময়ে চার চারটি প্রাণ নতুনভাবে বাঁচার উপলক্ষ খুঁজে পেলো। আমাদের দেশে অঙ্গ দান, চক্ষু দান, দেহ দান প্রভৃতি মহত্তর কর্মকা-ের ব্যাপকতা বাড়েনি। মানুষ মরে গেলেও তাঁর নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ বেশ কয়েক ঘণ্টা জীবন্ত থাকে। সেগুলো দান করলে বহু লোকের জীবন রক্ষা পায়। কিন্তু প্রচ- সামাজিক পশ্চাদপদ চিন্তা-চেতনার কারণে অপরের দেহে নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার মানবিক মহত্ত্ব দেখানোর দৃষ্টান্ত আমরা খুব কমই দেখি। ঐশ্বর্য আমাদের পথ দেখিয়ে গেলো। নিশ্চয়ই অনুপম এই দৃৃষ্টান্ত কূপম-ুক মানবগোষ্ঠীর অন্ধ চোখের দৃষ্টিকে স্বচ্ছ করে তুলতে ভূমিকা রাখবে। ঐশ্বর্যের দুই কিডনি সফলভাবে প্রতিস্থাপিত হয়েছে ৩৪ বছর বয়সী শামীমা আহমেদ ও ৩৯ বছর বয়সী আরেক নারীর শরীরে। তাঁর দুই কর্ণিয়া প্রতিস্থাপিত হয়েছে ২৩ বছর বয়সী সুজন ও ২৫ বছর বয়সী ফেরদৌস আক্তারের চোখে। ঐশ্বর্যের কিডনি ও চোখে তারা বাকি জীবন পৃথিবীর রূপ-রস-লাবণ্য উপভোগ করবেন। তাঁরাও ভাগ্যবান এক উদারমনা মানবিক ঐশ্বর্যের অঙ্গ ধারণ করে। তাঁদেরও দায়িত্ব ঐশ্বর্যের উদারতাকে দশদিকে ছড়িয়ে দেয়ার।
আমাদের দেশ সহ পৃথিকীর বহু জায়গায় অবৈধভাবে কিডনি বেচা-কেনা হয়। এক একটি কিডনি ৭ থেকে ২০ লাখ টাকায় পর্যন্ত কিনতে হয় বলে জানা যায়। অথচ অঙ্গ দানের সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করা গেলে সহজেই বহু মানুষ স্বল্প খরচে সেগুলো প্রতিস্থাপনের সুযোগ পেতেন। আমাদের দেশে দুর্ঘটনায় বহু লোক প্রাণ হারান। বহু লোক আরও নানাবিধ জটিল রোগে ক্লিনিক্যালি মৃত অবস্থায় পতিত হন। এরকম রোগীদের কিডনি সাধারণত মৃত্যুর ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। এই ধরনের রোগীদের অঙ্গদানে উৎসাহিত করতে দরকার ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন।
কোনো প্রশংসাবচনই ঐশ্বর্যের জন্য যথেষ্ট নয়। আমরা কেবল অনুপ্রেরণা খোঁজব তাঁর অবিনাশী সত্তার মধ্যে। চাইব তাঁর এই উদারতা আলোর ঝর্ণাধারার মতো ছড়িয়ে পড়–ক দশদিগন্তে। মরেও অমর হওয়া মৃত্যুঞ্জয়ী ঐশ্বর্যের শোকাহত পরিবারবর্গের জন্য আমাদের গভীর সমবেদনা।