কম্পোজিশন : ভাবনা ও অপর ভাবনা

মোস্তাক আহমাদ দীন

‘চা-বাগানের জঙ্গলা পথে যাচ্ছে তারা
খোঁপায় গুঁজে রাত্রিটাওে বনের পথে
সন্ধ্যা আসে।

চা-বাগানের জঙ্গলা পথে যাচ্ছে তারা
নক্সীকাঁথা রেখে আসে শিরীষতলায়
কান্না ভাসে।

চা-বাগানের জঙ্গলা পথে শ্রমিক নারী
দ্যাখল পথে কাঁথাঢাকা সদ্যজাত
মানবশিশু
তুলল কোলে

চা-বাগানের জঙ্গলা পথে এক মায়ের
মনে ভয়াল স্মৃতি
উঠল দুলে’

নৃপেন্দ্রলাল দাশের নির্বাচিত কবিতা কাব্যগ্রন্থে নানা ধরনের কবিতা রয়েছে, তবু যতবারই বইটি হাতে নিই, চোখ আটকে যায় ‘কম্পোজিশন’ কবিতায়। এমনিতে চার স্তবকের এই কবিতাটিতে যে নিটোল চিত্রসংগতি আছে তা নয়, কম্পোজিশনে সবসময় যে সেরকমটি থাকতে হয় তা-ও নয়, গজলও যে ভিন্ন ভিন্ন ফুলে গাঁথা মালা, তাতেও তো মন-ভঞ্জন কম হয় না, তাই, কী নেই তা রেখে, যা আছে, বরং সেই গল্পটাই বলি। ‘কম্পোজিশন’ শিরোনামক এই কবিতায় একটি গল্প আছে, এবং নির্দিষ্ট তথ্যমারফত বুঝতে পারছি, সেই গল্পের মধ্যকার ঘটনা কোনো বিশেষ সময়ে বাঁধা নয়, অর্থাৎ তথ্য নির্দিষ্ট, তবে ঘটনা কি দুর্ঘটনার সময়বৃত্ত অনির্দিষ্টÑবলার অপেক্ষা রাখে না, আমার আগ্রহের অন্যতম কারণ সেটি। আগ্রহের আরেক কারণÑযা পূর্বেই উল্লেখ করেছিÑচিত্রগত অসংগতি, তা দোষের না গুণের সেটা ভিন্ন প্রশ্ন, কিন্তু কৌতূহল-উদ্রেককর; তবে, ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখব, দ্বিতীয় স্তবক থেকে চতুর্থ ও শেষ স্তবক পর্যন্ত যে-কাহিনিক্রম, তা প্রশংসাযোগ্য।
দ্বিতীয় স্তবক থেকে শেষ স্তবক পর্যন্ত যে-গল্প, তাতে একটি যাত্রার বর্ণনা আছে এবং আছে [সব স্তবকেই] ধুয়াপদপ্রতিম একটি বাক্যও : ‘জঙ্গলা পথে যাচ্ছে তারা’। এই যে যাত্রা, তা কোন সময়কার ঘটনা? কবি স্বচক্ষে দেখেছেন, কল্পনায় দেখতে পারেন অপরচক্ষেও দুটোই হতে পারে, কিন্তু কোন সময়ের দেখা তা নির্দিষ্ট নয়; হতে পারে সাতচল্লিশের, একাত্তরের, হতে পারে [আগে লিখিত হলে কী হবে] হালের রোহিঙ্গা-যাত্রাওÑজংলা পথে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে তারা, যাওয়ার পথে বাঁচাতে পারবে না বলে সদ্যজাত শিশুটিকে ফেলে যেতে বাধ্য হচ্ছে, এরকম কত ঘটনাই তো ঘটেছে এ-দেশে [এবং ঘটে চলেছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও। মানবশিশুটিকে যে নক্সীকাঁথায় মুড়ে শিরীষতলায় নিরুপায় হয়ে রেখে আসতে হচ্ছে তার প্রমাণ দ্বিতীয় স্তবকের তৃতীয় পঙ্ক্তি : ‘কান্না ভাসে।’
তৃতীয় স্তবকে পৌঁছে লক্ষ করছি সেই কাঁথাঢাকা শিশুটিকে কোলে তুলে নিল এক শ্রমিক নারী, তখন বোঝা যায় শিশুটির একটা সদ্গতি না হোক, গতি অন্তত হলো যারা ফেলে রেখে গেছে তারা নিশ্চয়ই এরকম কিছু একটা আশা করেছিল, আন্দাজ করেছিল, এরকম কিছু একটা ঘটবে।
চতুর্থ অর্থাৎ শেষ স্তবকে পৌঁছে দেখা যায় গল্পের সমাপ্তির জায়গাটি, আরও স্পষ্ট করে বললে, বক্তব্যটি রহস্যময় হয়ে ওঠেÑঠিক বোঝা যায় না চা-বাগানের জংলা পথে কোন মায়ের মনে ভয়াল স্মৃতি ভেসে উঠল। যে ফেলে রেখে গেছে সেই মা? সেটা কোন সময়ের স্মৃতি? নিশ্চয়ই ফেলে-রেখে-যাওয়া সময়ের অনেক পরের স্মৃতি, যা তার কাছে এক নিরুপায় কর্ম-পরিণাম, এবং ভয়াল; নিশ্চয়ই এ-স্মৃতি মনে না-করতে-চাওয়া এক দুঃসহ স্মৃতি, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হারানো সন্তানের জন্য এতদিনকার জমে-ওঠা বেদনাও।
এই মা হতে পারেন না ‘শ্রমিক’ নারীটি, সে তো পথে-পাওয়া শিশুটির উদ্ধারকর্ত্রীমাত্র, সন্তান ফেলে-রেখে-যাওয়া মা-ই হলো কবিতার এই মা। আর তাও যদি কোনো কারণে না-ভেবে থাকেন কবি, তাহলে ধরে নিতে হবে, এখানে রয়েছে এক চিরকালের মায়ের মূর্তি, যে-মায়ের কাছে এই সব অপ্রত্যাশিত ও অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা চিরকালই ভয়াল।
চার স্তবকের এই কবিতাটি আমাকে যখন এই সবকিছু বিষয়ে ভাবাচ্ছে, তখন প্রথম স্তবকটির বহুবচনী সর্বনামের কারণে আরেকটি সুতানালি চিন্তাও ফাঁক পেয়ে এসে মনে ঢুকে পড়েছেÑসেটি হলো লোকরটনাভীত প্রেমিক-প্রেমিকার কল্পনা, যারা কোনো-এক সময় আপাত-অপ্রত্যাশিত পরিণামকে ফেলে রেখে গিয়েছিল। আন্দাজ করি, কবি এরকমটিও ভেবে থাকতে পারেন, না-ভাবলেও স্তবকের বাক্য, তার শব্দ ও আবহ সেরকম এক চোরা ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং তাতে ধরা পড়েছে সমাজের প্রথাদীর্ণ চেহারাটিও :

‘চা-বাগানের জঙ্গলা পথে যাচ্ছে তারা
খোঁপায় গুঁজে রাত্রিটারে বনের পথে
সন্ধ্যা আসে।’

আপাতত রটনা পরিণাম প্রভৃতি মাথায় না রেখে কবিতার প্রথম স্তবকটিকে পরবর্তী তিনটি স্তবক থেকে নিঃসঙ্গ করে নিয়ে একবার পড়লে বোঝা যায়, কোনো-এক গোধূলিলগনে জংলা পথে বেড়াতে গেছে যেন প্রেমিক-প্রেমিকা; এরপর সন্ধ্যা নেমে এলে রাত্রিটাকে ‘গোধূলিমদির’ মেয়েটির খোঁপায় গুঁজে দিয়ে মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে তুলছে কোনো যুবক।
কিন্তু হায়, কে না জানে, আমাদের বদ্ধ, প্রথাদীর্ণ সমাজে এর পরিণতি কী ভয়ঙ্কর, এই পরিণামকে আবার এক হরদর লেখক ‘কলঙ্কিত ফুল’ বলে সম্বোধন করেছেন, মন্দ বলেননি, নক্সীকাঁথা-মোড়ানো এই পরিণাম তো কলক্সিক্ষতই, পরবর্তী স্তবকের বয়ানও তার দৃষ্টান্ত।
এই সবকিছুই যদি শেষপর্যন্ত দূর-ভাবনা হয়, তাহলে বহু বহু শরৎকাল পার হয়ে-আসা কবির ঠোঁট নিশ্চয়ই মুচকি হাসিতে কিছুটা নড়ে উঠবে, তা হলেও, তার বহু কম শরৎকাল-কাটানো এই প্রতিব্যথীর মনটা খুশিতে ভরে উঠবে।