করোনা ঠেকাতে তাহিরপুরে সম্মিলিত প্রচেষ্টা

গোলাম সরোয়ার লিটন

গত ২৬ এপ্রিল সিলেটে পুত্র সন্তানের জন্মদেন তাহিপুরের বর্তমান ইউএনও পতœী। তবে আজো কুলে নিতে সাহস করতে পারেন না ইউএনও। যদিও ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত ইউএনও পতœী সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কমকর্তার সাথে স্বামীর (ইউএনও) সরকারি বাসায় ছিলেন। গত এক বছর ধরে উপজেলায় সহকারী কমিশনার ভুমির পদও শুণ্য আছে। হাওরবেষ্টিত এ উপজেলায় হেমন্তকালে অভ্যন্তরীন যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম মোটরসাইকেল। এ কারণে ইউএনও কে আরো অতিরিক্ত চাপে থাকতে হচ্ছে। তাই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ইউএনও, ইউএইচও , থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি), প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সমাজকর্মীদের নিয়ে করোনা দুর্যোগে রাত দিন জনস্বার্থে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করে চলেছেন। এ কারণে করোনা দুর্যোগে তাঁরা উপজেলাজুড়ে প্রশংসায় ভাসছেন। এছাড়াও করোনা দুর্যোগ ঠেকাতে ধর্মীয় ও সামাজিক নেতারা কাজ করছেন। এসব কারণে নানাভাবে অনগ্রসর হাওরবাসীর মধ্যে সচেতনতা তৈরী হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৮ মার্চ দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরু হলে তাহিপুরবাসী এটিকে গুজব হিসাবেই বিশ^াস করে। কেউ কেউ এমনও বলেছেন সরকার এটি গুজব হিসাবে ছড়াচ্চে। এ কারণে হাওরবেষ্টিত অভ্যন্তরীন যাতায়াতে দুর্গম উপজেলা তাহিরপুরে জনগণকে সচেতন করতে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইউএনও ও ওসিকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। তাছাড়া বিশাল হাওরাঞ্চলের দুর্গম গ্রামে নারায়ণগঞ্জ ফেরতদের হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করাও ছিল কঠিন। তবুও ইউএনও ও ইউএইচও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মোটর সাইকেলে প্রত্যন্ত হাওরপাড়ের গ্রামে ঘুরে হোম কোয়ারেন্টাইন নিশ্চিত করতে কাজ করেছেন। এমনকি রাতের বেলায় বাড়িতে বাড়িতে প্রধানমন্ত্রী প্রেরিত খাদ্য সহায়তাও পৌঁছে দিয়েছেন। হাওরের দুর্গম অঞ্চলেও জীবাণূনাশক স্প্রে করেছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও ও ওসি মিলে ধানকাটতে কৃষকদের শ্রমিক সরবহরাহ করেছেন। এ সকল শ্রমিকদের মধ্যে খাদ্যসহায়তাও বিতরণ করেছেন। দ্রব্যমুল্যে দাম সহনীয় রাখতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন। নিজ হাতে ভবঘুরে ও অসহায়দের খুঁজে খাদ্য সহায়তা দিয়েছেন । করোনা দুর্যোগ থেকে রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর ৩১ দফা বাস্তবায়নে উপজেলা পরিষদ , উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্যবিভাগ ও পুলিশ প্রশাসন যৌথভাবে নিরলস কাজ করে চলেছেন। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নিজ হাতে মাইক নিয়ে গ্রামে গ্রামে প্রচারণা চালিয়ে জনগণকে সচেতন করতে চেষ্টা করেছেন। তবে পুলিশ প্রশাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টা জনসচেতনতা কার্যকর হয়েছে। আর এর নেতৃত্ব দিয়েছেন তাহিরপুর থানার ওসি আতিকুর রহমান। তবে সন্তান জন্মদানের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে পারেননি ইউএনও। আর সংক্রমণ ছড়ানোর ভয়ে এখনো নবজাতক থেকে দুরে সরে থাকেন ইউএনও বিজেন ব্যানার্জী। তাছাড়া মোবাইল ফোন আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার সাথে যোগাযোগে সক্রিয় থাকেন তিনি। এবং উপজেলাবাসীর কাছে প্রয়োজনীয় পরামর্শ . নির্দেশনা এবং অসহায় ও কর্মহীনদের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণে সকল অনলাইন মাধ্যমের সহায়তায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এছাড়াও বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিবর্গ কর্মহীন মানুষদের খাদ্য সহায়তা বিতরণ এবং গণসচেতনতায় কাজ করেছেন। এর মধ্যে আছে খেলাঘর আসর তাহিরপুর শাখা ও কালচারাল সোসাইটি বাদাঘাট। ব্যক্তি উদ্যোগেও অনেকেই ত্রাণ বিতরণ করেছেন। তবে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক নিভৃতে ব্যাপকভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তাহিরপুর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি অজয় কুমার দে বলেন, তাহিরপুর উপজেলার অভ্যন্তরীন সড়ক যোগাযোগ খুবই খারাপ। বৃষ্টি হলে আরো ভয়ানক হয়ে ওঠে। করোনা বিষয়ে সচেতনতা তৈরী, স্বাস্থ্যসেবা আর জনগণের মধ্যে খাদ্য সহায়তা বিতরণে উপজেলা পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্যবিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের ভুমিকা খুবই প্রশংসনীয়। জনগণ, জনপ্রতিনিধি আর প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধ চেষ্টাই এই করোনা দুর্যোগ ঠেকাতে পারে।

তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ইউএইচও) মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী, পরিবার পরিকল্পনা কর্মী, হেলথপ্রোভাইটার, ইপিআই টেকনলজিস্টসহ সবাই দেশের প্রতি গভীর ভালবাসায় করোনা দুর্যোগ থেকে উপজেলাবাসীকে সুরক্ষা দিতে কাজ করছেন। এজন্য জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

ইউএনও বিজেন ব্যানার্জী বলেন, এসি ল্যান্ড না থাকায় চাপ বেড়েছে। তাছাড়া উপজেলার অভ্যন্তরে যাতায়াতে প্রধানত মোটর সাইকেলেই ভরসা। এই কঠিন সময়ে আমরা সরকারি দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ আন্তরিক আর দায়িত্বশীল থেকে কাজ করার চেষ্টা করে চলেছি।

উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনা মেনে জনগণ আর প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মচারীদের ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা করে যেতে হবে। যাতে এই মহামারী থেকে আমরা বাঁচতে পারি।