কারারক্ষীর মৃত্যু নিয়ে রহস্য

বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জ কারাগার এলাকার ভিতর থেকে এক কারারক্ষীর গলায় ফাঁস দেওয়া ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শুক্রবার বিকাল সোয়া তিনটায় নিজ কোয়ার্টার থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। নিহত কারারক্ষির নাম ধৈর্য্য দাস (২৫)। সে জৈন্তাপুর উপজেলার গিলাছইন গ্রামের দীপ্তেন্দ্র দাসের ছেলে। কাকা নৃপেন্দ্র দাসের দাবি ধৈর্য্যকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে। ধৈর্য্য দাস এক মাস একদিন আগে ভালবেসে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে করেন সিলেট সদর উপজেলার পশ্চিম জাপা’র বাসিন্দা মর্তুজ আলীর মেয়ে সুনামগঞ্জ কারাগারের মহিলা কারারক্ষী সাজিদা ইয়াসমিন কে (১৯)। তারা দুজন ঘটনার সময় একসঙ্গেই কোয়ার্টারে ছিলেন।
সাজিদা ইয়াসমিন সাংবাদিকদের জানান, তারা দুজন বিয়ে করার পর ধৈর্য্য’এর পরিবার এ বিয়ে মেনে নেয়নি। গত সপ্তাহে ৩ দিনের ছুটি নিয়ে ধৈর্য্য বাড়ি গিয়েছিল। সেখানেও পরিবারের সঙ্গে তার ঝগড়াঝাটি হয়েছে। বাড়ি থেকে ফোন আসলে সে রাগারাগি করে কথা বলতো। বৃহস্পতিবার রাতে ডিউটি শেষে রাত ৩ টায় কোয়ার্টারে ফিরে সে। ভোর ৬ টায় ডিউটিতে যান সাজিদা ইয়াসমিন। দুপুর ১২ টায় সাজিদা ডিউটি থেকে ফিরলে ধৈর্য্য ঘুম থেকে ওঠে। বেলা আড়াইটায় সাজিদাকে নাস্তা তৈরির জন্য বলে ধৈর্য্য। সাজিদা নাস্তা তৈরি করার সময় ধৈর্য্য তার কক্ষের দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে সাজিদা অনেক ডাকাডাকি করলেও ধৈর্য্য দরজা না খোলায় প্রতিবেশী দুজন কারারক্ষীকে ডেকে আনে সাজিদা। শেষে দরজা ভেঙে ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে ধৈর্য্যরে লাশ ঝুলতে দেখেন তারা। সাজিদা জানান, ধৈর্য্য অফিসিয়েলি নাম পরিবর্তনের আবেদন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
একাধিক কারারক্ষী জানান, ধৈর্য্যরে চাকুরির মেয়াদ ৪ বছর ও সাজিদা ইয়াসমিনের ১০ মাস। গত কয়েকমাস ধরে এরা একে অপরকে ভালবাসতেন। একমাস একদিন আগে কারা এলাকার প্রথম দুইতলা ভবনের নীচতলায় তারা দুইজন (দিনের বেলায়) একসাথে অবস্থান করছিলেন। ঐ সময় কারাগারের তত্বাবধায়ক ( জেল সুপার) ও কারাধ্যক্ষ (জেলার) এসে তাদের দু’জনকে একসঙ্গে পান এবং ঐদিনই দুজনের কাগজে-পত্রে বিয়ের ব্যবস্থা করা হয়। বিয়ের আগে সাজিদা ও ধৈর্য্যরে প্রেম থাকলেও বিয়ের পর থেকেই দুজনের মধ্যে বনিবনা হচ্ছিল না। ঝগড়াঝাটি লেগেই থাকতো এই দুইজনের মধ্যে। শুক্রবার দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন এরা।
ধৈর্য্যরে কাকা নৃপেন্দ্র দাস মুঠোফোনে এ প্রতিবেদককে জানান, ধৈর্য্যকে হত্যা করে লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। ধৈর্য্যকে ব্লেকমেইল করে সাজিদার সঙ্গে কাগজে-পত্রে বিয়ে দেখানো হয়েছে। তার নাম পরিবর্তনের জন্য গত কয়েক দিন ধরেই কারাগারের তত্বাবধায়ক একে আজাদ ও জেলার মাসুদুর রহমান চাপ দিচ্ছিলেন। বিষয়টি তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ ও দিরাই-শাল্লার সংসদ সদস্য ড. জয়া সেন গুপ্তাকেও জানিয়েছেন। তারাও কারাগারের তত্বাবধায়ককে বিষয়টি দেখার জন্য ফোন দিয়েছেন। শুক্রবার দুপুরে ধৈর্য্য ফোন দিয়ে জানিয়েছে, নাম পরিবর্তন না করলে আগামী মাসে বেতন হবে না তার। তারা তাকে নাম পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে। এর একঘণ্টা পরে কারাগার থেকে তাদেরকে জানানো হয়েছে ধৈর্য্য ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। আমরা মনে করছি এ ঘটনা পরিকল্পিত।’
কারাগারের তত্ববধায়ক একে আজাদ বলেন,‘ধৈর্য্য ও সাজিদা বেগম ভালবেসে আমজাদ হোসেন নাম ধারণ করে বিয়ে করেছে। আমরা তার নাম পরিবর্তনের জন্য কোন চাপাচাপি করিনি। সংসদ সদস্য মহোদয়গণ এ ঘটনা জেনে তাদেরকে দেখে রাখার জন্য বলেছিলেন।’ কারাধ্যক্ষ মো. মাসুদুর রহমানও একই মন্তব্য করেন।
বিকাল ৫ টায় ম্যাজিস্ট্রেট আক্তার জাহান সাথী এবং সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ্’র উপস্থিতিতে মরদেহের ছুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা হয়।
সুনামগঞ্জ সদর থানার ওসি মো. শহীদুল্লাহ্ বলেন,‘কারারক্ষী ধৈর্য্যরে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য বিকাল সাড়ে ৫ টায় থানায় আনা হয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার আগে কিছুই বলা যাবে না।’