কাজ শুরু না করেই টাকা তোলা আর্থিক অব্যবস্থাপনার উদাহরণ

তাহিরপুর উপজেলায় ৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার আগেই টাকা তোলে রাখা হয়েছে। এই পাঁচ প্রকল্পে উত্তোলিত টাকার পরিমাণ ৩৯ লাখ টাকা। বেশ মোটাসোটা অংকই বটে। উপজেলা প্রকৌশলী সূত্রে জানা গেল, প্রকল্প এলাকায় পানি থাকার কারণে কাজ শুরু করা যায়নি, কিন্তু অর্থবছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই এই টাকা তোলে রাখতে হবে। নতুবা বরাদ্দ বাতিল (ল্যাপসড্) হয়ে যাবে। কিন্তু সংবাদসূত্রে জানা গেল, তিনটি প্রকল্প এলাকায় কয়েকদিনের বর্ষণে কিছু পানি জমেছে, অন্য দুইটি প্রকল্প স্থানে কাজ শুরু হতে কোন বাধা ছিল না। অথচ কোন প্রকল্পেই কাজ শুরু করা হয়নি। উন্নয়ন কাজ শুরু করতে কর্তৃপক্ষের যতটা অনীহা ততটাই উৎসাহ বরাদ্দের টাকা তোলে রাখতে। এই টাকা তোলার জন্য সংশ্লিষ্টদের অনেক বেআইনি কাজ করতে হয়েছে। নিশ্চয়ই কাজ পরে করা হবে এই শর্তে তারা টাকা তোলেননি। টাকা তোলার বিল-ভাউচারে যথারীতি কাজ সম্পাদিত হয়েছে মর্মেই তারা মিথ্যা সনদ দিয়েছেন। এই মিথ্যাচার করতে হবে কেন? আর উত্তোলিত টাকা যে এখন প্রকৃত অর্থেই উন্নয়ন কাজে ব্যয়িত হবে তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়? জুন মাস হলো সরকারের হিসাব চূড়ান্ত করার মাস। পুরো অর্থবছরে যত বরাদ্দ পাওয়া যায় জুন মাসের মধ্যে সেই টাকা খরচ করতে হয়। নতুবা অব্যয়িত টাকা সরকারের অনুকূলে সমর্পিত হয়ে যায়। এই বাধ্যবাধকতার কথা বছরের শুরু থেকেই সকলে জানেন। অথচ জুন মাস আসলেই সারা দেশের সরকারি দপ্তরগুলোতে বিল-ভাউচার বানানোর ধুম লেগে যায়। এ মাসেই নম: নম: করে কাজ করিয়ে কিংবা তাহিরপুরের মত কোন কাজ না করিয়েই বিল তোলাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সংস্কৃতি। এতে শুধুমাত্র জুন মাসে সরকারের কত টাকা অপচয় সাধিত হয় সে নিয়ে রীতিমত গবেষণা করা যেতে পারে। অথচ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে যথেষ্ট সময় নিয়ে কাজ করানোর উদ্যোগ গ্রহণ করায় তেমন কোন সমস্যা থাকে না। এখন তাহিরপুরের ৫ প্রকল্পের বিপরীতে কাজ না করিয়ে যে ৩৯ লাখ টাকা তোলা হলো সেই টাকায় কতটুকু কাজ সত্যিকার অর্থে সম্পাদিত হবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাবে। এই হলো আমাদের সরকারি পর্যায়ে আর্থিক শৃঙ্খলার নমুনা।
ঠিক এই অবস্থা স্মরণ রেখেই আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী শনিবার রাজধানীতে এডিপি বাজেট ম্যানেজম্যান্ট সিস্টেম এর উপর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘জনগণের টাকা খাচ্ছেন, তাদের জন্য কাজ করেন। দিনের কাজ দিনে করবেন, বসিয়ে রাখবেন না।’ মন্ত্রী মহোদয়ের কথামতো কর্মকর্তারা যদি দিনের কাজ দিনেই শেষ করতেন তাহলে কোন উন্নয়ন প্রকল্প ৩০ জুন পর্যন্ত কাজ শুরু করতে না পারার তাহিরপুরের মত ব্যর্থতা তৈরির উদাহরণ হতে পারত না। বলা বাহুল্য তাহিরপুর একটি উপলক্ষ মাত্র। সারা দেশের একই চিত্র। একই কর্মশালায় পরিকল্পনা সচিব বলেছেন, ‘বছরের শেষ বেলা এসে প্রতিটি মন্ত্রণালয় ফাইল পাঠাচ্ছে অর্থ ছাড়ের জন্য। প্রকল্পগুলোর সঠিকভাবে বাস্তবায়ন নিয়ে আমার যথেষ্ট চিন্তা আছে’। কাকতালীয়ভাবে সচিব মহোদয়ের এই চিন্তার (বলা ভাল দুশ্চিন্তা) বাস্তব প্রতিফলন দেখা গেল একই দিনে প্রকাশিত তাহিরপুরের সংবাদটিতে।
আমাদের খাই খাই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। জনগণের করের টাকায় যে উন্নয়ন বরাদ্দ, তার প্রতিটি পয়সা যাতে উপযুক্ত কাজে ব্যয় হয় সেটি নিশ্চিত করাই সুশাসনের অন্যতম লক্ষণ। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পরিকল্পনামন্ত্রী ও সরকারের অন্য দায়িত্বশীলরা ঠিক এই সুশাসন নিশ্চিত করতে এখন দিন-রাত কাজ করছেন। সরকারের এই চিন্তা-চেতনাকে মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের উপলব্ধি করতে হবে।