কমরেড বরুণ রায়- প্রেরণা ও সাহসের নাম

খলিল রহমান
‘অতি সাধারণ চেহারা এবং হালকা, দুর্বল স্বাস্থ্যের সহজ-সরল মানুষটি আমাকে মুহূর্তেই আপন করে নিলেন। তাঁর সাথে আলাপ করে বুঝলাম বিপ্লবী জীবনের জন্য গায়ের জোর বা মোটা স্বাস্থ্য জরুরি নয়। যা প্রয়োজন তা হলো মনের জোর, লক্ষ্য, জনগণ ও দেশের প্রতি অঙ্গীকার, নৈতিক মনোবল, নিষ্ঠা, সততা এবং লক্ষ্য অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার ও সংগ্রামের দৃঢ়তা। এই সব গুণাবলীর জন্য তিনি একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সকল মানুষের শ্রদ্ধা অর্জন করতে পেরেছিলেন।’ কথাগুলো একটি বইয়ের পাতা থেকে নেওয়া। লিখেছেন নুরুল ইসলাম নাহিদ। যিনি বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী। আর যাঁর সঙ্গে প্রথম দেখার এই অনুভূতি সেই ‘তিনি’ হলেন আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মানুষ প্রসূন কান্তি রায়। দেশের মানুষ তাঁকে চেনেন কমরেড বরুণ রায় হিসেবে।
কমরেড বরুণ রায়। ভাটি-বাংলার প্রবাদ পুরুষ। একজন অসাম্প্রদায়িক ও আলোকিত মানুষ। প্রগতি আর সাহসিকতার দীপশিখা হাতে তিনি শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছেন জীবনভর। ত্যাগের রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন কিংবদন্তির নায়ক। সাম্যবাদ, মনুষ্যত্ব, বাঙালি জাতিসত্ত্বা, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক মুক্তিই ছিল তাঁর স্বপ্ন-সংগ্রামের আদর্শ। তাই বিপ্লবী বরুণ রায় আছেন জনতার-শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অলিন্দে।
বরুণ রায় তাঁর জীবন-যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময় উৎসর্গ করেছেন দেশ ও মানুষের কল্যাণে। তাঁর রাজনীতি, দর্শন সবই ছিল খেটেখাওয়া মানুষের জন্য। মানুষের মুক্তির জন্য। মানুষকে ভালোবেসে, মানুষের মুক্তির জন্য যুদ্ধে নেমে সারা জীবন যেন যুদ্ধেই কেটেছে তাঁর। মুক্তির যাত্রাপথে তিনি পেয়েছেন জেল, জলুম, হুলিয়া, আত্মগোপন আর নিরন্তর এক অন্তরীণ জীবন। যে জীবনের ১৪টি বছর কেটেছে নির্জন কারাবাসে।
১৯২২ সালের ১০ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন এই বিপ্লবী। তাঁর পিতামহ রায় বাহাদুর কৈলাশচন্দ্র রায় ছিলেন ভারতের বিহার রাজ্যের শিক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন বরুণ রায়। তাঁর শৈশব কেটেছে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলি গ্রামে ও ভারতের শিলংয়ে। বরুণ রায়ের পিতা করুনাসিন্ধু রায় ছিলেন রাজনীতিবিদ, এম এল এ। ইচ্ছে করলে বরুণ রায় আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু আরাম-আয়েশ আর জমিদারি তাঁকে টানেনি। তিনি মিশে গেছেন সাধারণের মাঝে। জীবনভর তিনি তাঁদের কাতারে থেকে, তাঁদের মুক্তির জন্যই লড়াই করে গেছেন। সুনামগঞ্জের হাওরের জল-মাটি আর মানুষের কাছে তিনি যেন মানুষের চেয়েও ছিলেন বেশি কিছু। সিক্ত হয়েছেন তাঁদের সীমাহীন শ্রদ্ধা-ভালোবাসায়। তাঁর ‘ভাসান পানির’ আন্দোলন এখনো হাওরের জলে ঢেউ হয়ে জেলে-কৃষকের রক্তে শিহরণ জাগায়।
ব্রিটিশ, পাকিস্তান আর বাংলাদেশ-এই তিন পতাকাতলেই কেটেছে তাঁর রাজনৈতিক জীবন। পিতৃসূত্রে তিনি পেয়েছেন রাজনৈতিক জীবনের উত্তরাধিকার। সুতরাং জেল জুলুম সহ্য করার মানসিকতা নিয়েই তিনি বেড়ে ওঠেছিলেন। বরুণ রায়ের পিতা করুনাসিন্ধু রায় সামন্ত পরিবারে জন্ম নিলেও, বেছে নিয়েছিলেন কৃষক প্রজার পক্ষের রাজনীতি। তিনি আসাম পরিষদের এম এল এ ছিলেন।
ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসাবে বরুণ রায় কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৪২ সালের মাত্র ২০ বছর বয়সে পার্টির সদস্য লাভ করেন। এ বছরই স্বাধীনতা দিবস পালন করার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়। আবার গ্রেপ্তার হন ১৯৪৯ সালে। এ সময় একটানা ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি জেলে ছিলেন। এরপর মুক্তি পেলেও রাখা হয় নজরবন্দি করে। এর কিছু দিন পরে আবার তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৫৮ সালে যখন আইয়ুব খান সামরিক ফরমান জারি করেন তখন তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। আরও পাঁচ বছর তিনি কারাবরণ করেন। ১৯৬৮-৬৯ সালে গণ-আন্দোলনের সময় তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা থেকে বিরত থাকেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং নেতৃত্ব দেন। ১৯৮০ সালে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৮৬ সালে তিনি সুনামগঞ্জ-১ আসন থেকে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করেন। এর আগে তিনি ১৯৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদেও নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠানো হয়।
৯০’র পর থেকে বরুণ রায় আর রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন না। তবুও দেশ, দেশের মানুষ, দেশের রাজনীতি তাঁর চিন্তা-চেতনায় ছিল সক্রিয়। বলতেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই গর্ব ও অহংকারের ধন নিয়ে আমরা বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারি। আমরা লড়াই করে মানচিত্র, পতাকা আর জাতীয় সংগীত অর্জন করেছি। বাংলাদেশ সা¤প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। মুক্তিযদ্ধের চেতনা থেকে আমাদের কেউ সরাতে পারবে না। সরানোর শক্তি নেই।
এই শক্তি-সাহস যুগ যুগ ধরে প্রেরণা জোগাবে নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। বরুণ রায় এই মাটির সন্তান। বলতেন, মৃত্যুর পর যেন এই মাটির তিলক এঁেক দেওয়া হয় তাঁর কপালে। মাটির তিলক-চিহ্ন কপালে নিয়েই ২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর বিদায় নিয়েছিলেন তিনি। বিপ্লবী বরুণ রায়ের অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।
লেখক: সাংবাদিক ও  ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কর্মী।



আরো খবর