কাতারের আকাশে

এনাম আহমদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
কাতার রওয়ানা হওয়ার আগের দিন ঢাকা থেকে এক হাজার টাকা দিয়ে এক হাজার ডলার এনডোস করলাম। আড়াই হাজার টাকা দিয়ে কোভিড টেস্ট করালাম। সবই বৃথা গেল। এয়ারপোর্টে এসবের কিছুই দেখলো না! বন্ধু শিমুল আমেরিকা থেকে এসে পাঁচশত ডলার দিয়ে গেলো। মারুফ মান্না সোনালী ব্যাংক থেকে দিল কাতারের দিনার ও সৌদি আরবের রিয়াল, আসলে সবই কপাল! নির্ধারিত সময়ের অনেক আগে কাতারে পৌঁছানোয় আমার শাপেবর হলো। পেয়ে গেলাম কয়েকজন বিশ্বকাপগামী তরুণদের। তাদের পেয়ে সব শংকা আমার কেটে গেলো! এয়ারপোর্টে অতীত অভিজ্ঞতা বেশি ভালো না থাকায় একা একা কিছুটা শংকিত ছিলাম! সত্যিকার অর্থে উৎসবের আমেজ এলো ওরা সবাই জড়ো হওয়ায়। কঠিন মুখ করে বসে থাকা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের মধ্যেও ব্রাজিল-আর্জেন্টনার জিগির তুলে তুলে তাদের কাঠিন্যে ভাব দূর করে দিলো এরা! কর্মকর্তারাও দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেলেন। একজন কর্তা বললেন, যারা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার আছেন, তারা আমার কাছ খেকে সিল নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে যান! এক তরুণ ব্রাজিল সমর্থকের কথায় মনটা ভরে গেলো! সে জানালো, মেসির হাতে কাপ দেখতে পেলে সে খুশিই হবে। কারণ মেসি যোগ্য এবং দলমত সবকিছুর উর্দ্ধে! ঢাকায় রেড এলার্ট ঘোষণা করায় আমরাও কিছুটা বিড়ম্বনার পড়ি। এয়ারপোর্টে ভরে যায় পুলিশে! বিমান ছাড়তে বিলম্ব হলো দুই ঘন্টা। এ সময় আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়া দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি আব্দুল গনি। তিনি আমাদের জার্সি সহ ছবি তুলে ইত্তেফাকের অনলাইন সংস্করণে পাঠিয়ে দিলেন। এদিকে ইউসিবি ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডের বদৌলতে আর্জেন্টিনা সমর্থক ইকবাল এয়ারপোর্টের তৃতীয় তলায় বুফে রেস্টুরেন্টে নিয়ে আমাদের ভূড়িভোজ করালেন। বিমান উড়াল দিলো সন্ধ্যায় সন্ধ্যায়। কিছু মশা আমাদের সফর সঙ্গী হলো বিনাটিকেটে! পৃথিবী ঘুরছে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে, আমরাও যাচ্ছি ক্রমশ পশ্চিম দিকে পৃথিবীর সাথে তাল মিলিয়ে! আমরা যে শহরের উপর দিয়ে যাচ্ছি, সব খানেই সন্ধ্যা! সে এক অপূর্ব অনুভূতি! কলিকাতার পাশদিয়ে ঘুরে আমরা যাচ্ছি জয়পুর- মুম্বাইয়ের উপর দিয়ে। মনিটরে দেখাচ্ছ সামনে করাচি। এখন পর্যন্ত পুরো উপমহাদেশের আকাশে কোখাও মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। তবে এক পর্যায়ে আমরা পৃথিবীর গতির কাছে পরাজিত হলাম! পারস্য উপসাগরের কাছাকাছি আসার আগেই রাত নামলো। আমাদের ফ্লাইট স্টুয়ার্ডদের একজনের নাম জয়। তিনি ইতিমধ্যে আঠারোটি দেশে পরিচালিত বিমানের স্টাফ ছিলেন। তার কাছ খেকে জানলাম কোন দেশে যেতেই তাদের ভিসা লাগে না শুধু একটি ডিক্লারেশন লাগে। তিনি একজন আর্জেন্টিনার কঠোর সমর্থক। হঠাৎ বিমানে সংগীত শিল্পী মনির খানকে দেখা গেল। তবে পারস্য উপসাগরের আবহাওয়ার রহস্যের জন্য জান বাঁচানোর উদ্বিগ্নতায় তার গান শোনা হলো না। বিমানে কয়েক দফায় খারার পরিবেশন করা হলো। খাবারে মান প্রশ্নাতীত। পরিমান ভাষাতীত ও আশাতীত! ঘোষণা আসলো আমরা নামছি। যেখানে কয়েক ঘন্টা আগে মেসি-রোনালদো এবং কথিত খেলতে আসা মেকাপ করা একজন অভিনেতাও নেমেছেন! আকাশ খেকে অত্যন্ত জৌলুসপূর্ণ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশকে দেখলাম। এর আগে আকাশ খেকে দেখা দুবাই, মস্কো, লন্ডন বা বার্লিন শহরের চেয়েও সুন্দর! ইতিমধ্যে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও প্রখম ম্যাচ শেষ হয়ে গেছে। কাতারের আকাশে প্লেন জটের কারণে উপরে চক্কর দিতে দিতে আমাদের এসব আর সরাসরি দেখা হয়নি। ভূমিতে নেমে ধাক্কার মতো খেলাম। এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনের শেখ কর্তাদের আচরণ তাদের বাহ্যিক দেশের মতো জৌলুসপূর্ণ নয়। শেখ হামাদ বিমান বন্দর থেকে বের হয়ে আমার কন্ঠ থেকে যে শব্দটি প্রথম বের হলো সেটি হচ্ছে “ঠান্ডা”! (চলবে)
লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট