কবিতা- হিরালী

মোহাম্মদ সাদিক
সাজ্জাদ শরিফ প্রিয়বরেষু
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী
হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী
                           চর্যাপদ
[আকাশে কালো মেঘ করেছে। সমস্ত হাওড়ে প্রায় পাকা ধান। মেঘের ডাক শুনে বোঝা যায় শিলাবৃষ্টি নামবে। হাওড়-তীরের ছেলে-বুড়োর চোখে অপরিসীম শঙ্কা ও ভয়। শিলার হাত থেকে ফসল বাঁচানোর জন্য সবাই হিরালীকে ডেকে আনে। তাঁদের বিশ্বাস, হিরালী মন্ত্র পড়ে এই ঝড় ও শিলাবৃষ্টির গতিপথ বদলে দিতে পারে। হাঁক দিয়ে হিরালী হাওড়ের বুক বরাবর ছুটে যায়। বিবস্ত্র নগ্ন। মন্ত্র পড়ছে সে।]

মন্ত্র পড়ো আজ মন্ত্র দাও।
ওড়াও দুই হাতে লালচে গামছার তুমুল নাচ
হিরালী হুংকারে তোমার অবিনাশী দোহাই পাড়ো
এই যে শিলা, এই তীব্র বৃষ্টি ও সর্বনাশ
                                      ফেরাও তুমি।
হাওরে আমাদের মায়াবী ধান
বিনীত ফলবতী লজ্জা তার
                 ফেলছে ছিঁড়ে আজ, এ কোন প্রেত।
আকাশ থেকে ছুঁড়ে পাথুরে বান
                                                  ফেরাও বান।

হিরালী, যুদ্ধের মন্ত্র পড়ো আজ মন্ত্র দাও
বিরুন-শিরনিতে বিলাব সুখ
কুলায় তুলে দেব ফুলের সাঁজি
সাজানো শাপলার পূর্ণ কোলাহল তোমাকে দেব
তোমার বাণী ফের শানিত করো
তুমুল তুফানের গভীর গর্জনে কাঁপছে দিন!
তোমার সাহসের শক্ত লাঠিÑ
গভীর বিশ্বাসে ভাঙুক বাতাসের তুখোড় ডানা
নতুন নি:শ্বাসে জিকির জাগানিয়া জাগাও তুমিÑ
                                মন্ত্র পড়ো আজ মন্ত্র দাও।

আশার মতো এই বোশেখি মাঠ আর মহান ঋতু
সবার আকাক্সক্ষা প্রাণের প্রতিবেশী ছুঁয়েছে শিলা
মাথায় ও মগজে কঠিন আঘাতের শীতল দাগ
আকাশ-কালো মেঘ, দু:খী মানুষের ভাঙছে বুক
হিরালী, হুংকারে থামাও আজ
পাষাণ মেলা!

বোনের প্রিয় সেই হাসির মতো
শোভন সময়ের সোনালী শিষ
মুখর আবাবিল মেঘের হাতে
ঝরছে অসহায়, মুর্ছা স্লান!

হিরালী, দেখো ওই ডাকছে মেঘ!
তাড়াও তাকে!

নতুন পোশাকের নতুন রঙে
হিরালী, তোমাকেও সাজাব ফের
উঠোন আঁকা হবে নতুন আলপনা, জ্বালব রাতে সেই
                                                      মোহন বাতি

বাছাই বীজধান তোমাকে দেব
গাভী ও মোরগের নিখুঁত জোড়া
হিরালী, হুংকারে বৃষ্টি ও বিনাশ থামাও শুধু
থামাও আজ এই পাষাণ খেলা!

[তবু ঝড় আসে। নিষ্ঠুরতম শিলাবৃষ্টি হয়। সমস্ত হাওড়ের প্রায়-পাকা ধান ঝড়ে যায়। বিবর্ণ হাওর ধর্ষিতা নারীর মতো পড়ে থাকে। রাত নামে, গাঢ় কালো রাত। হাওড়ের তীরে কারো ঘরে বাতি জ্বলে না।]