কমছে শ্রীনাথপুরের টিয়া

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ শহর থেকে মাত্র ৪ কিলোমিটার দূরের দেখার হাওরপাড়ের গ্রাম শ্রীনাথপুরের মোকাম বাড়িতে বিকেল ৫ টার পর গেলে মন জুড়িয়ে যাবে। ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকা টিয়ে পাখির কলকাকলি ওখানে গেলে যে কাউকে মুগ্ধ করে দেবে। মানুষের প্রিয় পাখিদের অন্যতম প্রজাতির এই পাখি শ্রীনাথপুরের মোকামবাড়ি’র দুটি শিমুলগাছে অন্তত. একশ’ এখনো আছে।
যে কয়েক জাতের পাখি মানুষের মতো কথা বলতে পারে, তাদের মধ্যে টিয়া পাখি অন্যতম। গ্রামবাসী ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পাখি দলের কদর করে আসছেন। গ্রামবাসী কদর করলেও পাখির সংখ্যা বাড়ছে না। ৫ বছর আগে দুই শিমুল গাছে কয়েক’শ টিয়া পাখি কিছির-মিছির করতো। এখন এই সংখ্যা একশ’এর বেশি নেই।
গ্রামের মাস্টার্স পড়–য়া অর্থনীতির ছাত্র জাকির হোসেন বললেন, গ্রামের মানুষ মন দিয়ে হৃদয় দিয়ে যুগ যুগ ধরেই লালন করছেন টিয়া পাখির দলকে। একসময় ঝাকে ঝাকে আসতো টিয়া পাখির দল। এখন কমে গেছে। পাখি কমে যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীকে দোষা যাবে না। দুয়েকজন শখের বসে সম্প্রতি কোনভাবে গাছে ওঠে, টিয়া পাখির বাচ্চা লালন পালনের জন্য ধরে আনলেও অন্যরা তাতে বাধা দেন। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠরা বুঝিয়ে দেন, যে বাচ্চা পাখিগুলো নিয়ে আসলে, মা পাখি বিরক্ত হবে, আঘাত পাবে, ভয় পাবে এবং এই এলাকা ছেড়ে চলে যাবে।’
শ্রীনাথপুরের দুই শিমুল গাছে সবুজ টিয়া ছাড়া অন্য কোন রংয়ের টিয়া পাখি নেই।
স্থানীয়রা জানালেন, সবুজ টিয়া কলাপাতা-সবুজ রঙের সুদর্শন পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ৪২ সেন্টিমিটার, ওজন ১২০ থেকে ১৩০ গ্রাম । সামান্য কিছু পালক ছাড়া পুরো দেহই সবুজ। ঠোঁট লাল, নিচের দিকে বড়শির মতো বাঁকানো। চোখ হলদে-সাদা। ছেলেপাখি ও মেয়েপাখির গলায় ভিন্ন রঙের দাগ আছে। ছেলেপাখির থুতনিতে কালো রেখা, গলা ও ঘাড়ের পেছনে গোলাপি পাটল বর্ণ। মেয়েপাখির ঘাড় পান্না সবুজে ঘেরা।
গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সফর আলী দাবি করলেন, সুনামগঞ্জের অন্য কোথাও এতো টিয়া পাখি নেই। ২০০ বছরেরও বেশি বয়সের প্রকা- শিমুল গাছ থাকায় নরম গাছের কা-ে এবং ডালে ডালে টিয়া পাখি তাদের বাসস্থান সহজেই করতে পারছে।
তিনি জানালেন, তিনি যখন শিশু ছিলেন, তখন থেকেই দেখে আসছেন এই দুই গাছে শত শত টিয়া পাখির বসবাস। তাঁর বাবাও গাছে টিয়া পাখি দেখিয়ে গল্প করেছেন এই গাছগুলোতে এক সময় আরো বেশি টিয়া পাখি আসতো। গ্রামের কেউ টিয়া পাখিকে আগেও হয়রানি করতো না, এখনো করে না। অগ্রহায়ণ মাসে ধানের জমিতে টিয়া পাখির দল আহার খেতে গেলেও কেউ হয়রানি করে না। বোরো মৌসুমে জমিতে টিয়া পাখি দেখা যায় না। ওই মৌসুমে ফলের গাছে- গাছে ফল খেয়ে ঘুরে বেড়ায় টিয়া পাখির দল।’
গ্রামের সামছুদ্দিন মিয়া, মখছুদ আলী, রফিকুল মিয়া ও এনাম মাস্টার টিয়া পাখি খাঁচায় পুষেন। টিয়া পাখির ছানাগুলো নিজে নিজে খেতে শেখার পর এঁরা অতিকষ্টে গাছে ওঠে নিয়ে এসেছেন এবং ¯েœহ মমতা দিয়ে বড় করেছেন। প্রত্যেকের বাড়িতেই পিঞ্জিরায় ৪-৫ টি করে টিয়া পাখি আছে।
গ্রামের সামছুদ্দিন বলেন,‘ মানুষের মতো কথা বলতে পারে, দেখতে সুন্দর, এজন্য শখের বসে পাখিগুলো অনেক কষ্টে এনেছি। পাখির বাসায় যখন দেখেছি ছানাগুলো মাঝে মাঝে মুখ বের করে, তখনই বুঝা যায়, ওরা নিজেরা খেতে শিখেছে। এরপর রশি দিয়ে কোনভাবে ওঠে কয়েকবার পাখির ছানা এনেছি। বড় হলে আত্মীয়-স্বজনরা নিয়ে যান। এবার যে ৫ টি ছানা বড় করেছি, আমার এক আত্মীয় নিয়ে যেতে চেয়েছিল, আমি বলেছি, আরো বড় না হলে পাখির ছানা নিয়ে তারা বাঁচাতে পারবে না।
সামুছুদ্দিন মিয়া জানালেন, পাখি অসুস্থ হলে পশু হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসাও করান তারা।
গ্রামের এক তরুণ জানালেন যারা টিয়া পাখি পুষে, তাদের কেউ কেউ গোপনে মাঝে মধ্যে টিয়া পাখি বিক্রিও করে।
গ্রামের ইউপি সদস্য মঈনুদ্দিন বলেন, দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী দুটি শিমুল গাছে শতাধিক টিয়া পাখি এখনো বসবাস করে। গ্রামের সকলেই এই পাখিদের আপন জনের মতোই লালন করেন। যারা পাখির ছানা ধরে ¯েœহ মমতা দিয়ে পুষেন, তাদেরকে আমরা নিষেধ করবো পাখি এনে বদ্ধ খাচায় আবদ্ধ না করার জন্য। পাখির ছানা বাসা থেকে ধওে আনলে মা পাখি ভীত, সন্ত্রস্ত, অসহায় হয়ে এই গ্রাম ছেড়ে দেবে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসমিন রুমা বলেন, শ্রীনাথপুরে দুটি শিমুল গাছে এতো টিয়া পাখির বাস, আমি জানতাম না, খোঁজ নিয়ে গ্রামবাসী যাতে স্বযতনে বিলুপ্ত প্রজাতির এই পাখি লালন করেন, সেই ব্যবস্থা করবো।