করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলার স্বাস্থ্য বিভাগ কতটা প্রস্তুত?

সুনামগঞ্জের ১২ টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কোভিড ১৯ রোগীদের জন্য ১৩১টি বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ২৩ জুন পর্যন্ত জেলায় কোভিড ১৯ পজিটিভ হিসাবে শনাক্তকৃত ব্যক্তি সংখ্যা ৮৬৮ জন। এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ২৩০ জন, মারা গেছেন ৫ জন। এখনও আরোগ্য লাভের অপেক্ষায় আছেন ৬৩৩ জন।
জেলা প্রশাসকের ফেসবুক পেজের তথ্য অনুসারে জেলার ১২ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মোট বেড সংখ্যা ৫৮৭ যার ১৩১টি করোনা রোগীদের জন্য নির্ধারিত। বুধবার পর্যন্ত হাসপাতালে ৯৬ জন করোনা রোগী ভর্তি ছিলেন। করোনার জন্য নির্ধারিত ১৩১ বেডের ৩৫ টি এখনও খালি রয়েছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় জেলায় করোনা ব্যবস্থাপনায় হাসপাতাল বেডের সংকট নেই। কিন্তু পরিস্থিতি মোটেই সেরকম নয় বলেই আমরা মনে করি। কারণ গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার উপযুক্ত ব্যবস্থা জেলার হাসপাতালগুলোতে নেই। তাই গুরুতর রোগীদের সিলেট পাঠিয়ে দেয়া হয়। এদিকে এখন সংক্রমণের শতকরা হার বাড়ছে। দিন কয়েক ধরে পরীক্ষার বিপরীতে পজিটিভ হিসাবে শনাক্ত রোগীর শতকরা হার ২০ এর ধারে কাছে থাকছে। সহসা করোনা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটার কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ভবিষ্যতে রোগীর সংখ্যা অনেক বাড়বে। এদের অনেকেরই হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়বে। বর্ধিত রোগীর সেই চাপ সামাল দেয়ার মত সক্ষমতা কি জেলার স্বাস্থ্য কাঠামোর রয়েছে? হাসপাতালে একজন করোনা রোগী ভর্তি হলে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে দুই বা তিন সপ্তাহ লেগে যায়। অর্থাৎ একটি বেডে রোগী চলে আসলে সেটি দুই বা তিন সপ্তাহের আগে খালি হবে না। এক্ষেত্রে নতুন রোগীরা হাসপাতালে বেড পাবেন না। অন্যদিকে এখন যেভাবে মৃদু উপসর্গযুক্ত বা উপসর্গহীন পজিটিভ ব্যক্তিদের নিজ বাসায় আইসোলিশনে থেকে চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে তাও যথাযথ নয়। কারণ বাস্তবত নিজ বাসায় থেকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইসোলিশন পালন করা বেশির ভাগ মানুষের জন্য সম্ভব হয় না। নিজ বাসায় তাদের সেরকম আলাদা থাকার কোনো সুযোগই নেই। এই রোগীদের দ্বারা পরিবার ও অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। তাই পজিটিভ রোগীদের প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশনে রাখাটাই নিরাপদ বলে অনেক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মনে করেন। সেরকম ক্ষেত্রে বর্তমানে নিরাময়ের জন্য হাসপাতালের বাইরে থাকা ৫৩৭ জন (২৩ জুনের হিসাব) করোনা পজিটিভ ব্যক্তির জন্য এখন জেলার হাসপাতালগুলোতে বেড খালি আছে মাত্র ৩৫ টি। ভবিষ্যতে নতুন শনাক্তকৃতরাও যুক্ত হবেন দলে দলে। সংকটের মাত্রাটা সহজেই অনুমেয়।
জেলার হাসপাতালগুলোতে গুরুতর করোনা রোগীদের সেবা দানের অবস্থা একেবারেই হতাশাজনক। কারও অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাকে সিলেট বা ঢাকায় স্থানান্তর করতে করতেই প্রাণ সংশয়ের আশংকা তৈরি হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা আমাদের রোগতত্ত্ব বিশারদদের আশংকা, আরও বহুদিন থাকবে করোনার উপস্থিতি। এই বহুদিন কারও কারও মতে দুই বা তিন বছর পর্যন্ত। সুতরাং আমাদের স্বাস্থ্য কাঠামোর উন্নতি সাধন ছাড়া সামনের দিনগুলোতে করোনা মোকাবিলা করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন হবে। স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে বহু আগে থেকেই চিন্তা ভাবনা শুরু করা প্রয়োজন ছিলো, দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ধরনের চিন্তার বাস্তবতা আমরা দেখতে পাইনি।
করোনা রোগীদের হাসপাতাল সেবা নিশ্চিত করতে বেডের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে যেমন নজর দিতে হবে তেমনি অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরি ও বর্ধিত জনবল পদায়নের দিকেও মনোযোগী হতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক আইসোলেশন সুবিধা ব্যাপকভাবে বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে বন্ধ থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করার বিষয়ে বিবেচনা করা যায়। গুরুতর রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ সুবিধাও তৈরি করতে হবে অনেক বেশি। বিশেষ করে অক্সিজেন সরবরাহের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনা করতে হবে।
দেরি হলেও এখন আর দেরি না করে পরিকল্পনা সাজানো জরুরি। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ও জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে উদ্যোগী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা আহ্বান জানাই।