কমরেড লালমোহন রায়ের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

ধর্মপাশা প্রতিনিধি
অন্যায়, খাজনা প্রথা আর রাজা-জমিদারদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কৃষক সমাজকে সংগঠিত করেছেন তিনি। নানকার বিদ্রোহ, টংক আন্দোলন, হুল, উলগুলান, তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে কৃষকদের সম্মিলিত সংগ্রাম সমূহ বাংলার কৃষির ভিতকে মজবুত করেছে। জমিদারী আমলের অন্যায় নানকার প্রথার বিরুদ্ধে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের কৃষক আন্দোলন তেমনি এক ঐতিহাসিক অধ্যায়। আজ রবিবার নানকার বিদ্রোহের সেই কৃষকনেতা কমরেড লালমোহন রায়ের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের ৩ জুন ১০৪ বছর বয়সে তিনি পরলোকগমন করেন। লালমোহন রায় মধ্যনগর থানার ইটাউড়িতেই ১৯১২ সালের ১ মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বাবা প্যারিমোহন রায় ও মাতা হেমলতা রায়। তাঁদের মূল বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি জড়িয়ে পড়েন কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে। নানকার বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক কমরেড অজয় ভট্টাচার্যের সাহচর্যে কৈশোরেই যোগ দেন নানকার কৃষক আন্দোলনে।
লাউতা-বাহাদুরপুর জমিদারের অন্যায় খাজনা প্রথার বিরুদ্ধে তার সাহসী পদক্ষেপ কালের স্বাক্ষী।
১৯৩২ সালে সিলেটে ‘তরুণ সংঘ’ ও ‘ওয়েলফেয়ার সংঘ’ নামে দুটি বিপ্লবী দল গড়ে উঠেছিল। এদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তখন লাইব্রেরী গড়ে উঠেছিল। হবিগঞ্জ জেলার বিরাট অঞ্চলের (আজমিরিগঞ্জ) ‘তরুণ সংঘে’র লাইব্রেরীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন লালমোহন রায়। ব্রিটিশ বিরোধী কার্যক্রমে জড়িত হওয়ার কারণে প্রথমদিকে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে দিয়ে তিনি আত্মগোপন করেন।
মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার সানেশ্বর-দাসেরবাজার কৃষক আন্দোলনের অন্যতম নেতাও ছিলেন তিনি। ১৯৩৭-৩৮ সালে দাসেরবাজার অঞ্চলে গিয়ে তরণ বয়সে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন। তৎকালীন কৃষকনেতা করুণাসিন্ধু রায়, দীনেশ চৌধুরী, লালা শরদিন্দু দে, রোহিণী দাস, পূর্ণেন্দু কিশোর সেন, অবলাকান্ত গুপ্ত প্রমুখ ত্যাগী ব্রতীদের নির্দেশনায় তিনি ঘর বাড়ি ছেড়ে সানেশ্বর-দাসেরবাজার অঞ্চলে ছদ্মবেশে প্রায় দুই দশক কাজ করেন। দীর্ঘ দিন গণসংযোগ করে সেই অঞ্চলের ছাপ্পান্ন মৌজার কৃষক নিয়ে একটি ‘কৃষক সমিতি’ গঠন করেন। ১৯৩৮ সালে ঐতিহাসিক শিলং অভিযাত্রী ঐতিহাসিক মিছিলের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এই বিপ্লবী। তখন প্রায় ৮০ মাইল পায়ে হেঁটে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে শিলং পার্লামেন্ট ঘেরাও করা হয়েছিল। এরপর তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। পরে ‘বাছিত ভাই’ ছদ্মনামে সিলেটের দক্ষিণাঞ্চলে কাজ করেন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার কাজেও তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ওয়ারেঙ্কা ক্যাম্পে শরণার্থী শিবিরের বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিভাগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন এবং যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে উৎসাহ প্রদান করেন। দেশ স্বাধীনের পর গড়ে তুলেন হাওরাঞ্চলে ভাসান পানি আন্দোলন। সব সময়ই তাঁর অবস্থান ছিল মেহনতি গ্রাম-বাংলার কৃষকের পক্ষে। স্বপ্ন দেখতেন কৃষকের জন্য সুদিন আসবে। সকল শৃংখল থেকে মুক্ত হবে দেশের কৃষক সমাজ।