কাঁকন বিবির খোঁজে

রণেন্দ্র তালুকদার পিংকু
ভূমিকা:
১৯৭১ সালে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে সারা বাংলাদেশে যখন প্রতিরোধ আন্দোলন শুরু হয়, সুনামগঞ্জের আপামর জনগণও তখন পাক হানাদারদের উৎখাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো হাওর বাঁওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাও গুরুত্বপূর্ণ। অসংখ্য নদ-নদী, খাল, বিল, হাওর আর জলাশয়ে পরিপূর্ণ সুনামগঞ্জ জেলায় কমবেশি ২৭টি ছোট বড় যুদ্ধ হয়েছে। যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন জগৎজ্যোতি দাস, সিরাজুল ইসলাম সহ অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধা। বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি সহ অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা শরীরে গুলির ক্ষত চিহ্ন নিয়ে আজও বেঁচে আছেন। সুনামগঞ্জ জেলায় প্রায় সাড়ে চার হাজার মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করতে যেয়ে অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধার গৌরবময় যুদ্ধকালীন বর্ণনা পেয়েছি। সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের রয়েছে অনন্য গৌরবোজ্জ্বল এক সোনালী অধ্যায়। এই ইতিহাসের কিংবদন্তীদের অন্যতম কাঁকন বিবি। দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর সাধনার পর কাঁকন বিবিকে আবিষ্কার করি। ১৯৯৬ সাল থেকে দীর্ঘদিন আমিসহ সহকর্র্মীবৃন্দ বিভিন্ন পত্রিকায় রিপোর্ট করেছি। মাঝে-মধ্যে লক্ষ্য করেছি কাঁকন বিবিকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক ফিচার হয়েছে, তাই সঠিক ইতিহাসের জন্য আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস। আমার সহকর্মী পংকজ দে’র দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর এবং সেলিম আহমদ’র দৈনিক সুনামগঞ্জের সময় পত্রিকায় কাঁকন বিবিকে নিয়ে আমার রিপোর্ট ছাপা হওয়ায় ঋণের দায়ে আবদ্ধ। এ বিষয়ে সাংবাদিক হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, অরুণ চক্রবর্তী এবং জাকির হোসেন আমার কাজে সহযোগিতা করেছেন। কৃতজ্ঞ আমি। স্ত্রী নিলীমা তালুকদার সব সময় সহযোগিতা না করলে সব কাজই দুরুহ হয়। আমার একমাত্র মেয়ে পারমিতা তালুকদার বইয়ের মূল কাজে সহযোগিতা করেছে। এই বইয়ের কোন বানান ভুল কিংবা অন্য কোন ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। ইতিপুর্বে “সুনামগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধ” “মুক্তিযুদ্ধে দাসপার্টি ” বইয়ের পর “কাঁকন বিবির খোঁজে” বইটির সাফল্য পাঠকদের উপর।
পর্ব-১
১৯৯০ সাল। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের অনুষ্ঠানে সেক্টর কমান্ডার লে. কর্ণেল মীর শওকত আলী তাঁর আলোচনায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে সুনামগঞ্জের একজন মহিলা মুক্তিযোদ্ধার সশ্রস্ত্র অংশগ্রহণের কথা স্মৃতিচারণ করেন। সেই সূত্র ধরে ১৯৯০ সাল থেকে অনুসন্ধান শুরু করি। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সংবাদ সংগ্রহ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য যখন যে উপজেলায় গেছি সেখানেই মহিলা মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান করেছি। ১৯৯৬ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’র জন্যে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ডোম ,মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করি। সাক্ষাৎকারের এক পর্যায়ে মহিলা মুক্তিযোদ্ধার প্রসঙ্গ আসতেই তিনি জানান, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অক্টোবর মাসে তার কোম্পানীতে কাঁকন নামের এক খাসিয়া মহিলা সশ্রস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেন। বর্তমানে তাঁর (কাঁকন বিবি) অবস্থান জানা নেই। তবে সীমান্তবর্তী কোন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যেতে পারে। প্রায় ছয় বছরে যেহেতু নাম পেয়েছি তাই অনুসন্ধান শুরু করি। ১৯৯৬ সালের কোন একদিন দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের কাঁঠালবাড়ী বাজারে যাই। কিন্তু কোন সন্ধান পাইনি। এভাবে এক নাগাড়ে ৭ দিন পাহাড়ের পাদদেশে বিভিন্ন গ্রামে খুঁজতে খুঁজতে এক পর্যায়ে ঝিরাগাঁও গ্রামের এক চা দোকানী জানান, খাসিয়া এক মহিলা অত্র অঞ্চলে ভিক্ষা করে, লোকজন মহিলাকে মুক্তি বোর্ট বলে ডাকে, দেখতে পারেন ওই মহিলার সঙ্গে আলাপ করে। ঝিরাগাঁও গ্রামের কৃষক শাহীদ আলীর বারান্দায় থাকে। কথামতো সেখানে উপস্থিত হলাম। ঘন্টাখানেক অপেক্ষার পর শাহীদ আলীর সহায়তায় কাঁকন বিবির সাক্ষাৎ পাই।
পর্ব-২
ঝিরাগাঁও গ্রামে কৃষক শাহীদ আলীর বারান্দায় কাঁকন বিবি রাত্রি যাপন করেন। দরিদ্র কৃষক শাহীদ আলীর নিজেরই অন্ন জোটে না, কাঁকন বিবিকে কী খাওয়াবেন। সারাদিন ভিক্ষা করে যা পায়, তাই দিয়ে ক্ষুধা নিবারণ। এভাবেই চলে তার নিত্যদিন। মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষাৎকার নেবো শুনে কোন কৌতুহল নেই, আগ্রহ নেই। বাংলা ভাষায় শুদ্ধ করে কথা বলতে না পারায় সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা নিয়ে বেশ সমস্যা হয় । প্রথমদিন অনেক কষ্টে গল্প শুনছিলাম কাঁকন বিবির কণ্ঠে। ৯টি সম্মুখ সারির সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ার কথা শুনে থমকে দাঁড়াই। কথায় কথায় চলে আসে সহযোদ্ধা রহমত আলী, কমান্ডার শহীদ মিয়ার নাম। প্রথম দিনের গল্প শুনে ফিরে আসি শহরে। দ্বারস্থ হই রহমত আলীর। অনেক কষ্টে মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীকে সঙ্গে করে দ্বিতীয় দিন চলে যাই আবার ঝিরাগাঁও গ্রামে কাঁকন বিবির সন্ধানে। যেহেতু একই কোম্পানীতে রহমত আলী ও কাঁকন বিবি নয়টি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তাই ঘটনার সত্যতা কিংবা তথ্যের যথার্থতা নিয়ে আর কোন সন্দেহ রইল না। দ্বিতীয় দিন পুরো সাক্ষাৎকার নিয়ে আমি এবং মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী ফিরে আসি শহরে। কাঁকন বিবির জীবনের বীরত্বগাঁথা নিয়ে শেয়ার করি সহকর্মী পংকজ দে, উজ্জ্বল মেহেদী এবং খলিল রহমান’র সঙ্গে। চারজন সংবাদকর্মী মিলে একটি প্রতিবেদন তৈরি করি। কারণ বাংলাদেশে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করা একমাত্র নারী কাঁকন বিবি।
পর্ব-৩
কাঁকন বিবি মূলত খাসিয়া উপজাতির মহিলা। তাঁর মূল বাড়ি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের নত্রাই নামক গ্রামে। কাঁকন বিবির বাবার নাম গিসয়, মায়ের নাম মেলি। গিসয় দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে সবার ছোট কাঁকন বিবির মূল নাম কাঁতেক নিয়তা, ডাক নাম কাঁকন। ( মুক্তিযুদ্ধের সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় তাঁর অনুমতি সাপেক্ষে ‘কাঁকন’ নামের সঙ্গে বিবি শব্দটি আমি যুক্ত করি যা পরবর্তীতে কাঁকন বিবি নামে প্রতিষ্ঠিত হয়) ৫ ভাই বোনের মধ্যে উহর, উসাল, উফান নামে ৩ ভাই এবং কাফল ও কাঁকন ২ বোন। কাঁকন বিবির বাবা গিসয় এর পেশা ছিল জুম চাষ। মা গৃহিনী। খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কাঁকন বিবির বয়স যখন ছয় মাস তখন তাঁর বাবা গিসয় মারা যান। বছর খানেক পর মা মেলিও মারা যান। কম বয়সে মা বাবা হারানোর ফলে কাঁকন বিবির ভাই-বোনদের অল্প বয়সে বিভিন্ন কাজকর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ফলে কারো লেখাপড়া করা হয়ে উঠেনি। কাঁকন বিবির বড় বোন কাফল এর বিয়ে হয় সিপাহি খুশি নামক ব্যক্তির সাথে। খুশি প্রমোশন পাওয়ার পর ‘খুশি কমান্ডার’ নামে এলাকায় পরিচিতি পান। খুশি কমান্ডার শালিকা কাঁকন বিবিকে তাঁর পরিবারে নিয়ে আসেন এবং সন্তানের মতো লালন পালন করেন। খুশি কমান্ডারের অবস্থান ছিল ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের পাহাড়ের পাদদেশে বাংলাদেশ অংশের কাঁঠাল বাগান গ্রামে। কাঁকন বিবির বয়স যখন অনুমান ১৫ বছর তখনই পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আব্দুল মজিদ খাঁন নামে এক সৈনিকের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। মজিদ খানের চাকুরিস্থল ছিল কাঁঠাল বাগান গ্রাম থেকে সামান্য দূরে পাকিস্তান সীমান্তরক্ষী বাহিনী ক্যাম্পে। বিয়ের পর সিলেট আখালিয়া ক্যাম্পে বদলী হলে সেখানে কাঁকন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকেন। বিয়ের পর একে একে তিনটি সন্তান জন্মগ্রহণ করার পর একটিও জীবিত না থাকায় মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়া মজিদ খাঁন কাঁকন বিবিকে ফেলে রেখে সিলেটের আখালিয়া ক্যাম্প থেকে নিরুদ্দেশ হন। পরবর্তীতে দিরাই থানার জনৈক শহীদ আলী নামক এক কৃষকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হলে কাঁকনের নাম হয় ‘নূরজাহান বেগম’। নূরজাহান বেগম’র গর্ভে কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। নাম রাখা হয় সখিনা। কিন্তু কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার অপরাধে নূরজাহান ওরফে কাঁকন বিবিকে ডিভোর্স দেয় শহীদ। কন্যা সখিনাকে বড় বোন কাফল-এর নিকট রেখে কাঁকন বিবি পুনরায় পূর্বের স্বামী আব্দুল মজিদ খাঁনের সন্ধানে পাকিস্তানি ক্যাম্পে খোঁজতে শুরু করেন। দেশে তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। স্বামীর খোঁজে কাঁকন বিবি দোয়ারাবাজার সীমান্তে যান। তখন ছিল জুন মাস। পাক বাহিনীর সঙ্গে বাঙালির যুদ্ধ চলছিল। দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে স্বামীকে খুঁজতে গেলে নরপিশাচ পাকবাহিনী তাঁকে আটক করে ব্যাঙ্কারে নিয়ে যায়। তাঁকে ব্যাঙ্কারে রেখে কয়েকদিন নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়। তখন তাঁর ছিল টগবগে যৌবন। নির্যাতিতা কাঁকন বিবি স্বামীর আশা বাদ দিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন। এদিকে, ভগ্নিপতি অসুস্থ হওয়ায় শিশু কন্যা সখিনাকে সীমান্তবর্তী ঝিরাগাঁও গ্রামের জনৈক শাহেদ আলীর আশ্রয়ে রাখেন। প্রতিশোধের নেশায় জুলাই মাসে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও রহমত আলীর সঙ্গে। তারা কাঁকন বিবিকে লে. ক. মীর শওকত’র সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রাথমিক পর্যায়ে কাঁকন বিবিকে গুপ্তচরের দায়িত্ব দেন মীর শওকত। কাঁকন বিবি সাহসিকতার সাথে গুপ্তচরের কাজ করতে থাকেন। সুনামগঞ্জ-সিলেট অঞ্চলটি ছিল ৫ নম্বর সেক্টরের অধীন। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. ক. মীর শওকত আলী। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলাল কাঁকন বিবিকে ক্যাম্পের কোম্পানী কমান্ডার শহীদ মিয়ার আন্ডারে গুপ্তচরের কাজে লাগিয়ে দেন। কাঁকন বিবির স্বামী আব্দুল মজিদ খাঁন যেহেতু পাকিস্তানী সৈন্য এবং পাকিস্তানী ক্যাম্পে কাজ করত তাই কাঁকন বিবির পক্ষে সম্ভব সেখানকার সব খবরাখবর এনে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করা। শুরু হয় কাঁকন বিবির পথ চলা। ভিক্ষুকের বেশ ধরে জীবন বাজি রেখে পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে যেয়ে মুক্তিবাহিনীর জন্য খবর নিয়ে আসেন। ক্যাপ্টেন হেলাল কাঁকন বিবিকে বুঝিয়ে দেন পাকিস্তানী ক্যাম্পে ঢুকে তাদের হাতিয়ারের ধরন, সংখ্যা ও সৈনিকদের অবস্থান সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করা। সম্যক ধারণা নিয়ে কাঁকন বিবি রওয়ানা দেন টেংরা ক্যাম্পের দিকে। প্রথমে টেংরা ক্যাম্পের বাইরে কয়েকটি বাড়িতে ভিক্ষা করেন। পরে কৌশলে এক সময় ঢুকে পড়েন টেংরা ক্যাম্পের ভিতর। ভিক্ষা চান পাকিস্তানী মিলিটারিদের কাছেই। মিলিটারিরা ভিক্ষা দিয়ে বিদায় করার চেষ্টা করে। কিন্তু কাঁকন বিবি নানা কৌশলে স্বামী আব্দুল মজিদ খাঁনের খোঁজও করেন। নানা কায়দায় ক্যাম্পের ভেতর কিছুক্ষণ অবস্থান করে সবকিছু দেখার চেষ্টা করেন। প্রথম দিন তিনি খুব ভালভাবেই তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। টেংরা ক্যাম্পে তিনি যা দেখেছেন তা সবই এসে জানান, কোম্পানী কমান্ডার শহীদ মিয়াকে। মুক্তিবাহিনী তখন সেই মোতাবেক তাঁদের অপারেশন চালায় এবং তাঁরা সফলও হন। দ্বিতীয় দিনও কাঁকন বিবি একই কায়দায় টেংরা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। তখন একটি ঘরে কয়েকজন মেয়েকে দেখতে পান। মেয়েরা ছিল ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। স্থানীয় রাজাকার আলবদররা সুন্দরী মেয়েদের ধরে এনে পাকিস্তানী বাহিনীর মনোরঞ্জণের জন্যে টেংরা ক্যাম্পে আটকে রাখত। কাঁকন বিবি বুঝতে পারলেন এদেরকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়ে ছিল। দ্বিতীয় দিন পাক হানাদার বাহিনীর কাছে ধরা পড়ে যান কাঁকন বিবি। কাঁকন বিবি যে একজন গুপ্তচর তা অনুমান করতে পারেনি পাকবাহিনী, ফলে কাঁকন বিবিকে ছেড়ে দেয়। কাঁকন বিবি সেদিনও সমস্ত তথ্য এনে কোম্পানী কমান্ডারকে দেন।
কাঁকন বিবি গুপ্তচর হিসেবে জাউয়া, গোবিন্দগঞ্জ ক্যাম্পে যান। সব জায়গাতেই তাঁর একই কাজ। ক্যাম্পের অবস্থান, সৈন্য সংখ্যা, হাতিয়ার ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসা। পাকিস্তানী ক্যাম্পে গিয়ে স্বামীর খোঁজ নিতেন ভিক্ষুকের বেশে। কিন্তু কে কার খবর রাখে বরং কাঁকন বিবিকে আটকে রেখে নির্যাতন করে ছেড়ে দিতো। নির্যাতন সহ্য করেও কাঁকন বিবি নিজের কাজ সম্পর্কে ছিলেন পূর্ণ মাত্রায় সচেতন, কারণ তাঁর দেয়া তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশনে জয়ের ব্যাপারে মূল ভূমিকা পালন করত। গুপ্তচরের কাজ করতে যেয়ে এক পর্যায়ে বাংলাবাজারে পাকবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তখন পাকবাহিনী বুঝে যায় কাঁকন বিবি অর্থাৎ ভিক্ষুক মহিলাটি মুক্তিযোদ্ধাদের ইনফরমার। পাকবাহিনীর সদস্যরা তাঁকে এক নাগারে ৭ দিন বিবস্ত্র করে নির্যাতন চালায়। রাত হলেই চলতো তাঁর উপর নির্যাতন। ১৫/২০ জনের দল সারারাত তাঁকে নির্যাতন করত। ভোর রাতে বেয়েনেটের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত করে ফেলত সমস্ত শরীর। নিথর দেহ সারাদিন বিপর্যস্ত অবস্থায় পাকবাহিনীর ক্যাম্পের মেঝেতে পড়ে থাকত। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে পুনরায় একই কায়দায় চলত নির্যাতন। এভাবে নির্যাতন চলে এক নাগাড়ে সাত দিন। শেষ দিন অর্থাৎ সপ্তম দিন লোহার রড গরম করে তাঁর বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গে ১২/১৩টি ছ্যাঁক দেয়। ছ্যাঁক দেয়ার পর কাঁকন বিবির আর কিছু মনে নেই। কাঁকন বিবিকে অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে পাঞ্জাবীরা ফেলে রেখে যায়। বাংলাবাজার গ্রামের কিছু লোক অজ্ঞান অবস্থায় কাঁকন বিবিকে ভারত সীমান্তের পাশে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে বালাট নিয়ে চিকিৎসা করান। চিকিৎসা শেষে কাঁকন বিবি পুনরায় বাংলাবাজার আসেন। সেখানে তিনি কমান্ডার শহীদ-এর সঙ্গে যোগাযোগ করে আর্জি জানান আর গুপ্তচরবৃত্তি নয় এবার সরাসরি যুদ্ধ করতে চান। তাঁর কথামত মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীকে নির্দেশ দেন যাতে কাঁকন বিবিকে অস্ত্র চালানো শিখিয়ে দেয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে প্রশিক্ষণ নেন অস্ত্র চালনার। রহমত আলীর দলের সদস্য হয়ে অস্ত্র সহকারে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন কাঁকন বিবি।।
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহ মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর গ্রæপের ১৭/১৮ জন মুক্তিযোদ্ধা জয়বাংলা বাজার অবস্থান থেকে আমবাড়ি গ্রামে রওয়ানা হলেন। প্রায় পাঁচ মাইল দুর্গম পথ পায়ে হেঁেট আমবাড়ী পৌঁছান। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল হক ভুঁইয়ার নেতৃত্বে ব্যাংকার খনন কাজ শুরুর মুহূর্তে পাকিস্থানী হানাদাররা মুক্তিবাহিনীর উপর বৃষ্টির মত গুলি বর্ষণ শুরু করে। ভারী অস্ত্র ও গোলা বারুদে সজ্জিত পাক বাহিনীর প্রচুর সদস্য ছিল। তবুও কাঁকন বিবিসহ পুরো ইউনিটটি বর্বর সেনাদের ত্রিমুখী আক্রমণ প্রতিহত করে চললেন। কিন্তু বেশিক্ষণ লড়ে যাওয়া সম্ভব হল না। ইতিমধ্যে গুলির পরিমাণ শূন্যের কোঠায় পৌঁছে গেছে। তাই আক্রমণের কৌশল পরিবর্তন করে পেছনে হটতে বাধ্য হলেন কাঁকন বিবির পুরো ইউনিট। এই যুদ্ধে কয়েকজন পাক সেনা নিহত হলেও পাক বাহিনী সিদ্দিক মিয়া ও জুলহাস মিয়া নামক দু’জন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যায়। বাংলার এই দামাল ছেলেদের আর ঘরে ফেরা হয়নি। সেই যুদ্ধে কাঁকন বিবির পায়ে গুলি লাগে। সেই গুলির চিহ্ন তিনি আজো বয়ে বেড়াচ্ছেন। টেংরাটিলা যুদ্ধ ছিল কাঁকন বিবির অন্যতম যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তিনটি কোম্পানী অংশ নেয়। শহীদ কোম্পানী, সাধন ভদ্র’র কোম্পানী ও ইউনুছ আলীর কোম্পানী। কাঁকন বিবি ছিলেন শহীদ কোম্পানীর আন্ডারে। কাঁকন বিবি মূলত শুরু থেকেই শহীদ কমান্ডারের কোম্পানীতে থেকে যুদ্ধে অংশ নেন। টেংরাটিলা যুদ্ধ বিশাল আকারে ছিল। এ যুদ্ধ পরিচালনা করেন সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন হেলাল। তিনটি দল তিন দিক থেকে আক্রমণ শুরুর কথা থাকলেও পাক সেনাদের আক্রমণে এবং ক্রসফায়ারিং’র মধ্যে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে সব কোম্পানী। কাঁকন বিবি যে কোম্পানীর অধীনে যুদ্ধ করেন অর্থাৎ শহীদ কোম্পানীকে সাপোর্ট করার জন্য পরবর্তীতে লে. এম এ রউফ ও লে. খালেদ এসে যোগ দিয়ে শক্তি সঞ্চয় করলে শত্রæ সৈন্যরা টেংরাটিলা থেকে পিছু হটতে বাধ্য হয়। আমবাড়ি, টেংরাটিলার পর কাঁকন বিবির উল্লেখযোগ্য অপারেশন ছিল জাউয়া ব্রীজ ধ্বংস করা। মুক্তিযোদ্ধাদের একটি চৌকস দল লে. রউফের নেতৃত্বে দিনের বেলায় গ্রামের ঝোঁপ-জঙ্গলে কাটিয়ে রাত্রি বেলায় জাউয়া অভিমুখে রওয়ানা হন। এই দলে আব্দুল হালিম, উজির মিয়া, আব্দুল মজিদ, ইকরাম উল্ল্যা, হিরন্ময় কর, আব্দুল করিম, আব্দুস সামাদরা অংশ নেন। অন্যদিকে, রহমত আলীর দল খাল ঘেঁষে জাউয়া বাজারের দিকে অগ্রসর হয়ে কাঁকন বিবিকে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে খবরাখবর সংগ্রহের জন্য পাঠান। কাঁকন বিবি ভিক্ষুক সেজে জাউয়া বাজারে পৌঁছে পাক বাহিনীর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। কাঁকন বিবির বর্ণনা মতে বাংলাবাজার অবস্থান থেকে তিন দিনে কখনো নৌকায়, কখনো পায়ে হেঁেট, আবার কখনো কলা গাছের ভেলায় চড়ে জাউয়া পৌঁছতে হয়েছে। দিনের বেলায় কোন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। সন্ধ্যা হলেই শুরু হত পথ চলা। এভাবেই দুর্গম খাল বিল পাড়ি দিয়ে জাউয়া ব্রীজ অপারেশনে যোগ দেন এবং সফল হন। আমবাড়ি বাজার যুদ্ধ, টেংরাটিলা যুদ্ধ, জাউয়া বাজার ব্রীজ অপারেশন ছাড়াও দূর্বিনটিলা আঁধার টিলা, মহব্বতপুর, টেবলাইসহ প্রায় নয়টি সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন কাঁকন বিবি। কাঁকন বিবির দলের সদস্য শহীদ কমান্ডার এবং রহমত আলীর ভাষ্য, ‘তাদের গ্রæপে সবচেয়ে সাহসী যুদ্ধা কাঁকন বিবি। মৃত্যুকে কখনো ভয় পেতেন না। অসম্ভব সাহসী মহিলা এবং অল্প সময়ে সমরাস্ত্র প্রশিক্ষণে সফল হন।’
পর্ব-৪
এভাবেই যুদ্ধে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয় । দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাঁকন বিবি দোয়ারাবাজার উপজেলার লক্ষীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামের শাহীদ আলীর বাড়িতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর এই যোদ্ধা লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলেন বহুদিন। যুদ্ধের প্রায় ২৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’ পত্রিকায় কাঁকন বিবির সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক সংবাদ’র তৎকালীন বার্তা সম্পাদক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল’র সহযোগিতায় নারী প্রগতি সংঘ ঢাকায় কাঁকন বিবির সংবর্ধনা আয়োজন করে । কাঁকন বিবিকে নিয়ে আমি ঢাকায় গেলে নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া ম্যাডাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। কাঁকন বিবি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিকভাবে কাঁকন বিবিকে নিজ এলাকায় অর্থাৎ ঝিরাগাঁও গ্রামে এক একর জায়গার ব্যবস্থা করে দেন। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের কথা শুনে কাঁকন বিবিকে ‘বীর প্রতীক’ খেতাবে ভূষিত করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাতীয় কমিটির নিকট সুপারিশ করেন। আমি ১৯৯৭ সালে যথারীতি মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদনও করি খেতাবের জন্য। মন্ত্রণালয় থেকে কাঁকন বিবিকে ‘বীর প্রতীক’ সনদ পত্র দেয় ঠিকই কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ২০০৩ সালে খেতাব প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যে গেজেট প্রকাশ করে সেখানে কাঁকন বিবির নাম অন্তর্ভুক্ত করেনি। শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের পর কাঁকন বিবি বীর প্রতীক এলাকায় চলে আসলে সুনামগঞ্জের তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাঁকন বিবিকে ঝিরাগাঁও গ্রামে এক একর জায়গা বুঝিয়ে দেন। পরবর্তীতে সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এই জায়গায় একটি ঘর করে দেন। সেই সময় ‘দৈনিক জনকন্ঠ’ কাঁকন বিবিকে প্রতিমাসে ৫ হাজার টাকা করে অনুদান দেয়। কয়েকটি বছর ভালই কাটছিল কাঁকন বিবির। ২০০৭ সালে হঠাৎ করে ‘দৈনিক জনকন্ঠ’ কাঁকন বিবির ভাতা বন্ধ করে দেয়। পুনরায় শুরু হয় দুর্বিষহ জীবন। কাঁকন বিবির দুরাবস্থা নিয়ে পুনরায় আমিসহ কয়েকজন সংবাদকর্মী নিউজ করলে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরামর্শ চান কী করলে কাঁকন বিবির জীবনের স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা হবে। সেই অনুযায়ী আমি সুপারিশ করি স্থায়ী এফডিআর করে দেবার জন্যে, যাতে করে এফডিআরের মুনাফা দিয়ে কাঁকন বিবির সংসার চলে। সেই মোতাবেক চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত মহোদয় দোয়ারাবাজার উপজেলা জনতা ব্যাংক শাখায় দশ লক্ষ টাকার এফডিআর করে দেন। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান কাঁকন বিবিকে নানাভাবে সাহায্যে সহযোগিতা করেছেন। সুনামগঞ্জের অনেক মুক্তিযোদ্ধাসহ অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বিভিন্ন সময়ে কাঁকন বিবিকে দেখ ভাল করেছেন।
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি’র বীরত্বগাঁথা, স্বাধীনতা যুদ্ধের ত্যাগের ইতিহাস তুলে ধরেন সে সময়ের অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান। তিনি বলেন, ‘কাঁকন বিবি ৫ নম্বর চেলা সাব সেক্টরের একজন অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সশস্ত্র সংগ্রামের দিনগুলোতে কাঁকন বিবি অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের পাশাপাশি কাঁকন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকবাহিনীর অবস্থান, অস্ত্র, গোলাবারুদ, ব্যাংকার, চলাচলের তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন। দেশমাতৃকার বুকে লাল সবুজের পতাকার জন্য তাঁর অবদান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। তখন পাক বাহিনী তার উপর অমানুষিক অত্যাচার-নির্যাতন চালায়। কাঁকন বিবির শরীরে লোহার খুন্তি গরম করে অসংখ্য ছ্যাঁকা দেয়। তাকে মৃতভেবে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে যায় পাক হায়নারা। পরে মুক্তিযোদ্ধারা তাঁকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। আবু সুফিয়ান অনেকটা আবেগাপ্লুত হয়েই বলেন, কাঁকন বিবি ও আমরা এক সেক্টরে যুদ্ধ করেছি। ৭১ এর যুদ্ধে কাঁকন বিবির অবদান কোনদিন ভুলার নয়, আমরা তাঁকে কখনোই ভুলবো না। একজন আদিবাসী নারী হয়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য যে মরণপণ যুদ্ধ করেছেন তা এক বীরত্ব গাঁথা। বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান আরো বলেন, কাঁকন বিবি বর্তমানে জীবণ মরণের সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাঁকন বিবিকে তাঁর দপ্তরে ডেকে নিয়েছেন কথা বলেছেন। কাঁকন বিবিকে প্রধানমন্ত্রী কথা দিয়ে ছিলেন তাঁকে বীরপ্রতীক উপাধিতে ভূষিত করবেন, কিন্তু শুধু সার্টিফিকেটই দেয়া হয়েছে তাঁকে। বীরপ্রতীক উপাধি এখন পর্যন্ত সরকারি গেজেটভূক্ত করা হয়নি। ফলে বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত পদমর্যাদার কোন সুযোগ সুবিধা পাচ্ছেননা কাঁকন বিবি। আবু সুফিয়ান দাবি করে বলেন, কাঁকন বিবির এই অন্তিম মুহুর্তে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধি গেজেটভূক্ত করা হউক। যেনো মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারেন গেজেটভূক্ত হয়েছে বীরপ্রতীক উপাধি। সেদিকে সরকারের নজর দেয়া উচিত।

৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় বীর সেনানী কাঁকন বিবি কে নিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু জানান, ‘যেকোন যুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে শত্রæর অবস্থান ও শক্তি সামর্থ্য জানা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রæর আগাম তথ্য-উপাত্ত থাকলে যুদ্ধের কলাকৌশল ও শত্রæর ঘাঁটিতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানা যায়। কাঁকন বিবি সে দায়িত্ব সুনিপুণভাবে পালন করেছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী জানান, কাঁকন বিবি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র। মুুক্তিযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন অদিবাসী নারী কাঁকন বিবি। পাকবাহিনীর সকল গোপন তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করতেন কাঁকন। তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক অত্যাচার নির্যাতনের স্বীকার হয়েছেন। কাঁকন বিবি তাঁর আত্মত্যাগের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে অসম্ভব প্রিয় একজন মানুষ হয়ে ওঠেন। এ অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে একজন সাহসী মানবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম তারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে অনেক বড় বড় অপারেশন করেছি। সেসব যুদ্ধে কাঁকন বিবি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। বাঙালি জাতি হিসেবে কাঁকন বিবি’র ত্যাগ ও যুদ্ধযাত্রার অবদান কখনোই ভোলার নয়। স্বাধীনতার পরে কাঁকন বিবিকে কোন খেতাব দেয়া হয়নি। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দুইজন নারী মুক্তিযোদ্ধাকে খেতাব দেয়া হয়েছিলো। তাঁরা হলেন- তারামন বিবি ও ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম। পরবর্তীতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাঁকন বিবিকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় তাঁকে একটি সনদ দেয় সেখানেও লেখা আছে ‘বীরপ্রতীক কাঁকন বিবি’। কিন্তু বীরপ্রতীক হিসেবে সরকারিভাবে গেজেটভূক্ত না হওয়ায় আজও তাঁর ‘বীরপ্রতীক উপাধি’র স্বীকৃতি মিলেনি। একারণে বীরপ্রতীকের কোন সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না তিনি। তিনি মনে করেন বীর প্রতীক খেতাব পাওয়ার মতো যোগ্যতা কাঁকন বিবির ছিলো। একজন আদিবাসী নারী হিসেবে তিনি দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে যে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছেন এজন্য কাঁকন বিবিকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভুষিত করার যুক্তিসংগত কারণ রয়েছে। তিনি সরকারের কাছে দাবি করেন অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবি’র ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবটা সরকারিভাবে গেজেটভূক্ত করা হউক।
কাঁকন বিবি কে নিয়ে বীরপ্রতীক ইদ্রিছ আলীর ভাবনা: দোয়ারাবাজার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক কাঁকন বিবি সম্পর্কে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় দোয়ারাবাজার ছিলো ৫ নং সেক্টরের অধীনে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর মীর শওকত আলী, তিনি পরবর্তীতে লেফট্যানেন্ট জেনারেল হন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালনা করতেন। সে সময় নূরজাহান বেগম ওরফে কাঁকন বিবি একজন পাকিস্তানী ইপিআর সৈনিকের বউ ছিলেন। তখন কাঁকন বিবি তাঁর স্বামীর সাথে দেখা করার জন্য প্রায় সময় পাকবাহিনীর ক্যাম্পের ভেতরে যাওয়া আসা করতেন। সেই আসা যাওয়ার সুযোগকে কাজে লাগাতেন সেক্টর কমান্ডার। তিনি পাকবাহিনীর বিভিন্ন তথ্য জানার জন্য কাঁকন বিবিকে কাজে লাগাতেন। কাঁকন বিবির প্রদেয় তথ্যগুলো সঠিকভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে অপারেশন চালাতো মুক্তিযোদ্ধারা। এদিক থেকে কাঁকন বিবি ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ মহিলা। মুক্তিযুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের ক্ষেত্রে কাঁকন বিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি দেখেছেন কাঁকন বিবি কিভাবে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকবাহিনীর ক্যাম্পে যাওয়া আসা করতেন। পাকবাহিনীর গতিবিধি ও অস্ত্রশস্ত্রের তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করতেন। মুক্তিযোদ্ধারা বিশ্বাস করেন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কাঁকন বিবির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি আরও বলেন মুক্তিযুদ্ধের পর কাঁকন বিবি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী কাঁকন বিবি কে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব প্রদানের কথা বলেছেন বলে আমরা শুনেছি । এ কথা শোনার পর আমরা অনেক খুশি হয়েছি যে অন্তত একজন মহিলা মুক্তিযোদ্ধাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ খেতাব ‘বীরপ্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। বীরপ্রতীক ইদ্রিছ আলী আরও বলেন, বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর সাথে একটা মিটিং-এ আমি কাঁকন বিবির কথা উপস্থাপন করি। খেতাবপ্রাপ্ত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য মন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করি। কিন্তু মন্ত্রী বলেছেন গেজেট না হওয়া পর্যন্ত ভাতা প্রদান করা যাচ্ছে না। তবে ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক দাবি করেন, কাঁকন বিবির খেতাবটি সরকারি গেজেটভূক্ত করা হউক। গেজেটভূক্ত হলে কাঁকন বিবি সকল ধরণের সুযোগ সুবিধা পেতেন। তাতে কাঁকন বিবি নিজে এবং সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা খুশি হতেন।
সৌজন্যে জাকির হোসেন সংবাদকর্মী
কাঁকন বিবি সম্পর্কে মুল্যায়ন করতে গিয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এম এ হালিম বীর প্রতীক বলেন, ‘কাঁকন বিবি যুদ্ধক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর তথ্যগত সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা সফল অপারেশন পরিচালনা করেছেন। কাঁকন বিবি মূলতঃ টেংরটিলা এলাকায় অবস্থান করে পাকবাহিনীর অবস্থান, রসদ ও ব্যাংকারসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের অপারেশন সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তথ্য সংগ্রহ করতে গুপ্তচর হিসেবে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে পাকবাহিনীর হাতে অমানুষিক ও নির্মম নির্যাতনের স্বীকার হতে হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর মৌখিকভাবে কাঁকন বিবিকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কিন্তু সরকারী গেজেটভূক্ত না হওয়ায় এটি আজও কার্যকর হয়নি। কাঁকন বিবি ‘বীরপ্রতীক ’খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার জন্য সংরক্ষিত রাষ্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেননা। তাই কাঁকন বিবিকে ‘বীরপ্রতীক’ উপাধি দিয়ে সরকারি গেজেট ঘোষণা করার জন্য তিনি বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নিকট দাবি জানান।’
কাঁকন বিবির যুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বীরমুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক আব্দুল মজিদ কাঁকন বিবি সম্পর্কে বলেন, ‘কাঁকন বিবি ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অফিসারদের সঙ্গে থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে।’
দোয়ারাবাজার উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. আজিম উদ্দিন (৫নং সেক্টরের কোম্পানী টু আইসি) মাস্টার কাঁকন বিবি সম্পর্কে বলেন, ‘কাঁকন বিবিকে আমরা মায়ের মতো দেখি। ১৯৭১ সালের এর মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিক থেকেই কাঁকন বিবি দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা অপারেশনের সময় কাঁকন বিবি পাকবাহিনীর নির্যাতনের স্বীকার হয়েছিলেন। টেংরাটিলায় স্বামীর খোঁজ করতে ও পাকবাহিনীর খবরাখবর নিতে গিয়ে অনেক অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি। এসময় পাকবাহিনী তাঁকে নির্মম ও পৈশাচিক নির্যাতন করে। মুক্তিযোদ্ধের সর্বক্ষেত্রেই তাঁর সীমাহীন ত্যাগ ও অবদান ছিলো। একজন নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে কাঁকন বিবি অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবেন চিরকাল।’
দোয়ারাবাজার উপজেলার বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. জাকির হোসেন মাস্টার কাঁকন বিবি সম্পর্কে বলেন, কাঁকন বিবি যুদ্ধ চলাকালীন বেশিরভাগ সময়ই তাঁর প্লাটুনে ছিলেন। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার-দাবার তৈরিতে রান্না-বান্নার কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। একবার গুপ্তচর হিসেবে কাঁকন বিবিকে টেংরাটিলা শত্রæর ঘাঁটিতে পাঠানো হয়েছিলো। পাকিস্তান আমলে তিনি ইপিআর সৈনিকের বউ ছিলেন। ওই ইপিআর সদস্য যখন বোগলা ক্যাম্পে ছিলেন তখন তার সঙ্গে বিয়ে হয় কাঁকন বিবির। পরে ওই ইপিআর সদস্য বদলী হয়ে যাওয়ার পর কাঁকন বিবি স্বামীর খোঁজে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায়। সে সময় কাঁকন বিবির কাছে স্বামীর হাতে লেখা একটি চিঠি ছিলো। সে চিঠিকে সম্বল করে মুক্তিযোদ্ধাদের নির্দেশে কাঁকন বিবি টেংরাটিলা আসেন। সেখানে পাকবাহিনীর এক কর্নেলের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। কর্ণেল তাঁকে চার্জ করলে কাঁকন বিবি জানায়, স্বামীর খোঁজে তিনি টেংরাটিলা এসেছেন। পাকবাহিনীর ওই কর্ণেল কাঁকন বিবিকে বলেন, এভাবে তোমার ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। এসময় কৌশলী কাঁকন বিবি মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধাচরণ করে কর্ণেলের বিশ^াস অর্জন করেন। কর্ণেলের কাছ থেকে পাকবাহিনীর তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধাদের সরবরাহ করেন।’
দোয়ারাবাজার উপজেলা ইউনিট কমান্ডার সফর আলী জানান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে কাঁকন বিবি একজন অকুতোভয় সৈনিকের নাম। তিনি একাধারে সশস্ত্র যোদ্ধা, অন্যদিকে; মুক্তিবাহিনীর একজন গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছেন। তাঁর দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশন করেন মুক্তিযোদ্ধাগণ। একজন আদিবাসী নারী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
সৌজ্যনে হিমাদ্রি শেখর ভদ্র (মিঠু) সংবাদকর্মী
কাঁকন বিবি কে নিয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার নুরুল মোমেন এর কিছু ভাবনা:
সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারাবাজারের নূরজাহান বেগম ওরফে কাঁকন বিবি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অপরিসীম ভূমিকা পালন করেন। তিনি বলেন, কাঁকন বিবি একজন খাসিয়া স¤প্রদায়ের নারী হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সহিত, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, যেসকল কার্যক্রম ও তথ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন তা অবিস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় পাক বাহিনীর ক্যাম্পে ঢুকে সকল খবরাখবর সরবরাহ করতো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। কাঁকন বিবির সংবাদের উপর ভিত্তি করে অনেক সময় আমরা অপারেশনে যেতাম। নুরুল মোমেন গল্পে গল্পে বলেন, কাঁকন বিবি প্রায়ই পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে যেতেন এবং পাকবাহিনীর অস্ত্র কোথায় রাখা আছে, তাদের লোকসংখ্যা কতজন, কতগুলো অস্ত্র, তাদের ব্যাংকার কোথায় কোথায় স্থাপন করা আছে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট। এছাড়াও পাকিস্তানীরা কখন, কোথায় অপারেশন করবে এসব খবরও মুক্তিযুদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন কাঁকন বিবি। নুরুল মোমেন আলাপচারিতার সর্বশেষে বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে কাঁকন বিবি’র অবদান বলে শেষ করার মতো নয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাঁকন বিবি কে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করেছেন ঠিক কিন্তু এটা এখনো গেজেটভূক্ত না হওয়ায় কাঁকন বিবি ‘বীরপ্রতীক’ খেতাবের সংরক্ষিত সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেননা। তিনি দাবি করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ঘোষিত কাঁকন বিবির ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব গেজেটভূক্ত করা হোক এবং বর্তমানে কাঁকন বিবির শারীরিক অবস্থা খারাপ, তাঁর চিকিৎসার ব্যয়ভার সরকার গ্রহণ করুক। এটাই আমার দাবি।
কাঁকন বিবি কে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান-এর ভাবনা:
মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান কাঁকন বিবি কে নিয়ে গল্পের শুরুতেই বলেন, সে একজন ব্যতিক্রমধর্মী নারী। তিনি বলেন, কাঁকন বিবি একজন অসম সাহসী নারী, যে সাহসের কোন অন্ত নেই। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসকে কাজে লাগিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তিনি যেভাবে সহযোগিতা করেছেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। এছাড়াও কাঁকন বিবি পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাঁর নিজের ইজ্জত বাজি রেখেছিলেন । কাঁকন বিবি ১৯৭১ সালে পাক বাহিনীর বিভিন্ন ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাঁর ইপিআর স্বামীর খোঁজে। স্বামীর সন্ধানে বিভিন্ন সময় পাক বাহিনীর ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরতেন কাঁকন বিবি। সেই সুবাদে পাক বাহিনীর সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করেন তিনি। সেই সম্পর্কের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে পাক বাহিনীর সকল খবরাখবর এবং তথ্য উপাত্ত রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন কাঁকন বিবি। মুক্তিযুদ্ধে কাঁকন বিবি’র অতুলনীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব অনতিবিলম্বে গেজেটভূক্ত করা হোক।
সৌজন্যে মানব তালুকদার, সংবাদকর্মী