কষ্ট ভুলে হাসছে হাওরের মানুষ

বিন্দু তালুকদার
গত বছর হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের সকল বোরো ফসলহানির কারণে পুরো জেলা জুড়ে ছিল হাহাকার। ছিল না নববর্ষ, বর্ষবরণ ও নতুন বছরের কোনো আমেজ।
ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়মের কারণে নববর্ষের আগেই পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল সুনামগঞ্জের প্রায় ৯০ ভাগ বোরো ফসল। বৈশাখে হাওরে পাকা ধান কাটার পরিবর্তে পানিতে থৈ থৈ করছিল। পানি ভর্তি হাওরে একটু বাতাসেই ঢেউ উঠছিল। ধান কাটার উৎসবের মাসে বর্ষার আমেজ বিরাজ করছিল।
সরকারি হিসাবে গেল বছরের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জে এক লাখ ১৩ হাজার হেক্টর ফসল পানিতে ডুবে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ফসল তলিয়ে গিয়েছিল। যার কারণে সুনামগঞ্জের কয়েক লাখ কৃষক পরিবারে দুর্দিন শুরু হয়েছিল। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি ধানের শীষ গজানোর পর পরই ফসল তলিয়ে যাওয়ায় সেবার কৃষকরা নিজেদের খাবারের জন্যও এক মুঠো ধান ঘরে তুলতে পারেন নি। এই অবস্থায় হাওরের কোথাও হয়নি বর্ষবরণ এবং বৈশাখী উৎসব।
বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও জেলা প্রশাসন নববর্ষের আনন্দ শুভাযাত্রা ও আড়ম্ভরময় সকল অনুষ্ঠান
বর্জন করা হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে গড়ে উঠা সামাজিক সংগঠন ‘হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’ গত বছরের ১৩ এপ্রিল বাঁধ নির্মাণে পাউবো, ঠিকাদার ও পিআইসিদের অনিয়ম দুর্নীতির প্রতিবাদে পাউবো অফিস ঘেরাও করেছিল।
নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার পরিবর্তে কৃষকদের দাবি-দাওয়া সংবলিত ব্যানার- ফেস্টুন নিয়ে প্রতিবাদী র‌্যালি ও প্রতিবাদী গণসংগীত গেয়েছিলেন জেলার সংস্কৃতিকর্মীরা।
তবে প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশে চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের হাওরে বোরো ধানের ফলন ভাল হয়েছে। যদিও শেষ সময়ে কিছু হাওরে ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ দেখা দিয়েছে। এই বছর বাঁধ নির্মাণে সরকার ১৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রদান করেছে। পাউবো ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কঠোর তদারকিতে বাঁধের কাজ তুলনামূলক ভাল হয়েছে এই বছর। পুরোদমে না হলেও জেলাজুড়েই শুরু হয়েছে আগাম জাতের ধান কাটা।
দীর্ঘ এক বছরেরও বেশী সময় পেরিয়ে কষ্টার্জিত স্বপ্নের সোনালী ফসল বোরো ধান গোলায় তোলার কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে হাওরপাড়ে। এতে এক বছরের দুঃসময় ও কষ্ট ভুলে হাসছে হাওরের মানুষ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গত বছর ২ লাখ ২৩ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। বোরো ধানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৬৩৪ কোটি টাকা। কিন্তু বাঁধ ভেঙে অকালে সব জমি তলিয়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষক পরিবারগুলো। সরকারি নানা সহায়তায় ঘুরে দাড়িয়েছে জেলার কৃষক পরিবারগুলো।
বোরো ফসলহানির পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সুনামগঞ্জের ১ লাখ ৬৮ হাজার পরিবারকে দীর্ঘ এক বছর প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে। জেলার প্রতিটি ইউনিয়নে ওএমএস’র চাল বিক্রি করা হয়। নতুন করে ফসল ফলানোর জন্য ৩ লাখ কৃষককে সাড়ে ৫৮ কোটি টাকার কৃষি ভর্তুকি হিসেবে নগদ ১ হাজার টাকা, ৫ কেজি বীজ ধান ও ৩০ কেজি সার বিনামূল্যে প্রদান করা হয়েছে।
চলতি বোরো মৌসুমে সুনামগঞ্জের হাওরে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর বোরো জমি চাষাবাদ হয়েছে। লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৯৩ হাজার মে.টন। কৃষি বিভাগের দাবি আগামী দুই সপ্তাহ কোনো দুর্যোগ না হলে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন হবে।
জামালগঞ্জের হালির হাওরপাড়ের লম্বাবাঁক গ্রামের স্বাবলম্বী কৃষক দিলোয়ার হোসেন বলেন,‘ গত বছর এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ বাঁধ ভেঙে কাঁচা ধান পানিতে তলিয়েছে। এই বছর ৩ এপ্রিলই আমরা ৬ কেদার জমির ধান কেটে গোলায় তুলেছি। ’
শাল্লা উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের কৃষাণী রেখা রানী রায় (৩৫) বলেন,‘ গত বছরের প্রথম দিন পূজা করা ও পূজার ঘটের নিচে দেয়ার মত এক ছটাক ধান ছিল না কারো ঘরে। সরকারের দেয়া চাল ও নগদ টাকায় হাওরের মানুষ বেঁেচ আছে। এবছর ভাল যাবে বলে বুঝা যাচ্ছে, ধান কাটা শুরু হয়েছে। সবার মনেই আনন্দ-ফুর্তি আছে। মানুষ কষ্ট ভুলে গেছে।’
রেখা রানী রায় আরও জানান, তিনি ছায়ার হাওরে ৭ কেদার বোরো জমি করেছেন। প্রায় এক কেদার জমি কেটে ১০-১২ মণ ধান পেয়েছেন। কয়েকদিন পরই বাকী জমির ধান কাটবেন।’
একই গ্রামের কৃষক নূর মোহাম্মদ বললেন, গেল বছর এক শতক জমির ধান কাটতে পারিনি। গরু-বাছুর সব বিক্রি করেছি। ভরা বৈশাখ মাসে ধান কাটার পরিবর্তে হাওরে ট্রলার চলেছিল। নানা কষ্টে এ বছর ৫০ কেদার জমি করেছি। ৭ কেদার কেটেছি, অন্তত ১২০ মণ ধান পেয়েছি। সব জমি ভাল করে কাটতে পারলে প্রায় হাজার মণ ধান পাব।’
দিরাই উপজেলার বরাম হাওরপাড়ের চন্ডিপুর গ্রামের কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন,‘গত বছর কি যে দুর্যোগ ছিলাম তা বলার মত ছিল না। ৪০ কেদার জমি করে ৪০ কেজি ধানও পাইনি। এইবার হাওরে ভাল ধান হয়েছে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ৩ কেদার কেটেছি। আবহাওয়া ভাল থাকলে এক সপ্তাহ পর বাকীটুকু কাটতে পারব।’
তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওরপাড়ের মধ্যতাহিরপুর গ্রামের প্রাকৃতিক কৃষি নিয়ে কাজ করা কৃষাণী সায়মা আক্তার বলেন,‘ এবার হাওরে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। কৃষকের মুখের হাসি ছড়িয়ে পড়ছে হাওর থেকে হাওরে। আর যারা আদি ধান ও প্রাকৃতিকভাবে জমি চাষ করছেন সেই কৃষকেরা মহা খুশিতে ধান কাটছেন। ’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক স্বপন কুমার সাহা বলেন,‘এবার সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ লাখ ৯৩ হাজার মে.টন। ধানের ফলন ভাল হয়েছে এবং কাটা শুরু হয়েছে। কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। ’
জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন,‘ হাওরপাড়ের সংগ্রামী মানুষ দুঃখ কষ্টকে জয় করেছে। সরকার ফসলহারা কৃষকদের পাশে থেকে সবধরনের সহায়তা দিয়েছে। এবছর হাওরে স্বপ্নের সোনালী ফসল বোরো ধানের ফলন ভাল হয়েছে। আমরা আশাবাদী সবাই ফসল গোলায় তুলতে পারবেন। আশা করছি নতুন বছরটি সবার জন্যই শুভ হবে। জেলা প্রশাসন থেকে দুই দিনব্যাপি বর্ষবরণের আয়োজন করা হয়েছে। ’



আরো খবর