কানাইখালী নদী ও গজারিয়া খাল খননের উদ্যোগ

বিন্দু তালুকদার
বহুল আলোচিত জামালগঞ্জের পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করতে কানাইখালী ও গজারিয়া খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড।
বরাদ্দ অনুমোদনের পর খুব তাড়াতাড়ি (সম্ভব হলে চলতি সপ্তাহেই) দুইটি প্রকল্পের কাজ শুরু করে জানুয়ারি মাসের মধ্যেই বাস্তবায়ন হবে বলে জানিয়েছেন সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকী ভূঁইয়া।
তবে হাওরের পানি নিস্কাশনে ইতোমধ্যে ঢালিয়ার বাঁধ কেটে দিয়েছে কৃষকেরা। এতে করে হাওরের পানি কিছু নিস্কাশিত হয়েছে। তবে কাঙ্খিত পরিমাণ পানি হ্রাস পাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা।
পলি মাটিতে ভরাটকৃত কানাইখালী নদীর ৪.২৫ কিলোমিটার খননে ৮৭ লাখ টাকা ও হাওরের পানি প্রবাহের জন্য গজারিয়ার ভরাটকৃত কালের ৪ কিলোমিটার খনন করতে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ অনুমোদন হয়েছে। ৫ ফুট গভীর করে, তলদেশে ৪৫-৪৮ ফুট ও উপরে অন্তত ৫০ থেকে ৫৫ ফুট প্রস্ত করে খাল ও নদী খনন করা হবে। শনিবার দুপুরে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল এই কর্মকর্তা।
চলতি বোরো মওসুমের আগেই পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতা দূর করা সম্ভব না হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন হাওরপাড়ের ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই। তাই যতদ্রæত সম্ভব বৃহত্তর পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কানাইখালী নদী ও গজারিয়া খাল খননের দাবি জানিয়েছেন কৃষকসহ স্থানীয় লোকজন।
জানা যায়, জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ও ভীমখালী ইউনিয়নের আওতাধীন পাগনার হাওরের পূর্ব এলাকায় জলাবদ্ধতায় গত দুই যুগ ধরে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। এসব জমির মালিক হাওর সংলগ্ন ২৭ গ্রামের কয়েক হাজার কৃষক।
জামালগঞ্জ উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কেএম বদরুল হক বললেন,‘ চলতি বোরো মওসুম মাত্র শুরু হয়েছে। বীজতলা তৈরি করছেন কৃষকরা। এখনই স্পষ্ট করে কিছু বলা যাবে না। আরও অন্তত ১৫-২০ দিন পর পাগনার হাওরে জলাবদ্ধতার পরিমাণের বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।’
তবে বছর সাবেক উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা দাবি করে বলেছিলেন, বোরো মৌসুমে ৫ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে ছিল। গত বছরের জানুয়ারি মাসে তৎকালীন জামালগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড. সাফায়েত আহমদ সিদ্দিকী জানিয়েছিলেন, জলাবদ্ধতার কারণে আরও একবছর আগে তিন হাজার হেক্টর জমিতে চাষ করা সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতার পরিমাণ দিনে দিনে বেড়েছে। এবার অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে থাকবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা দুই হাজার হতে পারে। জলাবদ্ধতার কারণে এবার ৩০ কোটি টাকার ধান কম উৎপাদন হবে।’
জলাবদ্ধতার শিকার গ্রামগুলো হচ্ছে ফেনাবাঁক ইউনিয়নের রাজাবাজ, উজান দৌলতপুর, ভাটি দৌলতপুর, মাতারগাঁও, ছয়হারা, গঙ্গাধরপুর, রাজাপুর, ইনাতনগর, ফেনারবাঁক (একাংশ)। ভীমখালী ইউনিয়নের রাজাবাজ, ভান্ডা, মল্লিকপুর, হারারকান্দি, সন্তোষপুর, কামলাবাজ, গাজীপুর, হাসনাবাজ, ভীমখালী, বিছনা, মাহমুদপুর, ফেকুল মাহমুদপুর, কান্দাগাঁও, তেরানগরসহ আরও কয়েকটি গ্রাম। পাশাপাশি সদর ইউনিয়নের কাশিপুর, কালাগুজা, সোনাপুর, চাঁনপুর ও গু”ছগ্রাম।
ভীমখালী ইউনিয়নের ফেকুল মাহমুদপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘কানাইখালী নদী ভরাটের ফলে কৃষকরা চরম দুর্দশা ভোগ গেছে। প্রতিবছরই জলাবদ্ধতার পরিমাণ বাড়ছে। সভা-সমাবেশ, আন্দোলন করে কোন পাওয়া যাচ্ছেনা।’
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের উজান দৌলতপুর গ্রামের কৃষক গৌরাঙ্গ সরকার বলেন, ‘কানাইখালী নদী আমাদেরকে গরিব বানিয়ে দিয়েছে। দাদার আমলের বোরো জমি সারা বছরই পানি থাকে। গত ১৫ বছর ধরেই শুধু শুনে আসছি, কানাইখালী নদী ও গজারিয়া খাল খনন হবে। হবে আর হচ্ছে না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সরকার কেউ আমাদের সমস্যার সমাধান করেনি। এসব জমির আশা বাদ দিয়েছি। আমি দিরাইয়ে চলে যাব। সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য বাড়ি কেনার প্রস্তু‘তি নিয়েছি। ’
ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান দুলাল মিয়া বলেন, ‘হাওরের জলাবদ্ধতায় বোরো ধানের উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলো চরম সংকটে রয়েছে। আমার ইউনিয়নের ৩৩ গ্রামের মধ্যে ছোট-বড় অন্তত ২৭ গ্রামের প্রায় তিন হাজার কৃষক জলাবদ্ধতার শিকার। হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসন এখন জীবন-মরণ সমস্যা। জলাবদ্ধতা নিরসন করে কৃষকদের বাঁচাতে হবে। ’
ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করুনা সিন্ধু তালুকদার বলেন,‘ পাগনার জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে অন্তত ২৫ বছর ধরে। পরিস্থিতি দিন দিন জটিল রূপ ধারণ করছে। অনেক কৃষক এই বছর হাওরে যেতেই পারেনি। আমার নিজেরই দুই হাল (২৪ কেদার) জমি পানির নিচে থাকে। গত কয়েক ধরে পাম্প দিয়ে সেচে হাওরে ধান রোপন করা হচ্ছে। গত বছর পানি সেচেও সম্ভব হয়নি। কারণ যখন হাওরের পানি নিস্কাশন করা হয়, তখন ধান রোপণের সময় চলে যায়।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু বকর সিদ্দিকী ভূঁইয়া বলেন,‘ পাগনার হাওরের জলাবদ্ধতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই জলাবদ্ধতার কারণে অনেক কৃষক জমি চাষ করতে পারেন না। তাই আমরা চেষ্টা করব এই সপ্তাহেই গজারিয়া খাল খনন কাজ শুরু করতে। আগামী জানুয়ারি মাসের মধ্যেই কানাইখালী নদী ও গজারিয়া খালের খনন কাজ শেষ করা হবে। এজন্য দুইটি প্রকল্পের ঠিকাদারকেই খনন কাজ শুরু করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। খনন কাজ বাস্তবায়ন হলে হাওরের পানি নিস্কাশন হবে বলে আমরা আশা করি।’
জামালগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন,‘ কানাইখালী নদী ও গজারিয়া খাল খনন সবার দাবি। কৃষকদের স্বার্থে যতদ্রুত সম্ভব খনন কাজ শুরু করতে হবে এবং হাওরপাড়ের কৃষকদের একমাত্র বোরো ফসল চাষাবাদের সুযোগ করে দিতে হবে।’