কারাগারে আবারও অনিয়মের ভূত-ম্যাট নানু দেওয়ান ফিরেছে

বিন্দু তালুকদার
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের নানা অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে সুনামগঞ্জের খবরে ধারাবাহিক পাঁচ পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছিল কারা কর্তৃপক্ষ।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন থেকে অতিরিক্ত জেলা মাজিস্ট্রেট (এডিএম) কে প্রধান করে চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তদন্ত কমিটি এখনও তদন্ত রিপোর্ট জমা দেননি। কিন্তু জেলা কারাগারের অভ্যন্তরে আগের মতই অনিয়ম দুর্নীতি রয়েছে বলে অভিযোগ করছেন অনেকেই।
জেলা কারাগারের কয়েদী দিরাইয়ের কাউয়াজুরি গ্রামের মিজানুর রহমান নানু ওরফে নানু দেওয়ানকে সুনামগঞ্জ কারাগার থেকে সিলেটে স্থানাস্তর করা হয়েছিল। এই নানু দেওয়ানের মাধ্যমেই কারা অভ্যন্তরে ব্যাপক দুর্নীতির ঘটনা ঘটত বলে জেল ফেরৎ বহু বন্দী জানিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত কমিটির কাজ শেষে হতে না হতেই সিলেট জেলে স্থানান্তরিত নানু দেওয়ান আবারও সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে ফিরে এসেছে। সুনামগঞ্জের খবরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন একাধিক লোকজন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও জেলা কারাগার নিয়ে একাধিক ব্যক্তি মন্তব্য করেছেন।
তবে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের তত্ত্বাবধায়ক (সুপার) মো. আবুল কালাম আজাদ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরকে বলেন,‘সুনামগঞ্জ জেল নিয়ে মন্তব্য করা এসব তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। জেলের ভেতরে কোন সময়েই অনিয়ম হয়নি, এখনও হচ্ছে না। মানুষজন না জেনেই অনেক কিছু বলেন। নানু দেওয়ানকে আমরা সুনামগঞ্জ নিয়ে আসিনি। তার বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ আদালতে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। সেই মামলায় হাজিরা দিতে ঈদের পর সিলেট থেকে এখানে এসেছে সে। নিয়ম অনুযায়ী মামলায়
হাজিরা দিতে যে জেলায় মামলা সে জেলার কারাগারেই আসামীকে থাকতে হয়।’
তদন্ত কাজ সম্পন্ন হওয়ার আগেই নানু দেওয়ানের ফিরে আসা ও কবে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়া হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন,‘তদন্ত কমিটির প্রধান এডিএম সাহেব ভাল বলতে পারবেন। ’
এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা মাজিস্ট্রেট (এডিএম) হারুন রশিদের সাথে কথা বলতে চাইলে ফোন রিসিভ করেননি তিনি। তবে গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন,‘আমরা তদন্ত কমিটির সদস্যরা একাধিকবার বসেছি। নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আরো দু-একবার বসলেই আমরা চূড়ান্ত পর্যায়ে যেতে ও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।’
সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের অনিয়ম নিয়ে মন্তব্য করে সচেতন মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন কারাগার ফেরৎ সদর উপজেলা বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি মো. নোমান হাসান খান। নিজের ফেসবুকে তিনি লিখেছেন,‘আবারও সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে সিট বেচা কেনা হচ্ছে। সচেতন মহলগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। জেলখানার জমাদার কবির বন্দীদের কাঁছ থেকে সিট বাবদ ৫০০ টাকা করে নিচ্ছেন, অথচ সরকার বিনামূল্যে সবাইকে সিট দিয়েছে।’
সুনামগঞ্জ শহরের তেঘরিয়ার বাসিন্দা তৈয়বুর রহমান (কারাগার ফেরৎ) নিজের ফেসবুকে লিখেছেন, ‘সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারে পুনরায় বন্দীদের নির্যাতন শুরু। সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে নানু দেওয়ানকে সাময়িকভাবে স্থানান্তর করা হলেও পুনরায় ফিরে এসেছেন সেই জেলের রাজা মেট নানু দেওয়ান। সাধারণ বন্দীদের কাছ থেকে জানা যায়, যে নানু দেওয়ান তার আগের নির্যাতন শুরু করে দিয়েছেন। সুনামগঞ্জের সুশীল সমাজের প্রতি আমার অনুরোধ, জেলের রাজা মেট নানু দেওয়ান যেন সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের বন্দীদের নির্যাতন করতে না পারে সে জন্য নানু দেওয়ানকে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে অপসারণের জোর দাবি জানাচ্ছি।’
তৈয়বুর রহমান আরও বলেন, ‘আমি বিভিন্ন পত্রিকায় নানুর দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদ করায় সে বিভিন্ন লোক মারফত আমাকে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠালে এক লাখ টাকা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। আমি এই বিষয়টি মোবাইল ফোনে জেলারকে বলেছি।’
প্রসঙ্গত, সুনামগঞ্জ জেলা কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে গত ২২ জুলাই থেকে দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। ২৫ জুলাই ‘জেলের রাজা ম্যাট, ম্যাটের রাজা নানু’ ও ২৬ জুলাই ‘ জেলে বসেই কোটিপতি নানু’ শিরানামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। যদিও নানু দেওয়ানের বিরুদ্ধে জেলা কারাগার থেকে অর্থ আদায় ও নানা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন তার ছোট ভাই সোহেল মিয়া। সোহেল মিয়া দাবি করেছিলেন,এলাকার প্রতিপক্ষরা তার ভাই নানু দেওয়ান ও তাদের পরিবার সর্ম্পকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। সংবাদ প্রকাশের পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে নানু দেওয়ানকে সুনামগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে সিলেটে স্থানান্তর করা হয়েছিল।