কর্মসৃজন প্রকল্পকে কর্মহীন প্রকল্পে রূপান্তর করবেন না

গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, দোয়ারাবাজার উপজেলায় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে কর্মসৃজন প্রকল্পের ৪৯টি প্রকল্পে ১ কোটি ২৩ লক্ষ চার হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু সংবাদ অনুসারে জানুয়ারি মাসের শেষার্ধে এসেও অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি। সংবাদে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, আর কয়েকদিন পর বোরো জমিতে ধানের চারা রোপণের কাজ শুরু হবে, তখন মাটির সংকট দেখা দিবে, এই সংকটকে সামনে রেখে প্রকল্পের কাজ না করে বরাদ্দের টাকা হরিলুট করার পাঁয়তারা শুরু হবে। উপজেলার ৯ ইউনিয়নের প্রকল্পগুলোর তালিকা প্রকাশ ও অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য সংবাদে উদ্ধৃত করা হয়েছে। চেয়ারম্যানগণ কিছু প্রকল্পে কাজ শুরু হওয়ার কথা বলে অবশিষ্ট প্রকল্পগুলোতে দ্রæতই কাজ শুরু করা হবে মর্মে জানিয়েছেন। চেয়ারম্যানগণের বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে যে কেউ বিস্তর ফারাক খোঁজে পেতে পারেন। এবং কর্মসৃজন প্রকল্পের যেকোনো প্রকল্পেই এমন ফারাক খোঁজে পাওয়া যাবে। মূলত কর্মসৃজন প্রকল্প নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এই প্রকল্পটিকে অনেকেই জনপ্রতিনিধি ও জড়িত কর্মকর্তাদের আত্ম উন্নয়ন প্রকল্প বলে পরিহাস করে থাকেন। এতে করে সরকার যে উদ্দেশ্যে কর্মসৃজন প্রকল্প চালু করেছিলেন তা অনেক আগেই ভেস্তে গেছে।
মূলত যে মৌসুমে গরিব মানুষের কর্মসংস্থানের অভাব থাকে সেই মৌসুমে তাদের কাজের ব্যবস্থা করে বেঁচে থাকার অবলম্বন দিতেই এই প্রকল্প চালু করা হয়। এর মধ্য দিয়ে এলাকার কিছু ছোটখাট উন্নয়নও সম্ভব হয়। এরকম একটি মহৎ উদ্দেশ্য সংবলিত প্রকল্পকে বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে বাস্তবায়নকারীরা কেবল মূল উদ্দেশ্যকেই হত্যা করেননি বরং এটিকে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির অন্যতম হাতিয়ারে পরিণত করেছেন। গণমাধ্যমে এসব প্রকল্পের অনিয়ম-অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হতে হতে এখন বিষয়টি অনেকটা গা সহা হয়ে গেছে। আমরা যে দুর্নীতির ভয়াবহ সংস্কৃতিকে লালন-পালন করছি তাতে যেকোনো প্রকল্প বা কর্মসূচীই এখন আর অভিযোগহীন থাকছে না। বলা হয়ে থাকে অপার সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের প্রত্যাশিত উন্নয়নকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করছে দুর্নীতি নামক সর্বগ্রাসী দানব। বাংলাদেশে এখন যেটুকু উন্নয়ন দৃশ্যমান তা অন্তত দ্বিগুণ হয়ে যেত দুর্নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দুর্নীতির সূচকে তাই বাংলাদেশের তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। দুর্নীতির প্রশ্নে আমাদের অবস্থা এখন আন্তর্জাতিক লজ্জায় পরিণত হয়েছে।
দোয়ারাবাজারে যেখানে ১ জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু হওয়ার কথা সেখানে কেন অধিকাংশ প্রকল্পে জানুয়ারি মাসের শেষার্ধেও কাজ শুরু হয়নি তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা উচিত। শুধু দোয়ারাবাজার নয় অন্যান্য উপজেলাগুলোর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। কাগজ-কলমের তৈরি করা অগ্রগতি নয় মাঠের প্রকৃত অবস্থা ও জড়িত শ্রমিকদের মজুরি পাওয়ার বাস্তবতার ভিত্তিতে সঠিক অবস্থা কর্তৃপক্ষের জানা আবশ্যক। এও অভিযোগ আছে, ব্যাংক মাধ্যমে শ্রমিকের ব্যাংক একাউন্টেই মজুরি পরিশোধ হয় কিন্তু কোনো ভুতুরে কৌশলে সেই টাকা শ্রমিকের পরিবর্তে অন্য কারও পকেটে ঢুকে যায়। কী সেই ভুতুরে কৌশল, কারাই বা এই কৌশল প্রয়োগ করেন; সেটি সকলেই জানেন। পরিতাপের বিষয় এই, অপকৌশলটি ঠেকানোর আন্তরিক উদ্যোগ নেই কোথাও। ফলত কর্মসৃজন প্রকল্পটি এখন কর্মহীন প্রকল্পে পরিণত হয়ে সরকারি অর্থের অপচয় তথা দারিদ্র্য বিমোচনের জাতীয় লক্ষকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে আশু উত্তরণ আবশ্যক। নতুবা স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য যে কর্মসূচী নির্ধারণ করা হয়েছে সেই জায়গায় পৌঁছানো কখনও সম্ভব হবে না।